সহিংসতার বিরূপ প্রভাব শিশু-কিশোরদের মনে

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০১৫, ০০:০০

অবরোধ হরতালে সহিংসতায় কোমলমতি শিশু-কিশোরদের মনে নানা বিরূপ প্রভাব পড়ছে। অবরোধের কারণে রাজধানীসহ দেশের অধিকাংশ স্কুল বন্ধ। ফলে অনেক শিশুর সময় কাটছে ঘরে। অবরোধের কারণে বাইরে যাওয়ারও জো নেই। এক্ষেত্রে তাদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম টেলিভিশন। কিন্তু সুইচ অন করলেই তাদের সামনে নানা বিভীষিকাময় ছবি। পেট্রাল বোমায় পুড়ে যাওয়া মানুষের ছবি দেখে তাদের কোমল হূদয় শিহরিত হয়ে উঠছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অবরোধের চিত্র শিশুদের সামনে বিভীষিকার মতো। এর ফলে দীর্ঘ মেয়াদে তাদের মনে যে প্রভাব পড়ছে তা কাটতে অনেক সময় লাগবে।

বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ফরিদা আকতার ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘বাসায় বসে শিশুরা যখন অবরোধের সহিংসতা দেখে তখন তারা নিজেদের নিরাপত্তাহীন মনে করে। সহিংসতা নিয়ে আলোচনা করার ফলে এক ধরনের ভীতির সঞ্চার হয়।’ এক্ষেত্রে তিনি শিশুদের সামনে ইতিবাচক বিষয় আলোচনার জন্য বাবা-মা এবং অন্যদের পরামর্শ দিয়েছেন।
ফরিদা আকতার জানান, আমাদের দেশে হরতাল বা অবরোধে একটি গাড়িতে আগুন দিলে একটি টেলিভিশন চ্যানেল বারবার সে ফুটেজ প্রচার করে। বাচ্চারা ধরে নেয় এ ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটছে। আবার বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল একই ঘটনা প্রচার করলেও বাচ্চারা মনে মনে ধরে নেয় ঘটনা একাধিক। এটি বাচ্চাদের মনে সহিংসতা উস্কে দেয়। বন্ধুদের সাথে তারা পিস্তল পিস্তল খেলে। তিনি আরো বলেন, বাচ্চাদের সামনে অভিভাবকরা অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতার কথা আলোচনা করে। এতে তারা আরো ভয় পেয়ে যায় এবং নিজেদের অসহায় মনে করে। তারা মনে করে বাবা-মা এত শক্তিশালী, কিন্তু তারা নিজেরাও অসহায় বোধ করছে। 
রাজধানীর বেশ কয়েকটি পরিবারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অবরোধের কারণে শিশুদের স্কুল বন্ধ। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে অনেক আগেই। ক্লাস শুরু হওয়ার কথা ছিল আরো দেড় মাস আগে। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্কুল বন্ধ ঘোষণা করে দিয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার শিশুর সময় কাটছে বাসায় বসে। অবশ্য স্কুল কর্তৃপক্ষ অনলাইনে সিলেবাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হচ্ছে বাসায় বসে সিলেবাস অনুযায়ী পড়াশোনা চালিয়ে নেয়ার জন্য।
হূদিতা এবং আদ্রিতা পড়ে রাজধানীর গ্রিন হেরাল্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। প্রতিদিন সকালে তারা স্কুলে যেত। দুপুরে স্কুল থেকে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর তারা যেত প্রাইভেট পড়তে। ছুটির দিনে গাজীপুরে দাদার বাড়ি বেড়াতে যেত তারা। এখন সব বন্ধ। তাদের সময় কাটছে বাসায় টিভি দেখে। পরিস্থিতি ভালো না হওয়ায় মা-বাবাও তাদের বাইরে নিয়ে যেতে চান না।
একই অবস্থা রাজধানীর মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ছাত্রী মৃত্তিকা এবং আদৃতার। ডিসেম্বর থেকে তাদের স্কুল বন্ধ। কয়েকদিন পর পর স্কুল থেকে হোমওয়ার্ক দেয়া হয়। তাদের বাবা-মা বাসায় টিউিটর রেখে পড়া শেষ করছেন। গত দুমাস তারা কোথাও বেড়াতে যেতে পারেনি। বাবা-মা সাহস করছে না তাদেরকে বাইরে নিয়ে যেতে। এখন তাদের সময় কাটছে বাসায় টেলিভিশন দেখে। এখানেও বিপত্তি। টিভির সুইচ অন করলেই পেট্রোল বোমায় আহতদের ছবি। গত কয়েকদিন ধরে তারা কান্নাকাটি করছে বাসার বাইরে যেতে। কিন্তু বাবা-মা ভরসা পাচ্ছেন না তাদেরকে বাইরে নিতে।
ঢাকার একটি দৈনিকে সাংবাদিকতা করেন ইফতেখার মাহমুদ। ছেলে তাপোয়ান মাহমুদকে গত জানুয়ারি মাসে ভর্তি করিয়েছেন রাজধানীর মিরপুরের কিডস জি স্কুলে। তখন থেকেই তাদের ক্লাস শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু অবরোধের কারণে স্কুল কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করেছে। কবে স্কুল খুলবে তাও বলতে পারছে না কেউ। মিরপুরের মেহরাজ হায়দার এবার এ লেভেল পরীক্ষার্থী। তার অভিভাবক পদার্থবিজ্ঞান  বিষয়ে পরীক্ষা বাবদ ফি জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু হরতালের কারণে সে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু ব্রিটিশ কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, আগামী মে মাসে আবার পরীক্ষা দেয়া যাবে। তবে তাকে আবার ফি জমা দিতে হবে। এই অবস্থা সকল এ লেভেল ছাত্রছাত্রীর।
এদিকে হরতাল-অবরোধে শিশুদের স্কুল বন্ধ থাকলেও স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রতিমাসের বেতন এবং টিউশন ফি নিয়মিত আদায় করে নিচ্ছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ অনলাইনে শিশুদের হোমওয়ার্ক দিয়ে দিচ্ছে। মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে সেটা আবার জানিয়েও দিচ্ছে।
অপরদিকে অবরোধ এবং হরতালের কারণে শুধু শিশুদের স্কুল নয়, বিনোদনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রায় এক মাস ধরে তারা প্রায় গৃহবন্দী। বাইরের সহিংসতার ভয়ে অভিভাবকরা তাদের ঘরের বাইরে নিতে চান না। অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার পর যারা শিশুদের নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তারা তাদের পরিকল্পনা বাদ দিয়েছেন।

বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ থাকায় তাদের জীবন থেকে শৃঙ্খলা চলে যাচ্ছে বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানীরা। ফরিদা আকতার বলেন, ‘যে বাচ্চাটি সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা সেরে স্কুলে যেত, সে বাচ্চাটি এখন কখন ঘুম থেকে উঠছে, কখন নাস্তা করছে তার ঠিক নেই। এতে তার জীবনে চরম বিরক্তির জন্ম হচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে এ অবস্থা চলতে থাকলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা মুশকিল হবে। তবে এই সময়ে বাচ্চাদের বিভিন্ন কাজে মনোনিবেশ করে রাখা এবং বাচ্চাদের বিভিন্ন ইতিবাচক গল্প শোনাতে হবে।’