বাঙালির জীবনে আবারো ফিরে এলো নতুন বইয়ের গন্ধজড়ানো মাদকতাময় মাস। শুরু হলো বাঙালির প্রাণের মেলা ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’।
বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে যারাই আসবেন সবারই মন ভরে যাবে। যারা প্রতিবছর ঘিঞ্জি ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকা স্টল দেখে বিরক্ত, এবার তারা অবাক হবেন। সুন্দর স্টল বিন্যাস, প্যাভেলিয়নের ডিজাইন মন কেড়ে নেবে যে কারো। শুধু বই কেনার জন্যই নয়, কিছু সময় কাটানোর জন্য, আড্ডা দেয়ার জন্যও অনেক জায়গা রেখেছে মেলা কর্তৃপক্ষ। গত বছর মেলার পরিসর বড় করে মূল অংশটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সরকারি-বেসরকারি প্রকাশনী প্রতিষ্ঠানের বাইরে শুধু শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশক ও লিট্ল ম্যাগাজিন কর্নার স্থান পেয়েছে একাডেমি প্রাঙ্গণে। বাকী সৃজনশীল সব প্রকাশকের স্থান হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান চত্বরে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে বইমেলাকে এতটাই সুন্দর করে সাজিয়ে তোলা হয়েছে যে, এবার মেলায় ভিড়ে ঠেলাঠেলি করবার প্রয়োজন পড়বে না। মেলায় ঘুরে বেড়ানোর, স্টলে স্টলে ঘুরে ক্লান্ত লাগলে আছে বসে জিরিয়ে নেবার বেঞ্চ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’ যাতে মেলা থেকে পরিষ্কার দেখা যায় তাই নিরাপত্তা দেয়ালের একটি অংশে স্বচ্ছ প্লাস্টিক বোর্ড দেয়া হয়েছে। এতে সন্ধ্যার পরে স্বাধীনতা স্তম্ভের আলো এসে পাল্টে দেবে মেলার পরিবেশ। বাংলা একাডেমি এই বিন্যাসের জন্য ধন্যবাদ পেতেই পারে।
এখনো মেলা পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে সময় লাগবে। চলছে দোকানগুলোকে সাজিয়ে তোলার কাজ। মেলার প্রথমদিন তাই এখনো চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে প্রস্তুতির চিহ্ন—কাঠ, বাঁশ প্রভৃতি। ছিল ধুলোর ওড়াউড়ি। কিন্তু এসব কিছু ছাপিয়ে পাঠকের বইয়ের প্রতি আগ্রহই বেশি দেখা গেল। স্টলে স্টলে গিয়ে পাঠকরা নেড়েচেড়ে দেখছেন বই। অনেকে খোঁজ করছেন তার প্রিয় লেখকটির বই এসেছে কি না। প্রথমদিনেই প্রিয় লেখকের বইটি হাতে পাবার আগ্রহ। হোক অল্প, কিন্তু বই বিক্রি শুরু হয়ে গেছে বইয়ের স্টলগুলোতে। প্রিয় লেখকের নতুন বইয়ের মনমাতানো ঘ্রাণ বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন সবাই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেলা উদ্বোধন করার পর পরই পাঠকের আনাগোনা মেলায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করলো যেন। উত্সুক নয়ন মেলে হাজার খানেক মানুষ অপেক্ষায় ছিলেন আগে থেকেই। বইমেলার দ্বার উন্মোচন হতেই ছড়িয়ে পড়লো বইপ্রেমিক। প্রাণের মেলা–বইয়ের মেলা পরিণত হলো মানুষের মেলায়। এই যে এত আয়োজন, নতুন প্রকাশনা, এত অনুষ্ঠান আয়োজন, উদ্বোধনের এত ঘটা– এসব কিছুই তো পাঠককে উদ্দেশ করেই। সেই পাঠকের আগ্রহ নিয়ে মেলায় ছুটে আসা ভরিয়ে দেয় প্রাণ। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য মেলা উন্মুক্ত করার অনেক আগে থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও দোয়েল চত্বর এলাকায় জড়ো হয় অনেক দর্শনার্থী, যাদের অধিকাংশই তরুণ।
