প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছর ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, নির্বাচন দিলে তারা নির্বাচন করবে না। আবার অন্যকে নির্বাচন করতে দিবে না। নির্বাচন করতে দেয়া না হলে তখন কি হবে? তার দৃষ্টান্ত প্রতিবেশী এক দেশে দেখেছি। আমরা দীর্ঘদিন এ ধরনের পরিবেশে মার্শাল ল’ দ্বারা শাসিত হয়েছি। তাহলে কি আবার বাংলাদেশে মিলিটারি ডিক্টেটর বা অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতার পালাবদল হতে দিবো? সেটা তো হতে দিতে পারি না। গতকাল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বক্তব্যদানকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে দেশবিরোধী যে কোন অপপ্রচার সম্পর্কে সজাগ ও সচেতন হতে হবে। দেশের বর্তমান অবস্থায় কিছু কিছু ঘটনা, অপপ্রচার ‘কালো মেঘের’ মতো। এই মেঘ কেটে যাবে। কিন্তু সবাইকে সজাগ থাকা দরকার। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমরা মোকাবেলা করছি। ঠিক তেমনি মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ, কালো মেঘ মোকাবেলা করব। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এজন্য সতর্ক থাকতে হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। তারা ব্রিফিং অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা অবস্থান করেন। তিনি মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে অবহিত হন। পররাষ্ট্র সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ডিজিটাল পদ্ধতিতে মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। মন্ত্রণালয়ের সার্বিক কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ২০২১ সালে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত করা আমাদের লক্ষ্য। আমরা চাই পররাষ্ট্র সার্ভিসের কর্মকর্তারা বহির্বিশ্বে একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। বাংলাদেশকে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড হিসাবে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন জাতির পিতা দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন পূরণে সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতির মূলকথা ছিল ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়।’ মাত্র সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় থেকে তিনি এ দেশকে বহির্বিশ্বে ব্যাপকভাবে পরিচিত করেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব এবং আমাদের কূটনীতিকদের নিরলস পরিশ্রমের ফলে স্বাধীনতার অল্পদিনের মধ্যেই কয়েকটি ছাড়া বিশ্বের প্রায় সব দেশের স্বীকৃতি আদায় করা হয়। যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য পদ লাভের মধ্য দিয়ে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে স্বপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে কূটনৈতিক সাফল্যের অগ্রযাত্রা থেমে যায়। অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পেশাদারিত্বকে অবজ্ঞা করে। জাতির পিতার হত্যাকারী ও জাতীয় চার নেতার খুনীদের বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক পদে নিয়োগ দিয়ে এই মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি সারাবিশ্বের কাছে কলঙ্কিত করে। মেধা বা যোগ্যতা নয়, দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যই হয়ে দাঁড়ায় সকল পদোন্নতি ও পোস্টিং এর একমাত্র মাপকাঠি। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে আবার সরকার গঠনের পর আমাদের কূটনীতিক একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে যায়। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হয়ে ওঠে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার অন্যতম হাতিয়ার। এ সময় আমরা ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদী ঐতিহাসিক গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদন করি। পার্বত্য শান্তি চুক্তির মধ্য দিয়ে পাহাড়ে দীর্ঘদিনের সংঘাত ও অশান্তির অবসান ঘটাই।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে প্রবাসীদের প্রতি সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তাদেরকে বিদেশে দেশের বিরুদ্ধে দুষ্টচক্রের অপপ্রচারের ব্যাপারে সতর্ক থাকা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে ব্যবসা বৃদ্ধি, বাণিজ্যের নতুন সুযোগ খুঁজে বের করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্টের পাশাপাশি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারের প্রয়াস চালাতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার জনশক্তি রফতানির জন্য স্বচ্ছ ব্যবস্থা প্রবর্তনের পদক্ষেপ নিয়েছে। স্মার্ট কার্ড চালু করা হয়েছে। যা একজন ব্যক্তি সম্পর্কে সব তথ্যের যোগান দেবে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে কেউ যেন বিদেশে যেতে না পারে সে পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। এখন প্রবাসীদের প্রয়োজন দূতাবাসে কর্মরতদের পক্ষ থেকে ভাল ব্যবহার।
তিনি বলেন, কিছু সংবাদপত্রে ছবি ছাপা হচ্ছে এতে দেশের বাস্তব ছবি উঠে আসছে না। আওয়ামী লীগ সরকার দেশে আধুনিক প্রযুক্তি এনেছে, এখন এই প্রযুক্তি আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে।
গত এক বছর ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের জয়ের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি এসোসিয়েশন (সিপিএ) এবং আন্তঃ পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) এর নির্বাচনে ও একই সময়ে ২০১৪ সালে বাংলাদেশের নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভূতপূর্ব সমর্থন করেছে। এটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের জন্য প্রতিটি দেশে নিজস্ব ভবন হবে। দেশের অর্থনীতি আগের তুলনায় এখন ভালো, বিশাল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং খাদ্য মজুদ আছে, তাই এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কোন সঙ্কট হবে না, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।