টার্গেট যাত্রীবাহী বাস

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ২৩:৩৯

চলমান অবরোধ-হরতালে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোল বোমার মত বর্বর হামলা বেড়েই চলেছে। নাশকতা-কারীদের মূল টার্গেটে পরিণত হয়েছে এই পরিবহন। বাদ যাচ্ছে না পণ্যবাহী যানবাহনও। ফলে বাড়ছে প্রাণহানি আর আগুনে জ্বলছে সাধারণ মানুষ। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রহরায় যেসব বাস চলছে সেগুলো ঠিকই নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে। কিন্তু মহা-সড়কগুলোয় বিচ্ছিন্নভাবে চলাচলকারী যাত্রীবাহী পরিবহনগুলো আক্রান্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এই পরিস্থিতিতে নৈশ কোচের জানালা বন্ধের ও মোটা পর্দা লাগানোর নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতি। এদিকে চলমান অবরোধ, হরতালে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ ও গাড়িতে আগুন দেয়ার আশঙ্কায় যাত্রী সংখ্যাও কমে গেছে। প্রয়োজনীয় যাত্রী না পাওয়ায় শিডিউল রক্ষা করে গাড়ি ছাড়তে পারছেন না পরিবহন সংস্থাগুলো। এতে ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে গণপরিহন ও পণ্য পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশ সদর দফতর থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত ৫ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে ৫৭৯টি যানবাহন। এরমধ্যে সিংহভাগই যাত্রীবাহী বাস। এরমধ্যে পেট্রোল বোমা মেরে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে ১৪৬টিতে। ভাংচুর করা হয়েছে ৩৬৪টি। নিহতের সংখ্যা ৪০। এরমধ্যে পরিবহন শ্রমিক ১৭ জন। বাকিদের সিংহভাগই বাস যাত্রী।
এ দিকে পণ্য পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হরতাল-অবরোধে সারাদেশে গণপরিহন ও পণ্য পরিবহন মিলিয়ে এ খাতে প্রতিদিন প্রায় ৩শ’ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। পণ্য পরিবহনের ২শ’ কোটি টাকা এবং গণপরিবহনের ১শ’ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, সরকারের নিরাপত্তার আশ্বাসের ভিত্তিতে দূরপাল্লার বাস নগরীর তিনটি টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে যাত্রী সংকট। উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় গতকাল থেকে কিছু বাস চলাচল শুরু করেছে। তিনি বলেন, নৈশ কোচে জানালা বন্ধ ও মোটা পর্দা লাগানোর জন্য বুধবার সমিতির পক্ষ সকল পরিবহন মালিককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হামলা থেকে যাত্রীদের রক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতেই এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে বাসের জানালা খোলা থাকার কারণে পেট্রোল বোমায় ক্ষয়ক্ষতি ঘটছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, হরতাল অবরোধে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে যাত্রীবাহী বাস। দুর্বৃত্তরা টার্গেট করেই এ হামলা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, হরতাল-অবরোধে গতকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে নিহত হয়েছেন ১৭ জন পরিবহন শ্রমিক। আর দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন রয়েছেন ২১ জন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশংকা জনক।
বাস ট্রাক ওনার্স এসোসিয়েশন সভাপতি ও সোহাগ পরিবহনের মালিক ফারুক তালুকদার সোহেল বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-যশোর-বেনাপোল রুটে তার পরিবহনের কিছু বাস চলাচল করছে। কিন্তু পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়া সীমিত সংখ্যক গাড়ি চালাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, নিরাপত্তার আশ্বাসের প্রেক্ষিতে গতকাল গাবতলী থেকে উত্তরের ১৬ জেলায় দিনের বেলা কিছু বাস ছেড়ে গেছে। তবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা পেলে রাতে আরো কিছু বাস ছাড়বে।
শ্যামলী পরিবহনের মালিক রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-কক্সবাজার, ঢাকা-বান্দরবান, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-সুনামগঞ্জ, ঢাকা-বেনাপোল রুটে, ঢাকা-কুষ্টিয়া রুটে তিন সপ্তাহ আগে থেকেই তার পরিবহনের কিছু সংখ্যক বাস চলাচল করছে। গতকাল থেকে উত্তরবঙ্গে কয়েকটি রুটে বাস ছেড়েছে। তিনি আরো বলেন, এরই মধ্যে তার পরিবহনের ৫টি বাসকে পেট্রোল বোমা মেরে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ভাংচুর করা হয়েছে ২১টি বাস।
হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মল্লিক ফকরুল ইসলাম বলেন, গতকাল থেকে দেশের সিংহভাগ সড়কে বাস চলাচল শুরু হয়েছে। এ জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে গতকাল থেকে আনসার সদস্যরা পুরোদমে দায়িত্ব পালন শুরু করেছে। আশা করা যায়, খুব শিগগিরই দূরপাল্লার বাস চলাচল স্বাভাবিক হবে। কিন্তু নিরাপত্তা দেয়ার পর কেন পেট্রোল বোমা হামলা ঠেকানো যাচ্ছে না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেগুলো হচ্ছে তা চোরাগুপ্তা হামলা। ইতিমধ্যে অনেককে শনাক্ত করা হয়েছে। অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বিচ্ছিন্নভাবে চলা পরিবহন বেশি আক্রান্ত ঃ দেশের নানা স্থান থেকে যাত্রীবাহী বাস সহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ঢাকায় যাওয়া-আসা করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-কক্সবাজারসহ বিভিন্ন মহাসড়কে বাস ও ট্রাককে নিরাপত্তা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে। পুলিশও রাজধানী থেকে বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করছে হাইওয়ে পুলিশ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তাবেষ্টিত যানবাহনের বহরের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে অন্যান্য যানবাহনও চলাচল করেছে। তবে যেসব পরিবহন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে চলাচল করছে সেই সব পরিবহনই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। সর্বশেষ গত সোমবার দিবাগত গভীর রাতে কক্সবাজার থেকে আইকন পরিবহনের নৈশবাসে পেট্রোল বোমা হামলায় মারা যায় ৮ জন। হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি জানিয়েছেন, বাসটি ছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তার বাইরে।

দূরপাল্লার যাত্রীও কম ঃ সরকারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট নিরাপত্তা দেয়ার ঘোষণার পরও কাঙ্ক্ষিত যাত্রী পাচ্ছে না পরিবহনগুলো। যাত্রীর অভাবে শিডিউলও ঠিক নেই। গতকাল দুপুরে সরেজমিনে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রীশূন্য কাউন্টার। গাবতলীতে গাড়ি ও কাউন্টারের লোকজনই বেশি। সেখানে যাত্রীর সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন। হরতালে নাশকতা ও গাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনার আশঙ্কায় যাত্রী কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। প্রয়োজনীয় যাত্রী না পাওয়ায় তারা গাড়ি ছাড়তে পারছেন না।