প্রথমদিনেই মেলায় এসেছে স্বনামধন্য লেখকদের বেশকিছু বই। তবে স্বনামধন্য প্রকাশনী সংস্থাগুলো ছাড়া অন্যান্য প্রকাশনীর বই এখনো মেলায় আসেনি। অন্যপ্রকাশের অন্যতম স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম বললেন, এবারের মেলা পাঠকের সুবিধার কথা বিবেচান করে সাজানো হয়েছে। ভিড়ের বিড়ম্বনা সহ্য করতে হবে না বলেই আশা করছি। তাছাড়া হরতাল-অবরোধ মেলায় প্রভাব ফেলবে না বলেই মনে করছেন তিনি। মাওলা ব্রাদার্সের প্রকাশক আহমেদ মাহমুদুল হক বললেন ভিন্ন কথা। তিনি হরতাল-অবরোধ নিয়ে চিন্তিত। বললেন, ঢাকার বাইরের পাঠকরা যদি আসতে না পারেন তবে মেলায় বই বিক্রিতে ভাটা পড়বে। ঢাকার ক্রেতারা মেলায় না হোক পরে বই কিনতে পারেন কিন্তু ঢাকার বাইরে থেকে অনেকেই আসেন শুধু বইমেলায় বই কিনবেন বলে।
মেলায় নতুন বই
গতকাল মেলায় বেশকিছু স্টলেই নতুন বই এসেছে। আগামী প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র লেখা বই ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’, মওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের বই ‘প্রবন্ধ সমগ্র-১ ও ২’, অনন্যা প্রকাশ থেকে বের হয়েছে কবি মহাদেব শাহা বই ‘ভুলে যাওয়ার চেয়ে ভালো কিছু নেই’, অন্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে-কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের উপন্যাস বই ‘স্বপ্নের বাজপাখি’, আতিউর রহমানের ‘তব ভুবনে তব ভবনে’ এবং নূরজাহান সরকারের আত্মজীবনীমূলক বই ‘স্মৃতির জানালা’। কিন্তু গতকাল তথ্যকেন্দ্র কোন তালিকা প্রকাশ করেনি। তবে এবছর বাংলা একাডেমি ৯৫টি নতুন বই প্রকাশ করেছে। মেলায় বাংলা একাডেমির বই ৩০ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে। আর অন্যান্য স্টল বই বিক্রি করবে ২৫ শতাংশ কমিশনে।
আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে
আজকের অনুষ্ঠান
সকাল ১০টায় শুরু হবে সম্মেলন। প্রথম অধিবেশনে ধারণাপত্র উপস্থাপন করবেন সৈয়দ শামসুল হক, বিষয় ‘এই সময়ের সাহিত্য:কথাসাহিত্য’, আলোচক হাসান আজিজুল হক, রাহাত খান, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত এবং নবনীতা দেব সেন। দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, তৃতীয় অধিবেশনে আলোচনা করবেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে সেলিনা হোসেনের আলাপচারিতা। চতুর্থ অধিবেশনে রয়েছে সাহিত্য থেকে পাঠ ও আলোচনা। আলোচনা করবেন পূরবী বসু, আনোয়ারা সৈয়দ হক, ইমদাদুল হক মিলন, নবনীতা দেব সেন, মঈনুল আহসান সাবের, নাসরীন জাহান, আনিসুল হক, জাকির তালুকদার, ইমানুল হক। সভাপতিত্ব করবেন ফাদার পল দ্যতিয়েন। পঞ্চম অধিবেশন হচ্ছে ইংরেজি পর্ব। এতে অংশ নেবেন মঞ্জু ইসলাম এবং কাজি আনিস আহমেদ নিয়াজ জামানের আলাপচারিতা।
