চলমান সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। গতকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট বর্তমানে বাংলাদেশে চলমান সহিংস ও মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে সব পক্ষের ভূমিকা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। মতপার্থক্য দূর করতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সুযোগ দিতে হবে। অন্যদিকে কানাডার নবনিযুক্ত হাইকমিশনার বেনাউ পিয়ের লারামে বলেছেন, বর্তমান সহিংস পরিস্থিতির অবশ্যই অবসান হতে হবে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও কানাডার হাইকমিশনার গতকাল সকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়ায় উপরোক্ত মন্তব্য করেন।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশে যে কঠিন সহিংস পরিস্থিতি চলছে তা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। এমন হূদয় বিদারক পরিস্থিতির অবসানে সব পক্ষের করণীয় রয়েছে। বাংলাদেশে যে গণতন্ত্র রয়েছে তা সৌভাগ্যের বিষয় এবং এই গণতন্ত্রের মধ্যেই মতপার্থক্য দূর করার সুযোগ রয়েছে। ওয়াশিংটন থেকেও জোর দিয়ে বলা হচ্ছে সহিংসতা দূর করতে সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সবাইকে সুযোগ দিতে হবে।
গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রায় এক ঘন্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় আলোচিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক ও সহনশীল চরিত্রের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, চরিত্রের এই দিকগুলো বাংলাদেশের মানুষের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বিগত ৪৩ বছরে যথেষ্ট পরিণত হয়েছে এবং ২০০৯ সাল থেকে দুদেশের সমন্বিত প্রচেষ্টার কারণে নতুন অনেক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রী নারীর ক্ষমতায়নে প্রধানমন্ত্রীর সুদূর প্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বলেন যে, এখন সমাজের সবস্তরে নারীরা তাদের সামর্থ্যের প্রমাণ রাখছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন যে, দু’দেশের সম্পর্ক অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে গভীর ও ব্যাপক। তিনি আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, বহু ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্ব পরিমণ্ডলে সমাদৃত। তিনি সহিংস জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারের অঙ্গীকারের প্রশংসা করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ উন্নয়নের শত্রু। তিনি জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানান এবং তার দায়িত্বকালে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এছাড়াও তিনি তৈরি পোশাক শিল্পের উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সহায়তার নিশ্চয়তা দেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রী রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটকে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকালে প্রয়োজনীয় সকল সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং তার সাফল্য কামনা করেন। বৈঠককালে পররাষ্ট্র সচিব মোঃ শহিদুল হক উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে কানাডার হাইকমিশনার বেনাউ পিয়েরে লারামে সাংবাদিকদের বলেন, উন্নয়ন আর অগ্রগতির স্বার্থেই সহিংসতার অবসান জরুরি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্কালে দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা করেন।
বাংলাদেশের মিডিয়াকে অত্যন্ত তত্পর বলে অভিহিত করে তিনি বলেন যে, বাংলাদেশে বাক-স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তিনি বাংলাদেশ ও কানাডার মধ্যে নিবিড় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ এনে বলেন, দু’দেশের মধ্যে যে অংশীদারিত্ব গড়ে উঠেছে তাতে দু’দেশই সমানভাবে লাভবান হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাাধীনতার অব্যবহিত পরপরই কানাডার স্বীকৃতি প্রদানের কথা উল্লেখ করলে হাইকমিশনার বঙ্গবন্ধু যাদুঘর ও মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে তার সাম্প্রতিক সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রী নারী উন্নয়নে ও নারীদের অধিকার অর্জনে প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। কানাডীয় হাইকমিশনার নারী উন্নয়ন, শিশু স্বাস্থ্য ও প্রাথমিক শিক্ষা খাতে কানাডীয় প্রকল্প সাহায্য অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত জানান। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, কানাডীয় পার্লামেন্ট বাংলাদেশে বিনিয়োগে বরাবরই আগ্রহী। কারণ বাংলাদেশ বৈদেশিক সাহায্য যথেষ্ট কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম। তিনি বাল্যবিবাহ রোধেও একত্রে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রী কানাডীয় হাইকমিশনারকে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকালে সর্বাত্মক সহায়তার নিশ্চয়তা দেন এবং তার সাফল্য কামনা করেন।