অন্যসব শিশুর মতো মরিয়মেরও এখন বন্ধুদের সঙ্গে খেলে বেড়ানোর কথা ছিল। ঘুমানোর আগে মায়ের কাছ থেকে গল্প শোনা, কিছু থেকে কিছু হলেই মায়ের সঙ্গে অভিমান করার কথা ছিল তার। সদা হাসিখুশি সাত বছর বয়সী এই মেয়েটি হাসতে ভুলে গেছে। হাসি কেড়ে নিয়ে যন্ত্রণার নীল রঙ মেখে দিয়েছে পেট্রোল বোমা। মরিয়ম এখন ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন।
৪ ফেব্রুয়ারি, বুধবার। নানী সাফিয়া খাতুনের সঙ্গে গাজীপুর থেকে বলাকা পরিবহনের একটি বাসে কোনাবাড়ী যাচ্ছিল মরিয়ম। খালার বাসা থেকে ফিরছিল নিজেদের বাসায়। বাসটি গাজীপুর ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামনে পৌঁছলে দুর্বৃত্তরা বাসটি লক্ষ্য করে পেট্রোলবোমা ছুড়ে মারে। অন্য অনেকের সঙ্গে দগ্ধ হন মরিয়ম। আগুনে শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়ে গেছে তার। স্থান হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে।
একমাত্র সন্তানের কষ্ট দেখে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন মা নার্গিস বেগম। স্বামীকে হারিয়েছেন দুই বছর হলো। এখন মরিয়মই তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। তাকে নিয়েই বাকিটা জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন নার্গিস। তবে অবরোধের আগুনে সেই মেয়েকেও হারানোর উপক্রম। বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, মুখমণ্ডল ছাড়া মরিয়মের পুরো শরীর সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো। কিছুক্ষণ পরপরই চিত্কার দিয়ে উঠছে। নিজ হাতে কিছুই খেতে পারছে না। তার মা সব খাইয়ে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পরপর মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
গার্মেন্টস কর্মী নার্গিস বেগম বলেন, দুই বছর আগে ক্যান্সারে তার স্বামী আব্দুল মতিন খোকন মারা যান। স্বামীর চিকিত্সার জন্য কম্পিউটারের দোকানসহ জমিজমা সব গেছে।
একমাত্র সন্তানকে নিয়ে গাজীপুর থাকতেন তিনি। মাসিক ৬ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন। ২ হাজার টাকা ঘর ভাড়া দিতে হয়। চার হাজার টাকা দিয়ে কোনো রকম সংসার চলে।
নার্গিস বলেন, প্রতিদিন সকাল ৭টার দিকে গার্মেন্টেসে গিয়ে রাত ৮টায় বাসায় ফিরেন। সকালে মেয়ের জন্য রান্না করে রেখে যান। মরিয়ম একাই বাসায় থাকত। নিজে নিজেই খেতো। প্রতিবেশী সহপাঠিদের সঙ্গে জয়দেবপুর বৌরদা মুসলিমউদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতো।
তিনি বলেন, তার স্বামী মারা যাওয়ার পর বেশ কয়েকটি বিয়ের প্রস্তাব আসে। কিন্তু মেয়ের মুখের দিক তাকিয়ে বিয়েতে রাজি হননি। এমনকি গার্মেন্টসে কোনো খাবার দিলে মেয়ের জন্য নিয়ে আসতেন। বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন নার্গিস।
চোখ মুছতে মুছতে নার্গিস বলেন, স্কুলে বই নেয়ার জন্য এক সপ্তাহ আগে মরিয়মকে একটা নতুন ব্যাগ কিনে দেন। নতুন ব্যাগ পেয়ে মরিয়ম অনেক খুশি হয়। অনেক স্বপ্ন ছিল, মেয়ে পড়াশুনা করে ভালো চাকরি করবে। সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়া তো দূরে থাক, এখন মেয়েকে বাঁচাতেই মরিয়া নার্গিস।
