অবরোধ-হরতালে মূল টার্গেট যাত্রীবাহী বাস

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ১৯:২০
 
 
 
 
চলমান অবরোধ-হরতালে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোল বোমার মতো বর্বর হামলা বেড়েই চলেছে। কোনোভাবেই থামছে না এই হামলা। নাশকতাকারীদের মূল টার্গেটে পরিণত হয়েছে যাত্রীবাহী বাস। বাদ যাচ্ছে না পণ্য পরিবহনগুলোও। ফলে বাড়ছে প্রাণহানি আর আগুনে ঝলছে সাধারণ মানুষ। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রহরায় যেসব বাস চলছে, সেগুলো ঠিকই নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে। কিন্তু মহাসড়কগুলোয় বিচ্ছিন্নভাবে চলাচলকারী যাত্রীবাহী পরিবহনগুলো আক্রান্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এ দিকে, হরতালে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ ও গাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনার আশঙ্কায় যাত্রী সংখ্যাও কমে গেছে। প্রয়োজনীয় যাত্রী না পাওয়ায় শিডিউল রক্ষা করে গাড়ি ছাড়তে পারছেন না পরিবহন সংস্থাগুলো। এতে ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে গণপরিহন ও পণ্য পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি জানিয়েছে, হরতাল-অবরোধে সারা দেশে গণপরিহন ও পণ্য পরিবহন মিলিয়ে এ খাতে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। পণ্য পরিবহনের ২০০ কোটি টাকা এবং গণপরিবহনের ১০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে।
গত ৬ জানুয়ারি থেকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ডাকা টানা অবরোধ এবং হরতালের মধ্যে সবচেয়ে নৃশংস ঘটনাটি ঘটে গত মঙ্গলবার ভোরে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজার সংলগ্ন জগমোহনপুর এলাকায় নির্জন এলাকায়। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে আইকন পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোল বোমা ছোড়া হলে সাতজন যাত্রী জীবন্ত দগ্ধ হয়ে নিহত হন। এ ছাড়া বোমায় ঝলসে যান আরো অন্তত ২৪ জন যাত্রী। এ নিয়ে বাসে আগুন এবং পেট্রোল বোমা হামলায় ঘটনায় ঢাকাসহ সারা দেশে মোট ৫৪ জন নিহত আর ১০৫ জন ঝলসে গেছেন। এ সময়ে প্রায় ৬০০ মতো বাস ও ট্রাকে আগুন দেয়া হয়েছে অথবা পেট্রোল বোমা ছোড়া হয়েছে। এর আগে যাত্রাবাড়ী ও রংপুরে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোল বোমা ছোড়া হয়। এ ছাড়া, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাত্রীবাহী বাসে ওঠার জন্যই পেট্রোল বোমা হামলার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এ পর্যন্ত যতগুলো নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটেছে, তার বেশির ভাগই যাত্রীবাহী বাসে। পেট্রোল বোমায় দগ্ধদের কান্নায় এখন ভারী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুরো বার্ন ইউনিট। চলমান এ রাজনৈতিক সহিংসতায় সারা দেশে ১০০-রও বেশি নিরীহ মানুষ দগ্ধ হয়েছেন, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে।
লাগাতার অবরোধে আগুন ও বোমা থেকে নিজেদের সম্পদ রক্ষায়  রাজধানীতে চলাচলকারী যাত্রীবাহী বাসের নিরাপত্তায় অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ করেছেন মালিকরা। ছদ্মবেশে থাকা এ সব কর্মী সারাক্ষণ বাসের ভেতর অবস্থান করেন। যাত্রীদের ওপর নজর রাখাই এদের কাজ। এসব কমী বাসের জানালা ও দরাজা সব সময় বন্ধ রাখতে যাত্রীদের নির্দেশনা দেন।
বাসমালিকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব বাস কোম্পানিজের (এবিসি) নেতৃবৃন্দ বলেন, স্বাভাবিক সময়ে নগরীতে পাঁচ থেকে ছয় হাজার বাস-মিনিবাস চলে। কিন্তু অবরোধ-হরতালের কারণে বর্তমানে দুই থেকে আড়াই হাজার বাস চলছে। প্রায় ‘প্রতিদিনই কোনো না কোনো বাসে আগুন লাগানো হচ্ছে। হামলা হচ্ছে। নাশকতাকারীদের মূল টার্গেট যাত্রীবাহী বাস।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে—পেট্রোল বোমার মতো নির্মম হামলা চালিয়ে নাশকতাকারী দূরপাল্লারসহ বাসযাত্রীদের মাঝে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ঢাকা থেকে সারা  দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতেই এ ধরনের নাশকতা চালানো হচ্ছে। হামলা-ভাংচুর করে জনজীবনের আতঙ্ক সৃষ্টি করছে নাশকতাকারীরা।
 
