এক ও দুই টাকার মুদ্রা থাকবে না :অর্থমন্ত্রী

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০১৫, ০০:২৬

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, এক টাকা ও দুই টাকা মূল্যমানের মুদ্রা (ধাতব বা কাগজি) উঠিয়ে দেয়া হবে। আগামীতে পাঁচ টাকার নোটই হবে সরকারি নোট। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এক টাকা ও দুই টাকার মুদ্রা উঠিয়ে দিলে দ্রব্যমূল্য বেড়ে মূল্যস্ফীতি আরেক দফা বাড়তে পারে।

গতকাল রবিবার সচিবালয়ে ভ্যাট আইন বিষয়ে এক অনুষ্ঠান শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, আগামীতে পাঁচ টাকার নিচে কোনো মুদ্রা না রাখার চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার। এ জন্য নতুন পাঁচ টাকার মুদ্রা বাজারে ছাড়া হবে। নতুন এ মুদ্রা বাজারে ছাড়ার আগে পাঁচ টাকার নিচে যে সব মুদ্রা আছে (১ টাকা ও ২ টাকা) সেগুলো বাজার থেকে তুলে নেয়া হবে। তবে নতুন পাঁচ টাকার মুদ্রা ধাতব না কাগজের টাকা হবে সেটা এখনো ঠিক করা হয়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এক টাকা ও দুই টাকা এখন ইউজলেস। শুধু শুধু এগুলো বহনের বোঝা বাড়িয়ে লাভ কী। তিনি আরও বলেন, এসব ধাতব ও কাগুজে মুদ্রা ধ্বংস করতেও সরকারের অনেক ব্যয় হবে। এ মুদ্রাগুলো ধ্বংস করা হলে (মুদ্রাগুলোর মানসহ) প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে।’
অর্থমন্ত্রী তথা সরকারের এ ধরনের ভাবনার কড়া সমালোচনা করে তারা বলেছেন, এটি একটি উদ্ভট চিন্তা। এক টাকা ও দুই টাকার মুদ্রা না থাকলে প্রায় সব পণ্যের দাম একদফা বাড়াতে হবে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তারা বলেন, যেসব পণ্যের দাম ছয় টাকা বা সাত টাকা সেসব পণ্যের দাম বাধ্য হয়ে কমিয়ে হয় ৫ টাকা করতে হবে অথবা বাড়িয়ে দশ টাকা করতে হবে। যেহেতু আমাদের দেশে পণ্যের দাম কমার প্রবণতা খুব কম, বরং সুযোগ পেলেই বাড়িয়ে দেয়া হয় সুতরাং এক্ষেত্রেও ছয় বা সাত টাকার দ্রব্যের দাম ১০ টাকা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইভাবে যেসব পণ্যের দাম ১১ টাকা থেকে ১৪ টাকা  সেসব পণ্যের দাম বেড়ে ১৫ টাকা হতে পারে। ১৬ টাকা থেকে ১৯ টাকা মূল্যের দ্রব্যের দাম বেড়ে হতে পারে ২০ টাকা। এভাবে সব পণ্যের দামই বাড়তে পারে।
এসব প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাক-কে বলেন, এক টাকা ও দুই টাকার মুদ্রা তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গত হবে না। তিনি বলেন, অ্যাকাউন্টিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে হয়তো ৫ টাকার নিচের মুদ্রার তেমন বড় প্রভাব নেই। কিন্তু আমাদের খুচরা লেনদেনের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার যে মূল্য তাতে এক থেকে চার টাকার মূল্যমান নেহায়েত কম নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক এই গভর্নর আরও বলেন, ডলারের বিপরীতে আমাদের মতো মুদ্রামানের দেশগুলোতেও এই মানের মুদ্রা রয়েছে। সুতরাং এক টাকা ও দুই টাকা মানের মুদ্রা তুলে দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা আমি পাচ্ছি না।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যদিও এক টাকা ও দুই টাকা মূল্যমানের পণ্য আমাদের দেশে নেই বললেই চলে তারপরও ভাংতি টাকার অভাবে সব পণ্যের দামই একদফা বাড়বে। এতে দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি উভয়ই বেড়ে যাবে। যা সার্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিবে। যেহেতু ৫০ টাকার নিচের বিভিন্ন দ্রব্যের মূল্য বাড়ার শতাংশিক হার অনেক বেশি তাই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উপর এর নেতিবাচক প্রভাবও বেশি। তাছাড়া এক টাকা ও দুই টাকার মুদ্রা না থাকলে শহরের ভেতরে বাসের ভাংতি ভাড়াও বেড়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, এক টাকা ও দুই টাকার পণ্য না থাকলেও ভাংতি লেনদেনে এ মুদ্রাগুলোর ব্যবহার অনেক। এ মুদ্রাগুলো না থাকলে  বেশিরভাগ পণ্যেরই মূল্য অল্প অল্প করে বেড়ে যাবে। এতে মূল্যস্ফীতির উপর কিছুটা প্রভাব পড়বে। তাই সরকার নোট উঠিয়ে দিলেও কয়েন হিসেবে এ মুদ্রাগুলো রাখতে পারে। অথবা ধীরে ধীরে উঠানো যেতে পারে। কিন্তু একসাথে এক টাকা ও দুই টাকার মুদ্রা উঠিয়ে দিলে পাঁচ টাকার কম কিংবা পাঁচ টাকা ও দশ টাকার মধ্যে কোনো লেনদেন করা যাবে না। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও অনেক পণ্যের মূল্য রয়েছে পাঁচ টাকা ও দশ টাকার মধ্যে।

এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, আমাদের দেশে নগদেই বেশি লেনদেন হয়। সুতরাং ভাংতি লেনদেনের জন্য এক টাকা ও দুই টাকার মুদ্রার প্রয়োজন রয়েছে। এ মুদ্রাগুলো না থাকলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পণ্যের দাম বাড়াটাই স্বাভাবিক। তবে সরকার যদি মনে করে এ মুদ্রা উঠিয়েই দেয়া হবে, সেক্ষেত্রে ধীরে ধীরে তুলে নিতে পারে।