সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হঠাত্ করে ২৪ ঘন্টায় ১০ শিশুসহ ৩২ জনের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সিলেটে তোলপাড় চলছে। গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটেছে। ওসমানী হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় এক সঙ্গে এতো মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম। এতে মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা সন্দেহ, অবিশ্বাস। বিশেষ করে নবজাতক ৫ জনসহ ১০ শিশুর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ঘটনা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে ওসমানী হাসপাতালের মত বড় একটি হাসপাতালে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিদিন ১০-১৪ জনের মৃত্যু হয়ে থাকে উল্লেখ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছেন, এতে ভয়ের কিছু নেই। গতকাল মৃত্যুর হার একটু বেশি হয়েছে এটা স্বীকার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছেন, কি কারণে এই মৃত্যু এবং মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার ঘটনা খতিয়ে দেখতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটি ৩ দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট পেশ করবে।
এদিকে ২৪ ঘন্টায় ৩২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নির্দেশে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (হাসপাতাল) মোশাররফ হোসেনকে প্রধান করে গঠিত এ কমিটিকে সরেজমিনে পরিদর্শন করে সাতদিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
ওসমানীর মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা: ইসমাইল পাটোয়ারীকে আহ্বায়ক করে ৩ সদস্যের কমিটির অপর দুজন হচ্ছেন ওসমানী হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মনজ্জির আলী ও মেডিসিন বিভাগের আবাসিক চিকিত্সক রঞ্জন রায়। এদিকে ১০ শিশুর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার আব্দুস ছবুর মিয়া ইত্তেফাককে জানান, এদের মধ্যে সংক্রমণজনিত রোগে ২ জন, নিউমোনিয়ায় ৫ জন ও নিওনেটেল অর্থাত্ জন্মগত ত্রুটির কারণে ৩ জন শিশু মারা গেছে। এদের মধ্যে ২২ নং ওয়ার্ডে ৭ জন এবং ২১ ও ২৩ নং ওয়ার্ডে মারা যায় ৩ শিশু। হাসপাতাল সূত্র জানায়, এছাড়া একইদিন এই সময়ে স্ট্রোকে ৪ জন, রোড ট্রাফিক অ্যাক্সিডেন্টে ৪ জন, মিওকার্ডিয়াল ইনফেকশনে ৩ জন, সেপটিসিমিয়ায় ৪ জন, পোস্ট ন্যাটাল অ্যাটাক (পিএনএ) স্টেজ-এ ৩ জন, নিউনাটাল সেপসিসে ১ জন, ব্রঙ্কনিউমোনিয়ায় ২ জন, ইনটেসটিনাল অবসট্রাকশনে ১ জন, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে একজন, অ্যানিমিয়ায় ২ জন, ক্যা-মেটাটেসিসে ১ জন, ব্রট ডেট ১ জন, এনসেপিলাইটিস-এ একজন, অজানা বিষক্রিয়ায় একজন, অ্যাসল্ট একজন, কলপালমোনারি টিবিতে একজন এবং ডায়াবেটিসে একজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
মৃত শিশুরা হচ্ছে: তানজিরা (সাড়ে ৩ বছর) বাড়ি সুনামগঞ্জ সদর, গোয়াইনঘাটের সায়মা মাহবুব আলমের ৪৫ দিনের সন্তান, সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্বরপুর উপজেলার নাদিরা (৬ মাস), মেহেদী (৭৫ দিন), সিলেট শাহপরান এলাকার আসমা বেগমের ১ দিনের সন্তান, সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুরের সন্ধ্যা রানীর ১ দিনের সন্তান, সিলেট শেখঘাটের নিলুফা বেগমের ১ দিনের সন্তান, ছাতকের সাকরাইসের তিন বছরের সন্তান, জকিগঞ্জের বনগাঁও গ্রামের আকামা বেগমের ৭ দিনের সন্তান, হবিগঞ্জের ইয়াসমিন বেগমের ৩ দিনের সন্তান। মারা যাওয়া শিশুদের বেশির ভাগের অভিভাবক দরিদ্র। তারা তাদের সন্তান মারা যাওয়ার পরপরই দ্রুত যার যার বাড়ি চলে যান।