বিচ্ছিন্নভাবে চলা পরিবহন বেশি আক্রান্ত:
রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনাল থেকে পুলিশের পাহারায় দূরপাল­ার বেশ কিছু বাস চলাচল করছে। এ ছাড়া, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঢাকামুখী পরিবহনগুলোকে দেয়া হচ্ছে পর্যান্ত নিরাপত্তা। কিছু কিছু বাস চলাচল করছে। দেশের নানা স্থান থেকে যাত্রীবাহী বাসসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ঢাকায় যাওয়া-আসা করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-কক্সবাজারসহ বিভিন্ন মহাসড়কে বাস ও ট্রাককে নিরাপত্তা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে। পুলিশও রাজধানী থেকে বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করছে হাইওয়ে পুলিশ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তাবেষ্টিত যানবাহনের বহরের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে অন্য যানবাহনও চলাচল করেছে। তবে যেসব পরিবহন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে চলাচল করছে সেসব পরিবহনই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার কক্সবাজার থেকে আইকন পরিবহনের যে নৈশবাসে ভয়াবহ পেট্রোল বোমা মারা হয়, সেটি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তার বাইরে চলাচল করে। ফলে মর্মান্তিক হামলার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া, দূরপাল্লার বাসে যত পেট্রোল বোমা হামলা হচ্ছে তার বেশির ভাগ বিচ্ছিন্নভাবে চলাচলের কারণেই।
 
শিডিউল নেই, দূরপাল্লার যাত্রীও কম:
সরকারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট নিরাপত্তা দেয়ার ঘোষণার পরও কাঙ্খিত যাত্রী পাচ্ছে না পরিবহনগুলো। যাত্রীর অভাবে শিডিউলও ঠিক নেই। বুধবার দুপুরে সরেজমিনে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রীশূন্য কাউন্টার। গাবতলীতে গাড়ি ও কাউন্টারের লোকজনই বেশি। সেখানে যাত্রীর সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন। হরতালে নাশকতা ও গাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনার আশঙ্কায় যাত্রী কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। প্রয়োজনীয় যাত্রী না পাওয়ায় তারা গাড়ি ছাড়তে পারছেন না।
হানিফ পরিবহনের কাউন্টার থেকে জানানো হয়, হরতালে দিনের বেলায় তারা গাড়ি ছাড়েন না। তবে যাত্রী বেশি হলে গাড়ি ছাড়া হতে পারে। এ ছাড়া রাতে তাদের গাড়ি ছাড়া হচ্ছে। বিকাশ ও সাউদিয়া পরিবহনের কাউন্টার থেকে জানানো হয়, যাত্রী পেলে তারা গাড়ি ছাড়বেন। এ ছাড়া অন্যান্য কাউন্টার থেকেও জানা যায় একই কথা। তারা বলেন, হরতালে যাত্রীর সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে। গাড়িতে পেট্রোল বোমা হামলার ভয়ে অনেকেই হরতালে বাড়িতে যেতে চাচ্ছে না। সে কারণে যাত্রীর সংখ্যা কমে গেছে। আর ৮-১০ জন যাত্রী নিয়ে গাড়ি ছাড়লে তেলের খরচটাও উঠবে না। প্রয়োজনীয় যাত্রী না পেলে গাড়ি ছাড়া হচ্ছে না। 
 
দূরপাল­ায় লক্করঝক্কর পরিবহন:
রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনাল থেকে পুলিশের পাহারায় দূরপাল­ার  কিছু বাস চলাচল করলেও এ সব রুটে অভিজাত কোনো পরিবহন চলছে না। চলছে ‘সি’ গ্রেডের লক্করঝক্কর পরিবহনের বাস। এ সব কারণে মহাসড়কগুলোয় বেড়েছে দুর্ঘটনাও।