বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় বা শেষ পর্বের আখেরি মোনাজাত শেষে আরো শক্তভাবে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার ও বিএনপি। দলের সাংগঠনিক প্রস্তুতির চেয়েও সরকার বেশি জোর দিচ্ছে প্রশাসনিকভাবে মোকাবেলার ওপর। সেজন্য আজ রবিবার রাত থেকে দেশব্যাপী চলমান যৌথ অভিযান আরো জোরদার করা হচ্ছে। সরকারের প্রত্যাশা, এর ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। বিএনপিও প্রশাসনের এই প্রস্তুতির খবর জানে। জেনেও চলমান অবরোধের সঙ্গে এবার হরতালও যোগ করার চিন্তা-ভাবনা করছে।
সরকার যে আরো কঠোর হবে, এরইমধ্যে সেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে ১২ জানুয়ারির জনসভায় তিনি বলেছেন ‘নাশকতা ঠেকাতে যা যা করা দরকার, সবকিছু করা হবে। যত বড়ই হোন, কাউকে ছাড়া হবে না।’ আওয়ামী লীগের অন্যান্য শীর্ষ নেতারা এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক মন্ত্রীও কয়েকদিন ধরে আরো কঠোর হওয়ার বার্তা দিচ্ছেন।
এদিকে বিজিবি প্রধান আজিজ আহমেদ বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন ‘আক্রান্ত হলে বিজিবি সদস্যরাও প্রয়োজনে অস্ত্র ব্যবহার করবে, মনে রাখতে হবে-বিজিবির সব অস্ত্র প্রাণঘাতী।’ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক শুক্রবার বলেছেন ‘নির্বাচিত সরকারের জন্য শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে কাজ করবে পুলিশ বাহিনী।’ আর র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ বলেছেন ‘জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নাশকতাকারীদের মোকাবেলা করা হবে।’
জানা গেছে, চলমান নাশকতা মোকাবিলায় এরইমধ্যে যৌথ অভিযানে নেমেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বেশি নাশকতার ঘটনা ঘটছে-এমন এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে। দেশের কয়েকটি এলাকায় গত দু’দিনে বিএনপি-জামায়াতসহ ২০ দলের কয়েকশ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইজতেমার আখেরি মোনাজাত পার হওয়ার পর আজ রবিবার রাত থেকে এই অভিযান আরো জোরদার হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘নাশকতার’ সঙ্গে জড়িতদের এবং তাদের অর্থসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা জোগান দাতাদের ধরার চেষ্টা চলছে। এর মধ্য দিয়ে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে বিশ্বাস করছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, পরিস্থিতি শান্ত করতে সরকার বা প্রশাসন আরো কঠোর আচরণ এবং ব্যাপকহারে ধরপাকড় চালাতে পারে, এ বিষয়ে তারাও ওয়াকিবহাল। সেই আচরণের ধরন দেখে করণীয় নির্ধারণ করা হবে। পরিস্থিতি বুঝে প্রয়োজনে অসহযোগে চলে যাওয়ার মতো চিন্তা-ভাবনাও করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন ‘আমাদের চলমান আন্দোলন একটি পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এখন আর আমাদের পিছনে যাওয়ার সুযোগ নেই। আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নেয়া হবে। আমরা বিশ্বাস করি- নতুন নির্বাচন নিয়ে সরকার আলোচনা শুরু করবে। আমরা হাত বাড়িয়ে দিয়েছি, এখন সরকার এগিয়ে এলেই হয়।’
সূত্রমতে, গত ১২ দিনের অবরোধের সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে এক ধরনের ‘সন্তোষ’ রয়েছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে। বিশেষ করে এই সময়ে কূটনীতিকদের নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠার বিষয়টিকেও আন্দোলনের অর্জন হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার রাতে কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত থাকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘চলমান পরিস্থিতিতে কূটনীতিকরাও উদ্বিগ্ন। তারাও চান আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠা হোক। একইসঙ্গে তারা নাশকতা ও সহিংসতার ঘটনায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।’ জানা গেছে, বিএনপির ধারণা- চলমান আন্দোলন জোরদার করতে পারলে একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় বসতে সরকারের ওপর দেশি-বিদেশি চাপ সৃষ্টি হবে। এর ফলে এই আন্দোলন এক ধরনের সফল পরিণতি পাবে বলে আশা করছে দলটি।