স্বস্তি নেই সাধারণ মানুষের। শান্তিতে নেই শিল্প-উদ্যোক্তারা। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেয়ার যে দায়ভার গ্রহণ করছেন ব্যবসায়ীরা, তা আর কতদিন বহন করতে পারবেন সে প্রশ্ন এখন মুখে মুখে। উদ্যোক্তারা শংকিত। টানা অবরোধ-হরতাল চলতে থাকলে কলের চাকা সচল রাখাই মুশকিল হয়ে পড়বে।
কাঁচামাল ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিপর্যয় ঘটায় রফতানি আদেশ সঠিকভাবে প্রতিপালন করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। এ অবস্থায় আমদানিকারকরা ছুটছেন ভিন্ন গন্তব্যে। প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে গেলে বাংলাদেশের রফতানি আয়ের লক্ষ্য পূরণ হবে না। তাতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার বদলে ব্যাংক ঋণের বোঝা নিয়ে উদ্যোক্তার খেলাপি হওয়ার আশঙ্কাই স্বাভাবিক।
এমনিতেই ব্যাংকের উচ্চসুদের হার ও জ্বালানি সংকটে কারখানাগুলো যথাযথ উত্পাদন করতে পারছে না। বিদ্যমান অবরোধ অবস্থায় সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দুশ্চিন্তাই বাড়ছে। উদ্যোক্তাদের মতে, বিদ্যমান অস্থিরতা চলতে থাকলে দেশকে মধ্য আয়ের দেশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য পূরণতো হবেই না বরং বছর শেষে জাতীয় আয়ও কমে যাবে। তারা জানান, এমনিতে রাজনৈতিক ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে বহুজাতিক কিছু কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেনি। বিদ্যমান বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখানে ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী হচ্ছেন না যা দেশের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘ব্যাড সিগন্যাল’ বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলমান সহিংসতায় অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি ক্ষেত্রেই অপরিসীম ক্ষতি হচ্ছে। ডিসেম্বর ২০১৪ ও জানুয়ারি ২০১৫ সালে এ পর্যন্ত ৪ শতাধিক গাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে। যানবাহনই শুধু নয়, বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা, এটিএম বুথসহ অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানও হরতাল-অবরোধের কারণে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে।
সম্ভাবনাময় বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারা জানান, এমনিতেই তীব্র প্রতিযোগিতা করে টিকে আছে এই খাত। হরতাল-অবরোধে বস্ত্রখাতের কাঁচামাল সুতার উত্পাদনে বিঘ্ন ঘটছে। এসব শিল্প কারখানা লোকসানে পড়ে গেলে বিপুল পরিমাণ পুঁজি আটকে যাবে। শ্রমঘন এই শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগও নষ্ট হবে। বস্ত্রখাতের উপখাত স্পিনিং শিল্প হরতাল-অবরোধে কঠিন পরিস্থিতি পার করছে। অবরোধের কারণে এ উপখাতের পুরো সাপ্লাই চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মিল থেকে সঠিক সময়ে সুতা পাঠানো যাচ্ছে না। স্থানীয় স্পিনারদের নিজস্ব পরিবহন থাকলেও বর্তমান টালমাটাল পরিস্থিতিতে অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে পরিবহন রাস্তায় নামাতে চাচ্ছেন না।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল্স এসোসিয়েশনের পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, সঠিক সময়ে সুতা না পাওয়ায় গার্মেন্টস শিল্পের কাঁচামালও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে বস্ত্র উত্পাদকরা সঠিক সময়ে সুতার দাম পরিশোধ করলেও বর্তমান জটিলতার কারণে গার্মেন্টস মালিকদের কাছ থেকে সময়মত পাওনা অর্থ আদায় করা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে এই শিল্পের জন্য বৈরি অবস্থা বিরাজ করছে।
একইভাবে অন্যান্য খাতেরও অবস্থা সঙ্গীন। শুধু পণ্যবাহী যান নয়, যাত্রীবাহী যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় মানুষের যেমন ভোগান্তি ঘটছে, তেমনি পরিবহন মালিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পরিবহনের সঙ্গে চালক ও সহযোগীদের দৈনিক আয়ের বিষয়টি জড়িত। এর সঙ্গে রয়েছে লাখ লাখ পরিবার। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনেকে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় বের হলেও আতঙ্কে সড়কে চলাচল করছে। পণ্যবাহী বড় যান এখন অবরোধাকারীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ লং ভেহিক্যাল ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ বখতিয়ার গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, গত সোমবার চট্টগ্রামের বার আউলিয়া এলাকায় আমার ২টি গাড়ি আক্রান্ত হয়। অবরোধকারীরা গাড়ির চালককে নামিয়ে পিটিয়ে গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগের দিন ৩টি যানবাহন আক্রান্ত হয়। এ পরিস্থিতিতে রাস্তায় এখন পণ্যবাহী পরিবহন ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, ‘১৭ থেকে ১৮ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনি। এ লোকসানের দায়ভার কে নেবে?’
খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। পরিবহন সংকটের কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শাকসবজি। এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে পাঠানো সম্ভব না হওয়ায় কৃষকও বঞ্চিত হচ্ছে ন্যায্যমূল্য থেকে। গত কয়েক বছর ধরেই দেশে খাদ্যপণ্য মূল্য স্থিতিশীল থাকায় মূল্যস্ফীতি ছিল নিয়ন্ত্রণে। অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বীমা খাতের উদ্যোক্তারা জানান, বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বীমা শিল্পে প্রতিদিন আনুমানিক ১৫ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। ২০১৩ সালে হরতাল-অবরোধে বীমা খাতে ক্ষতির পরিমাণ ছিল হাজার কোটি টাকার বেশি। একই বছরে মোট জাতীয় আয়ে বীমার অবদান দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ কমে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে চলতি বছরে এ খাতের অবদান আরো কমবে বলে জানান ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ কবির হোসেন।
অর্থনীতিবিদরা বর্তমান পরিস্থিতিকে দু:সহ সামাজিক অস্থিরতার পূর্বাভাস বলে মন্তব্য করছেন। তাদের মতে, অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাজনীতি করতে হবে। কিন্তু রাজনীতির কারণে যদি অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সামাজিক শৃঙ্খলাহীনতা তৈরি হয়। অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী পোশাক শিল্পের উদাহরণ টেনে বলেন, এখাতে প্রায় ৩৫ লাখ নারী শ্রমিক কাজ করছেন। গার্মেন্টস শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এদের সামাজিক ও আর্থিক ক্ষমতায়ন হয়েছে। যদি প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে ভারতেও তৈরি পোশাকের বাজার চলে যায়, তবে এসব নারী কর্মহীন হয়ে পড়বেন। একই ভাবে অন্যান্য শিল্পখাতেও একই হাল হবে। আর যদি তাই হয়, এত বেকারত্বের ভিড়ে সুস্থির সমাজ প্রত্যাশা করবো কিভাবে?