পেট্রোল বোমায় নিহতদের জন্য শোক বিরাজ করছিল বইমেলাতেও। মেলা প্রাঙ্গণে এসে অনেকেই শোক ও দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাদের আশংকার কথা বললেন। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে মিয়ার বাজারে বাসে পেট্রোল বোমার আঘাতে নিহতদের জন্য বইমেলাতেও ছিল শোকের আবহ। বইমেলায় আসছেন বই কিনছেন, মনে অস্থিরতা সবার। গতকাল সন্ধ্যা ও আগেরদিন টিএসসিতে ককটেল বিস্ফোরণ হওয়ায় অস্থিরতা আরো বেড়েছে। প্রকাশকরা রয়েছেন অস্বস্তিতে।
অবসর প্রকাশনীর প্রকাশক মোঃ আলমগীর রহমান বললেন, হরতাল-অবরোধ বইমেলায় কোন প্রভাব ফেলে না। কিন্তু এবারের আন্দোলন সহিংস। এটা আশংকার কথা। মেলায় দুই মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন ধানমন্ডির বাসিন্দা ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বললেন, রাজনৈতিক দলগুলো মানুষকে জিম্মি করে রাজনীতি করছে। আমাদের মেরে তাদের স্বার্থসিদ্ধি। এটা হতে পারে না। বেলা যত সন্ধ্যার দিকে গড়িয়েছে মেলায় আনাগোনাও বেড়েছে। মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির পাঁচটি স্টলের প্রতিটিতেই ছিল উপচেপড়া ভিড়। একাডেমি সূত্র জানায়, মেলার ৩য় দিনে একাডেমির ঐ ৫ বিক্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৫ লাখ টাকার বই বিক্রি হয়েছে।
বাংলাদেশের বইমেলা দেখে আমি
অভিভূত :ফ্রান্স ভট্টাচার্য
বাংলা একাডেমি আয়োজিত আন্তর্জতিক সাহিত্য সম্মেলনে অংশ নিতে এসেছেন ফ্রান্সের সাহিত্যিক ফ্রান্স ভট্টাচার্য। মেলা প্রাঙ্গণে দেখা হলো তার সঙ্গে। বাংলা ভাষা ও গ্রন্থমেলা নিয়ে কথা হলো তার সঙ্গে। বললেন, বাংলাদেশের বইমেলা দেখে আমি অভিভূত। আন্দোলনের মধ্য একটি দেশের ভাষা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেটি বাংলাদেশের। তখন থেকেই আমি বাংলা ভাষার ভক্ত। বাংলা নিয়ে আমি গবেষণা করি। আমার ভালো লাগে। এদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহু বছর আগে জ্যাক শিরাকের (ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী) সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছিলেন। তখন দোভাষীর ভূমিকায় ছিলাম আমি। বাংলা ভাষা না জানলে বা জ্ঞান না থাকলে আমি তা করতে পারতাম না। আর ভাষায় প্রকাশিত বই নিয়ে এত বড় মেলা, সত্যিই অপূর্ব। আমার মন ভরে গেছে মেলা দেখে।
মেলায় তথ্যমন্ত্রী
এসেছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। ‘নজরুল মঞ্চে’ কয়েকটি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন তিনি। এর মধ্যে ছিল আমিনুর রহমান অনূদিত আহমাদ কামাল আবদুল্লাহর কবিতাগ্রন্থ ‘পুশি পুশি’ ও ডাচ কবি জার্মেন ড্রগেনব্রুটের ‘জোনাকী’।
নতুন বই
একাডেমির তথ্যকেন্দ্র এবং সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলায় এসেছে ১০২টি নতুন বই। এর মধ্যে গল্প ১১, উপন্যাস ১৫, প্রবন্ধ ১০, কবিতা ১৯, গবেষণা ১, ছড়া ৬, জীবনী ৭, মুক্তিযুদ্ধ ৩, নাটক ১, বিজ্ঞান ৩, ভ্রমণ ১, ইতিহাস ৪, রম্য/ধাঁধা ১, ধর্মীয় ২, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ২ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর বই এসেছে ১৬টি। একাডেমির সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলার তৃতীয় দিনে নজরুল মঞ্চে ২টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে।
শিরীন পাবলিকেশন্স থেকে এসেছে সাযযাদ কাদিরের ‘বাংলা আমার’, নবরাগ প্রকাশনী থেকে এসেছে অনু মুহাম্মদের ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ ও ভারত প্রশ্ন’, অনন্যা থেকে এসেছে রোহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের ‘সম্রাট জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনী’, সুমন্ত আসলামের ‘কোন কোন রাত একলা এমন’, অনিন্দ্য এনেছে মোহিত কামালের ‘স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন’ ও ‘অন্ধকার ও আলো’, ঝিঙেফুল থেকে এসেছে শরীফ খানের ‘বাংলাদেশের পাখি’, বিভাষ থেকে এসেছে যতীন সরকারের ‘সাহিত্যের কাঁধে প্রত্যাশা’, আগামী থেকে এসেছে শাহাদুজ্জামানের ‘কাগজের নৌকায় আগুনের নদী’, সালাহ্্উদ্দিন আহমেদের ‘বঙ্গবন্ধু ও বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সমকালীন ভাবনা’, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘সহেনা মানবতার অবমাননা’, পার্ল পাবলিকেশন থেকে এসেছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘আরো টুনটুনি ও ছোটুচ্চু’, স্বরব্যঞ্জন থেকে এসেছে শিহাব শাহরিয়ারের ‘খড়ের খোয়ার’, আফসার ব্রাদার্স থেকে এসেছে মুহম্মদ হাবিবুর রহমানের ‘শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ’, অনুপম থেকে এসেছে মাহবুব সাদিকের ‘অনিরুদ্ধের বাঁশি’, মহাকাল থেকে এসেছে জোবায়ের আহমেদ নবীনের ‘প্রাচীর ভাঙার নেশা’ উল্লেখযোগ্য।
মেলামঞ্চের আলোচনা
বুধবার গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশে ছড়াসাহিত্য শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ছড়াকার সুজন বড়ুয়া। মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ছড়াকারেরা ছড়া লেখেন শিশুহূদয়ের অকৃত্রিম সরলতা দিয়ে। আমাদের ছড়া সামাজিক অঙ্গীকারের চেতনায় পরিপুষ্ট। সামাজিক অসঙ্গতি-অন্যায়-শোষণ ইত্যাদির বিরুদ্ধে শাণিত কণ্ঠের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী আলোয় স্নাত আমাদের ছড়ার ভুবন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন রফিকুর রশিদ, রাশেদ রউফ এবং আলম তালুকদার। সভাপতিত্ব করেন ছড়াকার রফিকুল হক।
আজকের অনুষ্ঠান
বৃহসপতিবার গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অধ্যাপক গোলাম মুস্তাফা। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন অধ্যাপক মনসুর মুসা এবং হাকিম আরিফ। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল কাইউম।
