দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর পর ফতোয়া নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় গতকাল রবিবার প্রকাশিত হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, স্বীকৃত ধর্মীয় বিদ্যায় শিক্ষিত ব্যক্তিরাই কেবল ফতোয়া দিতে পারবেন। কিন্তু এই ফতোয়া কার্যকর করার ক্ষেত্রে কোন ধরনের বল প্রয়োগ বা প্রভাব বিস্তার করা যাবে না। শারীরিক বা মানসিক শাস্তি হয় এমন কোন কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। এছাড়া দেশের আইন ভঙ্গ হয় বা কোন ব্যক্তির সম্মান বা মর্যাদাহানি হয় এমন কিছু ফতোয়ার মাধ্যমে করা যাবে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে দেয়া এ রায় লিখেছেন আপিল বিভাগের বিচারক বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। এর সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এস কে সিনহা) ও বিচারপতি মো. ইমান আলী। রায়ের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে অভিমত দিয়েছেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা। গতকাল সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে পূর্ণাঙ্গ এ রায় প্রকাশিত হয়।
বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক রায়ে লিখেছেন, একজন মুফতি, মাওলানা অথবা ইমাম ফতোয়া ঘোষণা করতে পারেন, যদি তাকে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু তিনি দেশের কোন আইন ভঙ্গ করতে পারেন না। একইসঙ্গে তাকে অন্যদের ফতোয়া বা মতামতের ব্যাপারেও শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে।
২০০০ সালে নওগাঁ জেলার মৌলভী আজিজুল হক জনৈক ব্যক্তি কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক দিয়ে শরীয়া আইন অনুযায়ী পুনরায় গ্রহণ না করার ঘটনায় ফতোয়া জারি করেন। বিষয়টি বাংলাবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হলে তা হাইকোর্টের দৃষ্টিতে আসে। আদালত এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে স্বঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করে। ২০০১ সালের জানুয়ারি মাসে ফতোয়া অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। বিচারপতি গোলাম রাব্বানী ও বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার (বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারক) সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ফতোয়াকে অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করে।
হাইকোর্টের ওই রায়ে বলা হয়, একমাত্র আদালতই মুসলিম বা অন্য কোনো আইন অনুযায়ী ব্যাখ্যা বা মতামত দিতে পারে। আইন বহির্ভূতভাবে কেউ ফতোয়া দিলে তা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। রায়ে সব মসজিদের ইমামকে শুক্রবার জুমার খুতবায় ও স্কুলে এবং মাদ্রাসায় মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা করারও সুপারিশ করা হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে মুফতি মো. তৈয়ব ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ওই বছরই আপিল দায়ের করেন। আপিল দায়েরের দশ বছর পর ২০১১ সালের মার্চ মাসে এর ওপর শুনানি শুরু হয়। আপিলের শুনানিতে অ্যামিকাসকিউরি হিসেবে শীর্ষ নয় আইনজীবী ও পাঁচ আলেমের মতামত নেয় আপিল বিভাগ। আপিলের শুনানি শেষে ওই বছরের ১২ মে আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে চারটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করে। আপিল আংশিক মঞ্জুর করে দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ১. ধর্মীয় বিষয়াদিতে শুধু সঠিক শিক্ষিত ব্যক্তিগণ ফতোয়া দিতে পারবেন। যা শুধু স্বেচ্ছায় গ্রহণযোগ্য। কিন্তু যে কোন রকমের বল প্রয়োগ বা অনুচিত প্রভাব প্রয়োগ করা যাবে না। ২. কোন ব্যক্তির অধিকার, মর্যাদা বা সম্মান (যা দেশের আইনের গণ্ডির আওতায় আসে) বিনষ্ট করে এমন ফতোয়া দেয়া যাবে না। ৩. ফতোয়ার মাধ্যমে কোন ব্যক্তিকে কোন ধরনের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেয়া যাবে না। ৪. নির্দিষ্ট ফতোয়াটি অবৈধ ও বাতিল করে হাইকোর্টের দেওয়া ঘোষণা বহাল রাখা হলো।
এদিকে, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা তার অভিমতে বলেছেন, হাইকোর্ট বিভাগ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের আওতায় স্বঃপ্রণোদিত হয়ে রুল ইস্যু করতে পারে বলে রায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির যে অভিমত দিয়েছেন তার সঙ্গে আমি একমত নই। একইসঙ্গে তিনি আপিল মঞ্জুর করে হাইকোর্টের পূর্বে দেয়া রায়টি বাতিল করে দিয়েছেন।