মিরপুরে অ্যাপকো ভবনে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৩

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০১৫, ২৩:৪০

রাজধানীর মিরপুরে অ্যাপকো ভবনে অগ্নিকাণ্ডে  ১৩ জন নিহত হয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় অ্যাপকো বাংলাদেশ লিমিটেড নামের একটি প্লাস্টিক ডিসপজাল ডিশ তৈরির কারখানার বয়লার বিস্ফোরিত হলে আগুন লাগে। ঘটনার সময় ঐ প্রতিষ্ঠানের কারখানা ও গোডাউনে ৩২ জন কাজ করছিলেন।

বয়লার বিস্ফোরণে কারখানায় প্রবেশ গেটে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কাভার্ড ভ্যান ও লেগুনায় আগুন ধরে যায়। এতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট পৌনে দুই ঘন্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কারখানা থেকে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ ৯টি লাশ বের করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠায়। আহত অবস্থায় চারজনকে পাঠানো হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিত্সকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন। পঙ্গু হাসপাতালে একজনকে নেয়া হলে তাকেও চিকিত্সকরা মৃত ঘোষণা করেন। অগ্নিদগ্ধ দুইজনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। এরা হলেন নিরাপত্তা প্রহরী তৌহিদুল ইসলাম ও কামাল হোসেন। এদিকে রাত দশটার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে ১৩টি লাশ ও একটি খণ্ডিত পা রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে ধারণা করা হচ্ছে এ ঘটনায় ১৪ জন নিহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিস জানায়, ১ নম্বর সেকশনের সনি সিনেমা হলের পাশে চিড়িয়াখানা রোডের ২১/২, মিরপুর ইন্ডাষ্ট্রিয়াল এস্টেটে চারতলা ভবনে ওই কারখানা অবস্থিত। এটির মালিক আনিসুজ্জামান খান। কারখানায় ডিসপজাল ডিশ তৈরি হয়। এই ভবনের নিচতলায় কারখানার বয়লার ও অন্যান্য মেশিন। দোতলা থেকে চারতলা পর্যন্ত কারখানার গোডাউন।
প্রত্যক্ষদর্শী জাহিদ হাসান জানান, সন্ধ্যা পৌনে ৬ টার দিকে কারখানার নিচতলায় পরপর দুই বার প্রচণ্ড শব্দে বয়লার বিস্ফোরিত হয়। কারখানায় ২২ জন পুরুষ ও ১০ জন নারী কর্মরত ছিলেন। তিনি জানান, বয়লার বিস্ফোরণের কিছু সময় আগে কারখানার প্রবেশগেটে একটি কাভার্ড ভ্যান ও লেগুনা দাঁড়ানো ছিল। দুটি গাড়িতে করে পলিথিন সামগ্রী এনে কারখানায় নামানোর কাজ চলছিল। কারখানার প্রবেশ গেটে গাড়িতে আগুন ধরে যাওয়ায় ভিতরে কর্মরত কর্মচারীরা বের হতে পারেননি। অনেকেই নিচতলা থেকে চারতলায় গিয়ে আশ্রয় নেয়।
ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ জানান, ঘটনার পর পর ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়। কারখানার ভিতরে রাসায়নিক উপাদান ছিল বলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে আগুনের লেলিহান শিখার পাশাপাশি প্রচণ্ড ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। 
সিকিউরিটি গার্ড আব্দুল হাই জানান, কাভার্ড ভ্যান থেকে মালামাল নামানোর সময় তিন শ্রমিক আগুনে পুড়ে মারা যান। কাভার্ড ভ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মন্টু নামে একজন নিরাপত্তা প্রহরী ঘটনাস্থলেই মারা যায়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান বলেন, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কারখানার ভিতরে বিভিন্ন স্থানে মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছড়িয়ে আছে। তবে এখন পর্যন্ত ৮টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
তিন লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। এদের মধ্যে দুইজন নারী এবং অপরজনের লাশ পুরোপুরি পুড়ে গেছে বলে শনাক্ত করা যায়নি।
অ্যাপকো লিমিটেডের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ মমিনুল ইসলাম টুটুল  বলেন, বয়লার বিস্ফোরণে কারখানায় আগুনের সূত্রপাত হয়। তবে কতজন মারা গেছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রাত ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মীরা গ্যাস মাস্ক মুখে দিয়ে কারখানায় প্রবেশ করেন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে সেখানে লাশ বহনের জন্য ৬টি বডিব্যাগ আনা হয়। সেগুলো কারখানার ভিতরে নেয়া হবে। তবে রাত ৯টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সেখান থেকে কোন লাশ বের করা হয়নি।
অন্যদিকে, অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আসলামুল হক ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিনা ইয়াসমিন তুহিন। আসলামুল হক বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হতাহতের ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড থেকে সতর্ক থাকার জন্য মিরপুর এলাকা থেকে ইন্ডাস্ট্রি সরিয়ে নেয়া যায় কিনা সে ব্যাপারে আলোচনা করা হবে।
তদন্ত কমিটি গঠন
শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মজিবুল হক চুন্নু অগ্নিকাণ্ডের স্থান পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্ত করতে কলকারখানা পরিদর্শন অধিদফতরের মহাপরিচালক ইকবাল হোসেনকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।
জাতীয় পার্টি- জেপি’র শোক

মিরপুরে অগ্নিকাণ্ডে নিহতের ঘটনায় জাতীয় পার্টি-জেপি’র চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও  মহাসচিব ও সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে জেপি’র নেতৃদ্বয় আহতদের সুচিকিত্সার দাবি জানান। নিহতদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। এছাড়াও ঢাকা মহানগর জাতীয় পার্টি-জেপি’র আহ্বায়ক আব্দুর রহিম ও সদস্য সচিব মফিজুল হক বেবু শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।