থামছে না নাশকতা

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ০০:২৮

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ডাকা চলমান অবরোধ-হরতাল কর্মসূচির মধ্যে নাশকতা কোনভাবেই থামছে না। প্রতিদিনই কোন না কোন গাড়িতে পেট্রোল বোমা ছোঁড়া হচ্ছে। এতে জীবন দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। পুলিশ-র্যাবের ভাষ্য, প্রতিদিনই গাড়িতে আগুন দিতে গিয়ে ধরা পড়ছে কোন না কোন নাশকতাকারী। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অপরাধীদের ধরিয়ে দিতে পুলিশ, র্যাব ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করছে। তারাও নাশকতাকারীদের ধরে পিটুনি দিয়ে পুলিশ বা র্যাবের হাতে সোপর্দ করছে। তারপরও কেন নাশকতা রুখা যাচ্ছে না? এমন প্রশ্নের জবাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ‘অতি দরিদ্র শ্রেণির মানুষ অনেক সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু টাকার লোভে এই ধরনের নাশকতা করে। তাদের অনেকেই গ্রেফতার হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তাছাড়া শুরুতে যে ধরনের নাশকতা হচ্ছিল, এখন তার চেয়ে অনেক কম।’

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ইত্তেফাককে বলেছেন, নাশকতাকারীদের যে কোন মূল্যে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যা যা করা দরকার সবই  করবেন। কোন নাশকতাকারীকে ছাড় দেয়া হবে না। পুলিশ-র্যাবের অভিযান আরো জোরদার করতেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায় সরকারের উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘শুধু কম্বিং অপারেশন চালিয়ে এসব অপরাধীকে রোখা যাবে না। কারণ, এর পেছনে রয়েছে রাজনীতি। যারা বোমা ছুঁড়ছে তাদের অনেকেই সমাজের অতি নিম্ন আয়ের মানুষ। তাদের টাকা দিয়েই অনেক সময় কাজ করানো যায়। একজন না করলে টাকা পেলে আরেকজন করবে। এতে কিছু মানুষ গ্রেফতার হলেও ফল হবে না।’ তার মতে, কেবল রাজনৈতিকভাবে এ সংকট নিরসন করা যেতে পারে।
হিসাব মতে, গত ৫ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত শুধু রাজধানীতেই আগুনে পুড়েছে ১৫৩টি যানবাহন। পুলিশ আক্রান্ত হয়েছেন ৩৬ জন এবং আনসার ২ জন। আর সারাদেশের হিসাব ধরলে—আগুনে পুড়েছে ৫৭৯টি যানবাহন। এর মধ্যে বাস আছে ১৪৬টি। পুলিশ আহত হয়েছেন ২৬৪ জন। পুলিশ সদর দফতরের হিসাবে বলা হয়েছে, গত ৫ জানুয়ারি থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এক মাসের নাশকতায় মারা গেছেন ৪৩ জন। এর মধ্যে পরিবহন শ্রমিক ১৭ জন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশন বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, গত এক মাসে যানবাহনে আগুন দেয়ার সময় হাতে নাতে ধরা পড়েছে ১২৭ জন। এর মধ্যে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী ৪৪ জন এবং বিএনপি নেতাকর্মী ৮৩ জন। ভ্রাম্যমাণ আদালত ৩০ জনকে হাতে-নাতে ধরে কারাগারে পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির ২৮ জন ও জামায়াত-শিবিরের ২ জন। এর বাইরে সন্দেহভাজন হিসেবে গত এক মাসে ৮৪৫ জন গ্রেফতার হয়েছেন। তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ পেট্রোল বোমা উদ্ধার করা হয়েছে।
এত গ্রেফতারের পরও যানবাহনে আগুন দেয়া কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না? এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘নাশকতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে পরিবেশ।’ তিনি বলেন, নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। কোনভাবেই এরা পার পাবে না।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূরুল হুদা ইত্তেফাককে বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলে নাশকতা বাড়ে। তাই পুলিশকে পরিকল্পনা করে অভিযান চালাতে হবে। আবার একই সঙ্গে নিবিড় তদন্ত করতে হবে। নাশকতাকারীদের রুট খুঁজে বের করতে হবে। রুট যদি খুঁজে বের করা যায় তাহলে এসব নাশকতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে।’
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, ‘সঠিকভাবে সময় নিয়ে তদন্ত করা গেলে নাশকতা আরো কমিয়ে আনা যেত। যারা তদন্ত করবেন তারা তো এখন রাস্তায় দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তদন্ত সঠিকভাবে এগুচ্ছে না। কিছুদূর এগিয়ে আবার থেমে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা কয়েকজন নির্দেশদাতা ও অর্থ যোগানদাতার নাম পেয়েছি। তাদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এদের সবাইকে গ্রেফতার করা গেলে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে। তাছাড়া তালিকা ধরে অভিযান চালিয়ে পেট্রোল বোমা হামলাকারী অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা এখন কারাগারে।’ তিনি বলেন, পুলিশ বসে নেই। কাজ চলছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, রাজধানীতে নাশকতা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। বিচ্ছিন্নভাবে দুই-একটি ঘটনা ঘটলেও তা জানুয়ারির প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহের তুলনায় অনেক কম। আর কিছুদিন গেলে এগুলোও থাকবে না বলে মত তার। তিনি বলেন, অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে নাশকতাকারীদের গ্রেফতারের কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ। ফলে অনেক নাশকতাকারীকেই পুলিশ ধরতে সমর্থ হয়েছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায় সরকারের উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে যেসব যানবাহনে আগুন দেয়া হয়েছিল সেগুলো সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা গেলে এখনকার ঘটনা অনেক কমে যেত। আসলে এসব নাশকতার ঘটনায় রাজনীতি বাদ দিয়ে তদন্ত করতে হবে। তাহলেই আসল অপরাধীকে গ্রেফতার করা যাবে।