আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যুতে মা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে গিয়ে বন্ধ গেট থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফিরে যাওয়ার ঘটনা ছিল রবিবারের টক অব অব দ্য কান্ট্রি। রাজনৈতিক অঙ্গন, অফিস-আদালত, চায়ের দোকান, ফুটপাথ-সর্বত্রই ছিল এনিয়ে আলোচনা-সমালোচনা।
প্রবল বিতর্কের ঝড় বইছে সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও। কার লাভ-কার ক্ষতি, কে হারলেন-কে জিতলেন, কে সঠিক-কার ভুল, এসব নিয়ে চলছে বহুমুখী বিশ্লেষণ।
আলোচনা-বিতর্ক থেকে যে বিষয়টি প্রস্ফুটিত, তা হচ্ছে- প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে ফিরিয়ে দেয়ায় সাধারণ মানুষ মর্মামত। বিশেষ করে, তুলনামূলকভাবে দলনিরপেক্ষ নাগরিকরা রাজনৈতিক সংস্কৃতি, শিষ্টাচার নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। একইসঙ্গে শত অনিশ্চয়তার মধ্যেও এতদিন জাগ্রত থাকা সংলাপের প্রত্যাশায় নতুন করে কালো মেঘের আবরণ পড়লো বলেও মন্তব্য উঠে এসেছে।
যারা দেশ, সমাজ, গণতন্ত্র ও সাধারণ নাগরিকদের নিয়ে ভাবেন, বিভিন্ন ফোরামে কথা বলেন-তারাও কতটা হতাশ, এর প্রমাণ মেলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের কণ্ঠে। বিষয়টি নিয়ে ইত্তেফাকের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বাক্যালাপে তিনি বলেন ‘কারও কাছে আমাদের কোনো প্রত্যাশা নেই। এসব নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই। কারও ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে কথা বলতেও ইচ্ছা হয় না।’
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী যাবেন-এই খবর প্রকাশ, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাসের প্রথম দফার প্রেস ব্রিফিং, গুলশান কার্যালয়ের ফটকের সামনে প্রধানমন্ত্রীর চলে যাওয়া ও রাস্তায় কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে অপেক্ষার পর ফিরে যাওয়া এবং এরপর শিমুল বিশ্বাসের দ্বিতীয় দফা প্রেস ব্রিফিং থেকে শুরু করে পুরো ঘটনার আদ্যোপান্ত চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে সর্বত্র। ঘটনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের পারস্পরিক দোষারোপ এবং বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সরাসরি সম্প্রচারিত দৃশ্যপট ও বাস্তবতা কিছুই বিশ্লেষণের বাইরে থাকছে না।
বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এক বিবৃতিতে বলেছেন ‘প্রধানমন্ত্রীর আসাটা ছিল রাজনৈতিক ছলনা’। তবে সতর্ক পর্যবেক্ষকসহ সাধারণ লোকজনকে গতকাল বিভিন্ন স্থানে বলতে শোনা গেছে, প্রধানমন্ত্রী যতক্ষণ গুলশান কার্যালয়ের সামনে ছিলেন, অর্থাত্ গাড়ি থেকে নামা ও পরে আবার ওঠা পর্যন্ত তার মুখের ভাষা পড়লে দেখা যাবে, কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত প্রধানমন্ত্রীর মুখের অভিব্যক্তিও ছিল শোকাবহ, ছিল এক ধরনের অসহায়ত্বের ছাপ।
বিভিন্ন স্থানে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে নানামুখী বিশ্লেষণের একটি পয়েন্টে সকল দল-মতের প্রায় সবাই একমত। তা হচ্ছে, আগে-পিছে যাই থাকুক, যাই ঘটুক, নেপথ্যে রাজনীতি থাকুক বা না থাকুক-দেশের প্রধানমন্ত্রী পৌঁছে যাওয়ার পর বন্ধ গেট না খুলে তাকে এভাবে রাস্তা থেকে ফিরিয়ে দেয়ার পক্ষে কোনো যুক্তি নেই। এটি এদেশের সাধারণ রীতি, সংস্কৃতি ও সৌজন্যতার সঙ্গেও সম্পূর্ণ বেমানান।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ সর্বত্র-ই যে বিষয়টি আলোচনা হচ্ছে তা হলো, খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ থাকলেও এবং তাকে চিকিত্সক ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখলেও (শিমুল বিশ্বাসের দাবি অনুযায়ী) ভেতরে নিয়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে নিরবে তাকে একনজর দেখার সুযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা ছিল না।
শুধু সাধারণ মানুষই নন, বিষয়টি যে ঠিক হয়নি- তা দেরিতে হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে বিএনপিও। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ রাতে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্যতা না দেখানো ঠিক হয়নি।’ প্রধানমন্ত্রী যখন ওই কার্যালয়ের সামনে দাঁড়ানো, তখন অন্য কয়েকজন নেতার সঙ্গে ভেতরে মওদুদ আহমদও ছিলেন।
প্রেসব্রিফিংয়ে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা দাবি করে বলেন ‘প্রধানমন্ত্রী যে এসেছেন তা বিএনপি চেয়ারপানসনও জানতেন না, আমরাও জানতাম না। খালেদা জিয়া তখন অজ্ঞান ছিলেন। ফটকে তালা দেয়ার বিষয়েও দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা কিছু জানতেন না।’
অবশ্য ২০ দলীয় জোট শরিক এলডিপি সভাপতি ড. কর্নেল অলি আহমদ (অব.) এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার ছেলে হারানোর শোক নিয়ে রাজনীতি করার কোনো অবকাশ নেই। এটি নিয়ে জনগনকে বিভ্রান্ত করা ঠিক হবে না।
’ রবিবার বিকেলে সমবেদনা জানানোর পর খালেদা জিয়ার কার্যালয় থেকে বের হয়ে তিনি গণমাধ্যমকে বলেছিলেন ‘বেগম জিয়াকে আমি দেখেছি’। তার এই মন্তব্যও সাধারণ্যের আলোচনায় এসেছে। বলা হচ্ছে, অলি আহমদসহ অনেকেই যদি খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে পারেন তাহলে প্রধানমন্ত্রীর জন্য কেন গেইট বন্ধ করে দেয়া হলো। মূলত এজন্য দেয়া ব্যাখ্যায় অলি আহমদ বলেন ‘আমি স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে খালেদা জিয়ার অফিস রুমে প্রবেশ করে ওনাকে মূমুর্ষ অবস্থায় দেখি। ঐ রুমে ওনার নিকট আত্মীয় ছাড়া কেউ উপস্থিত ছিলনা। রুমে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। আমার জানা মতে পরবর্তীতে তিনি কারো সঙ্গে দেখা করেননি।
’ উল্লেখ্য, বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট নেতাদের অনেকেই প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার আগে-পরে নির্বিঘ্নে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে যাতায়াত করেছেন। পুত্রশোকে খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কারণে তাদের কাউকেই ফিরিয়ে দেয়া হয়নি।