গতকাল এই মৃত্যুর ঘটনার পর ওসমানী হাসপাতালে চোখে পড়ে সেখানকার করুণ অবস্থা। বিশেষ করে হাসপাতালের পেড্রিয়াট্রিক মেডিসিন বিভাগের দুটি ওয়ার্ডের করুণ হাল। বেডের চেয়ে শিশুর সংখ্যা বেশি। অভিযোগের অন্ত নাই। শিশুদের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন- ভুল চিকিত্সা ও ডাক্তারদের অবহেলাই তাদের মৃত্যুর কারণ। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা জনৈক শিশুর অভিভাবক জানান, রবিবার রাতে জন্ম নেয়ার পর কয়েকটি শিশুর অভিভাবক বারবার সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকের সাথে যোগাযোগ করেন। কিন্তু, চিকিত্সকদের কাছ থেকে তারা কোন সাড়া পাননি। এক পর্যায়ে কয়েকটি শিশুর মৃত্যু তারা প্রত্যক্ষ করেছেন। শিশু ওয়ার্ডের ৩ নং ইউনিটে ভর্তি এক শিশুর মা বলেছেন, তিনি দেখেছেন ভোর রাতে ইনকিউভেটরে একটি নবজাতকের অবস্থা যখন খারাপ হয় তখন বাচ্ছার মা নার্সদের ডাকাডাকি করেও কাছে আনতে পারেননি। এরপর বাচ্ছাটি মারা যায়। এভাবে অনেক মহিলা নার্সদের খারাপ ব্যবহার ও যথাযথ চিকিত্সা না দেয়ার বিষয়ে অভিযোগ করেন। অনেকে আবার সাংবাদিকদের সাথেও কথা বলতে ভয় পেয়েছেন। কারণ যদি তাদের বাচ্ছার কোন ক্ষতি হয়। তবে নার্সরা বলেছেন, আমাদের আন্তরিকতার অভাব নেই। তবে সিটের চেয়ে রোগীর সংখ্যা যখন বেশি হয় তখন যথাযথ সেবা দেয়া মুস্কিল হয়।
হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আব্দুস সালাম বলেন, কারো অবহেলায় এসব রোগীর মৃত্যু সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তবে রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে তারা এ ধরনের কোন অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। তিনি সংশ্লিষ্টদের আতংকিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, সিলেট বিভাগের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল ওসমানী। এখানে বিদ্যমান বেড়ের দ্বিগুণ-তিনগুণ রোগী ভর্তি থাকেন। গত মাসের হিসাব দেখিয়ে তিনি বলেন, গত মাসেও এখানে গড়ে প্রতিদিন ১৪ জন রোগী মারা গেছেন।
হাসপাতালে উপচেপড়া ভিড়
সিলেট ওসমানী হাসপাতালে একদিনে শিশুসহ ৩২ জনের মৃত্যুর ঘটনার খবর পেয়ে গুটা শহরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে প্রকৃত ঘটনা জানতে মিডিয়া কর্মী, হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের কাছে অসংখ্য ফোন আসে প্রকৃত ঘটনা জানতে। দিনভর বিভিন্ন মিডিয়ার কর্মীরা হাসপাতালে ছিলেন। দুপুরে ছুটে আসেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান,আওয়ামী লীগ নেতা ও সিটি কাউন্সিলার আজাদুর রহমান আজাদ, সিটি কাউন্সিলার আবজাদ হোসেন আবজাদ, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল খালিকসহ বিভিন্ন পেশা ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
রোগীর স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির উদ্বেগ
ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সিলেট এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভুল চিকিত্সায় গত কয়েকদিন আগে মারা যান বেতারের খ্যাতিমান সঙ্গীত শিল্পী অঞ্জু রায়। তার রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল ১০ শিশুসহ ২৪ ঘন্টায় ৩২ জনের প্রাণহানি সিলেট এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেলের অতীত ইতিহাসকে হার মানিয়েছে আখ্যা দিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রোগী স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির আহবায়ক হাজী আব্দুল কাইয়ুম জালালী পংকী, সদস্য এডভোকেট প্রদীপ কুমার ভট্টাচার্য্য, হাজী আব্দুল করিম পান্না, আফসর হোসেন, আব্দুর রব হাজারী, হাজী আলমগীর, খলিলুর রহমান মুনসী, আশরাফ উদ্দিন, খছরুজ্জামান খছরু, মুরাদ আহমদ মুরন, শামীম আহমদ, এডভোকেট মির্জা ইয়াকুব হোসেন, নাজমুল হোসেন রিপন, জয়নাল আবেদীন, জসিম উদ্দিন, আলাউদ্দিন আহমদ, কামাল মিয়া। নিরপেক্ষ তদন্তের মধ্যে দিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মুখোশ সিলেটবাসীর সামনে উন্মোচন করার দাবি জানান তারা।