সিএনজি অটোরিকশা চালক আনোয়ার হোসেন হরতাল-অবরোধে গাড়ি বের করতে চান না। সহিংসতা, আগুন এড়াতে বেশ কয়েকদিন সিএনজি নিয়ে বেরও হননি। খুব ভয় তার আগুনে। কিন্তু এভাবে ঘরে বসে কয়দিন? এতে সংসার চলবে? শেষমেশ ভয় ভেঙ্গে সিএনজি অটোরিকশাটি নিয়ে বের হলেন একদিন। আর সেদিনই পেট্রোল বোমার আগুনে পুড়লেন তিনি। দুই সপ্তাহের বেশি হলো তিনি চিকিত্সাধীন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। তার ছোট্ট মেয়ে দুটি বাবার জন্য পাগল। বারবার বলছে, মা, বাবা কবে বাড়ি ফিরবে?
২৪ জানুয়ারি, শনিবার রাত। চাঁদপুর শহরের হরিণা বাজার এলাকা থেকে খালি সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে বালিয়া ইউনিয়নে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছিলেন আনোয়ার। চান্দ্রা চৌরাস্তা এলাকার খাসের বাড়ির কাছাকাছি গেলে দুর্বৃত্তরা রাস্তার উপর বৈদ্যুতিক খুঁটি ফেলে আনোয়ারের সিএনজি অটোরিকশার গতিরোধ করে। পরে তারা অটোরিকশায় পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারে। দগ্ধ আনোয়ারকে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তরিত করা হয়।
আনোয়ার হোসেনের শরীরের নিচের অংশ, দুই পা ও বাম হাত ঝলসে গেছে। পুড়েছে ভাড়ায় চালানো সিএনজি অটোরিকশাটিও।
চাঁদপুরের হরিণায় আনোয়ারের বাড়ি। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। মা, স্ত্রী আর দুই মেয়ে নিয়ে আনোয়ারের সুখের সংসার। পেট্রোল বোমা এই সুখের সংসারে কষ্ট ও যন্ত্রণা এঁকে দিল।
আনোয়ারের স্ত্রী রাবেয়া বেগম বলেন, ৩ মাস হলো সিএনজিটি আনোয়ার ভাড়ায় চালাচ্ছে। যা আয় হতো তা দিয়ে ভালোই চলছিল সংসার। এখন ৬ বছর বয়সী মেয়ে ফাতেমা এবং ২ বছর বয়সী মেয়ে ময়নাকে নিয়ে আমাদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। সামনের দিনগুলো কিভাবে পার করবো জানি না।
রাবেয়া বলেন, আমার স্বামী নিরীহ মানুষ। কারো সাথেও নেই, পাছেও নাই। তার এমন কেন হলো? মানুষটার কষ্ট সইতে পারছি না। স্বামীর সঙ্গে পুড়ে গেছে আমার সংসারের সব স্বপ্ন। এখন আর কোনো স্বপ্ন দেখি না।
রাবেয়া আরো বলেন, বড় মেয়ে ফাতেমা বায়না ধরেছে স্কুলে যাবে। কেমনে তাকে স্কুলে ভর্তি করাবো। এখন স্কুলে ভর্তি করাতে আর তার পোশাক বানাতে যে টাকা লাগবে, তা যোগাড় করবো কেমনে?
তিনি বলেন, মেয়েরা বাবাকে খুঁজে প্রতিদিন। তাদের বাবা হাসপাতালে আছেন। অন্য কোনো বাবাকে তাদের মেয়েকে আদর করতে দেখলে তাদের বাবাকে কেন হাসপাতাল থেকে বাড়ি আনা হয় না তা নিয়েও কান্নাকাটি করেন।
কথা হয় আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। এই প্রতিবেদককে দেখেই কেঁদে দেন তিনি। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে আমার মেয়েদের কে দেখবে? আল্লাহ, তুমি আমার মেয়েদের দেখে রেখো।
