ইনানী উপকূলে ঝাউগাছ লুটপাটের মহোত্সব

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ০১:১৬

উখিয়ার উপকূলের নিরাপত্তা বেষ্টনী দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে। এলাকার একটি সংঘবদ্ধ চক্র ঝাউগাছ লুটপাট করে সাগর পথে বিভিন্ন এলাকায় পাচার অব্যাহত রাখার ফলে ১৯৯১ সালে সৃজিত এ ঝাউবাগান প্রকল্প এখন বিলুপ্তির মুখে। এর ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে জনজীবন হুমকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সংশ্লিষ্ট বনবিট কর্মকর্তা ঝাউগাছ লুটপাটের সাথে জড়িতদের শনাক্ত করতে সক্ষম হলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ না নেয়ায় এই নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদী ভাঙনসহ বিভিন্ন কারণে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য বিশাল উপকূলীয় অঞ্চল জুড়ে ১৯৯১ সালে তত্কালীন জেলা প্রশাসকের নির্দেশে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় বন বিভাগের সহায়তায় গড়ে তোলা হয় সবুজ বেষ্টনী। এসব ঝাউবীথি বেড়ে ওঠার ফলে উপকূলীয় এলাকা পর্যটকদের জন্য অবকাশ যাপনসহ সাময়িক আনন্দ বিনোদনের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। অপরাধী চক্র ঝাউগাছ কর্তন করায় একদিকে যেমন পর্যটন এলাকা সৌন্দর্য হারাচ্ছে, একই ভাবে সাগরের ভাঙ্গনে বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা বিলুপ্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মেরিন ড্রাইভের মনখালী সেতু উদ্বোধনকালে ঝাউবাগান রক্ষার জন্য স্থানীয় বন বিভাগকে নির্দেশের পাশাপাশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন। যার প্রেক্ষিতে টেকনাফ উপকূলীয় এলাকায় ঝাউবাগান দখল করে বসবাসরত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও উখিয়া উপজেলায় বিস্তীর্ণ সবুজ বেষ্টনী প্রকল্পে অবৈধভাবে বসবাস করছে হাজারো পরিবার। চোয়াংখালী গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী নূর হোসেন মাস্টার অভিযোগ করেন এলাকার একটি সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র গত কয়েকদিন ধরে উপকূলের ঝাউগাছ কেটে সাগরপথে পাচার করছে। গত এক মাসে সহস্রাধিক ঝাউগাছ কর্তনের ঘটনা নিয়ে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হলেও প্রভাবশালী চক্রের দাপটের মুখে কেউ মুখ খুলতে নারাজ। চোয়াংখালী বিট কর্মকর্তা তহিদুল ইসলাম বলেন, চোয়াংখালী গ্রামের বদিউল আলমের ছেলে মোজাম্মেল ১০/১২ জন রোহিঙ্গা শ্রমিক দিয়ে শতাধিক ঝাউগাছ কর্তন করে পাচার করছিল। গোপন সূত্রের সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১শ’ ঘনফুটের বেশি গাছ উদ্ধার করা হয়েছে। বিট কর্মকর্তা জানান, এ ব্যাপারে মামলা না করার জন্য কাঠচোর চক্র তাকে হুমকি প্রদর্শন করছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা মীর আহমদ বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝাউবাগান উজাড় হলে করার কিছু নেই। তবে পাচারকারীদের কারণে যদি ক্ষতি হয় তাহলে বন আইনে মামলা রুজু করা হবে। কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সর্দার শরিফুল ইসলাম ঝাউগাছ লুটপাটের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, যতদ্রুত সম্ভব ঘটনাটি তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুুক্তের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনে মামলা রুজু করার প্রক্রিয়া হাতে নেয়া হবে।
টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, কক্সবাজারের টেকনাফ সমুদ্রসৈকতের ঝাউবাগান থেকে চারদিনের মাথায় প্রায় চার শতাধিক ঝাউগাছ নিধন করা হয়েছে। গত বুধবার বাহারছড়ার শামলাপুর ঝাউবাগান থেকে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করার চার দিনে অন্তত চারশতাধিক গাছ নিধন করা হয়। এতে বনকর্মীদের যোগসাজশের অভিযোগ পাওয়া গেলেও বিট কর্মকর্তা জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন।
গত রবিবার সরেজমিনে বাহারছড়ার শামলাপুরে মনখালী খালের দক্ষিণে দেড় কিলোমিটার ঝাউবাগান উজাড়ের ভয়াবহতা দেখা যায়। ঝাউবাগানের ভিতরে যতদূর দেখা গেছে সারি বদ্ধ বাগানে বেশ কিছু দূর পর পর ফাঁকা আর কাটা গাছের গোড়া। গাছগুলো করাত ও দা দিয়ে কাটার চিহ্ন রয়েছে। ওইদিন দুপুর ২টা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত ঝাউবাগানে কোন কর্মকর্তা ও পাহারাদারের দেখা মেলেনি।
উপকূলীয় বনবিভাগ সূত্র জানায়, ২০০২-০৩ সালে উপকূলীয় জনগণের সমপদ রক্ষায় শামলাপুর থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত ৭০০ একর বালুচরে দশ লাখের মতো ঝাউগাছ লাগানো হয়। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে এ বন দেয়াল হিসাবে উপকূলীয় এলাকাকে রক্ষা করছে। এর মধ্যে শামলাপুরে দেড় কিলোমিটার ঝাউবাগানে  মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে আসা প্রায় আড়াই হাজার রোহিঙ্গা পরিবারের ৩৫ হাজার মানুষ দখল করে বসবাস করে আসছিল। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বুধবার দুপুরে বিজিবি, পুলিশ, আনসার ও বন বিভাগের কর্মীদের সহযোগিতায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জাহিদ ইকবালের নেতৃত্বে অবৈধ ঝুপড়ি ঘরগুলো উচ্ছেদ করা হয়।

শামলাপুর নোয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী আবুল কালাম ওরফে আবু ও নুরুল আমিন জানান, সব ঝাউগাছ গত কয়েক দিনের মধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে। কারা গাছ কেটেছে বনকর্মীরা জানেন। স্থানীয় গ্রামের কিছু লোক কেটে ফেলা ঝাউগাছের মুথা জ্বালানির জন্য তুলে নিচ্ছে। কেউ কখনো মানা করে না।’