কোকিলের ডাক কি শোনা গেল? নাই যাক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছে গাছে পাখির কুজন ঠিক শোনা যাচ্ছিল। মাঘ মাস। অথচ দুপুরে রোদের তেজ আছে ভালোই। বিকাল গড়াতে ঠাণ্ডা হিমেল স্পর্শ। বইমেলার চিরচেনা সরগরম পরিবেশের বদলে শান্ত ছিমছাম পরিবেশ টিএসসি থেকে বাংলা একাডেমির পথে। স্নিগ্ধতা ঘিরে রেখেছে চারপাশ। হকারদের হট্টগোল নেই, নেই হকারদের বিরক্তিকর ডাকাডাকি। বদলে যাওয়া বইমেলায় যেন এই শান্ত স্নিগ্ধ পথটি আমন্ত্রণ জানাচ্ছে প্রাণের উত্সবে মেতে উঠবার আমন্ত্রণ।
দ্বিতীয় দিনেই মেলা গুছিয়ে উঠেছে। ফিরে এসেছে চিরচেনা পরিবেশ। পানি ছিটানোর কারণে ধুলো নেই। সুন্দর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। অভ্যাসবশে বাংলা একাডেমি চত্বরে প্রবেশ করলেও এরপর পাঠকরা ঠিকই চলে এসেছেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার মূল অংশে। কারণ এখানেই সৃজনশীল প্রকাশকদের স্টল। মাত্রই শুরু হওয়া মেলায় কিছু অব্যবস্থাপনা রয়েছে, কিন্তু সেসব কোন বাধা হয়নি বইয়ের টানে ছুটে আসা দর্শনার্থীদের।
যারা বইয়ের গন্ধ ভালোবাসেন, ভালোবাসেন পড়তে তারা ঠিকই এসেছিলেন মেলায়। হরতালের বাধা কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বিকালে মেলা ঠিকই জমে উঠেছিল। শিশু-কিশোররা যেমন এসেছে মা-বাবার সঙ্গে, তেমনি যুবক-যুবতীরাও বইয়ের স্টলে ঘুরে ঘুরে খুঁজে নিয়েছিলেন প্রিয় লেখককের বই।
শীতের আমেজে মেলায় ঘুরেফিরে বেড়ানো, আড্ডা দেবার জন্যেও বেশ সুন্দর খোলা-মেলা জায়গা। তাই তরুণ-তরুণীরা দল বেঁধে এসেছেন মেলায়। বন্ধুদের দলে দলে আড্ডা জমে উঠেছে মেলার ফাঁকা স্থানগুলোতে। চলেছে বই নিয়ে আলোচনা। কিছু কিছু স্টলের সামনে পাঠকদের ভিড়ও জমে উঠেছিল। নতুন বই ও মোড়কের ছটায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল স্টলগুলো। মাত্র দুদিন পেরিয়েছে মেলার সব স্টল এখনো গুছিয়ে উঠতে পারেনি। তাই কবি, সাহিত্যিকদের তেমন আনাগোনা নেই মেলায়।
খুব সুন্দর হয়েছে বইমেলা ঃ কবি আনিসুল হক
গতকাল মেলায় এসেছিলেন সাহিত্যিক আনিসুল হক প্রথমার স্টলে বসে বইয়ে স্বাক্ষর করে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। তিনি বললেন, খুব সুন্দর গোছানো মেলা হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুরো মেলাটাকেই নিয়ে আসার প্রস্তাব দিলেন তিনি। বললেন, বইমেলা, মেলামঞ্চ সবকিছু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে এসে একটা স্থায়ী রূপ দেয়া গেলে খুব ভালো হয়। একইসঙ্গে উন্মুক্ত মঞ্চটিকে মেলার সঙ্গে যুক্ত করে নিতে পারলে মেলা আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। তিনি বললেন, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শিশু চত্বর কলা হয়েছে। এতে অনেকেই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ঘুরে চলে যায়। এদিকে যেসব প্রকাশকরা রয়েছেন তারাও শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশ করে। শিশুরা সেসব বই সম্পর্কে জানতে পারছে না। ফলে সব বইয়ের স্টল এক জায়গায় থাকা সবচেয়ে ভালো। পাঠকের জন্য, প্রকাশকের জন্যেও।
মেলায় দুই মন্ত্রী
গতকাল মেলা ঘুরে গেছেন দুই মন্ত্রী। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। মেলায় মুক্তিযোদ্ধা আমিনা বেগম ও শেখ আবদুর রাজ্জাক রচিত ‘ঠিকানা ৭১’ নামের একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী। এছাড়া শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বাংলা একাডেমি অংশে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্য পুস্তকের স্টলসহ বেশ কয়েকটি স্টল ঘুরে দেখেন।
মোড়ক উন্মোচন
গতকাল মেলার দ্বিতীয় দিনে একাডেমির নজরুল মঞ্চে ছয়টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। মোড়ক উন্মোচনকৃত বইগুলো হলো ‘ঠিকানা ৭১’, তোল শান্তির ডাক, স্বপ্ন দিশারী, নারী শিক্ষার অগ্রদূত নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী, সোনামণিদের বর্ণ ও ছড়া ও পেন্টকল্প’।
নতুন বই
এবারের মেলার দ্বিতীয় দিনে বেশ কয়েকটি নতুন বই এসেছে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত মেলায়— কবিতা, ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনীসহ বিভিন্ন প্রকাশনী সংস্থা থেকে মোট ৩৫টি বই প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে— ‘ঐতিহ্য’ প্রকাশিত ‘তাজউদ্দীন আহমদ : নেতা ও পিতা’। বইটির লেখক বঙ্গতাজ দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা ‘শারমিন আহমদ’। হার্ড বাইন্ডিংয়ের এই বইটার মূল্য ৮৫০ টাকা এবং পেপারব্যাক বাইন্ডিংয়ের মূল্য ৪২৫ টাকা। ‘বেঙ্গল ফাউন্ডেশন’ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী’র প্রবন্ধের বই ‘কালের সাক্ষী’ ও ইমদাদুল হক মিলনের বই ‘গুনাই বিবির কিচ্ছা’, ‘ঐতিহ্য’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে ক্রীড়া সাংবাদিক ‘দেবব্রত মুখোপধ্যায়’-এর ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে নিয়ে লেখা বই ‘সাকিব আল হাসান : আপন চোখে ভিন্ন চোখে’, অন্যপ্রকাশ এনেছে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ‘ শূন্য নভে ভূমি’, সেলিনা হোসেনের ‘স্বপ্নে বাজপাখি’, আহমদ রফিকের ‘রবীন্দ্রনাথ, গীতাঞ্জলি ও নোবেল পুরস্কার’, পিয়াস মজিদের ‘কুয়াশা ক্যাফে’, আরাফ আফজালের ‘ রি-রেভ্যুলেশন’, মোশতাক আহমেদের ‘নীল জোছনার জীবন’ ও প্রজেক্ট হাইপার’, মোস্তফা কামালের ‘চাঁদের আলোয় রাগিব আলী এবং সে’ ও ‘ডাকাতের কবলে ফটকুমামা’, সময় প্রকাশন এনেছে ওবায়দুল কাদেরের ‘জীবনস্মৃতি : সব মনে নেই’ ও ‘গাঙচিল’, আহসান হাবীবের ‘ফিরে যাই’, আগামী প্রকাশনী এনেছে আহমদ শরীফের ‘রচনাবলী ৮’, সালাহ্উদ্দীন আহ্মদের ‘বঙ্গবন্ধু বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সমকালীন ভাবনা’, মোনায়েম সরকার সম্পাদিত ‘একবিংশ শতাব্দীতে শেখ মুজিবের প্রাসঙ্গিকতা’, তসলিমা নাসরিনের ‘গদ্যপদ্য’, শাহাদুজ্জামানের ‘কাগজের নৌকায় আগুনের নদী’, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি’, প্রশান্ত লাহিড়ীর ‘পৃথিবীর এক ঝলক’, মৌলি আজাদের ‘রূপালি জোছনায় ভেজা জীবন’, আকিদুল ইসলামের ‘গল্পগুলো ব্যক্তিগত নয়’, প্লাটফর্ম থেকে হাসান শান্তনুর ‘৪৩ বছরে গণমাধ্যমের অর্জন-বিসর্জন’, চন্দ্রদীপ এনেছে আখতার হুসেনের ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, বুলবন ওসমানের ‘একটি গ্রামোফোনের রেকর্ড’, অনামিকা প্রকাশনী এনেছে ইফতেখার হালিমের ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’, অনুপম প্রকাশনী এনেছে সুমন্ত আসলামের ‘বিচ্ছু বাহিনী’, সৌমেন সাহার ‘জটিল গণিত কুটিল সমাধান’, অমলেন্দু কুমার দাশের ‘মরমী কবি রাধারমণের গান ও জীবন’, বিভাস এনেছে নির্মলেন্দু গুণের ‘রক্ষা করো হে ভৈরব’, ইত্যাদি এনেছে সেলিনা হোসেনের ‘সোনালী ডুমুর’, তাম্রলিপি এনেছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘গ্রামের নাম কাঁকন ডুবি’, আহসান হাবীবের ‘ধুপপুর জঙ্গলে এলিয়েন’, ইকবাল খন্দকারের ‘লাশখেকো পিশাচ’, সাহস পাবলিকেশনস্ থেকে এসেছে সাযযাদ কাদিরের ‘এই সময়ের কবিতা’ ও সাহস রতনের ‘ক্যামনে কি!’, বাংলাপ্রকাশ থেকে এসেছে বুলবন ওসমানের ‘শিল্পাচার্যের ছবি ব্রহ্মপুত্রের জলে বির্জন দেওয়া হোক’।
একুশের আলোচনা
এদিকে বিকালে মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় প্রমিত বাংলা ভাষা শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ফিরোজা ইয়াসমীন, ড. মনিরুজ্জামান, অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ এবং অধ্যাপক জিনাত ইমতিয়াজ আলী। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক পবিত্র সরকার। সন্ধ্যায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
আজকের একুশে আলোচনা
আজ মঙ্গলবার গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ষাট বছরে বাংলা একাডেমি শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন শাহিদা খাতুন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, ভূইয়া ইকবাল, ড. করুণাময় গোস্বামী এবং ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী। সভাপতিত্ব করবেন ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম।
