দানবদের কাছে মাথা নত করব না :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ১২:০০

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশে জঙ্গিদের কোন ঠাঁই নেই। আর তাঁর সরকার দেশে সাম্প্রতিক সন্ত্রাস ও জঙ্গি কর্মকাণ্ডের হোতাদের সঙ্গে কোন আপস করবে না। কারণ মানুষ কখনো দানবের কাছে হার মানতে পারে না। আমরাও দানবদের কাছে মাথা নত করবো না। এই দানবদের প্রতিহত করার মাধ্যমে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। এজন্য সরকার মহাসড়ক ও রেলপথে নাশকতা ঠেকাতে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির পাশাপাশি আনসার বাহিনীর সদস্যদেরও মোতায়েন করছে।

গতকাল গাজীপুরের সফিপুরে আনসার-ভিডিপি একাডেমীর ইয়াদ আলী প্যারেড মাঠে বাংলাদেশ আনসার ও ভিলেজ ডিফেন্স পার্টির ৩৫তম জাতীয় সমাবেশে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া, বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল মো. এনামুল বারী, নৌ বাহিনীর প্রধান ভাইস এডমিরাল এম ফরিদ হাবিব, বাংলাদেশ আনসার বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. নাজিম উদ্দীন এবং বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখন বিএনপি-জামায়াত দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠেছে। দুর্বৃত্তরা ৫ জানুয়ারির নির্বাচন-পূর্ব স্টাইলে আবারো মানুষ হত্যা শুরু করেছে। রাজনীতির নামে তারা বাস-ট্রাকে অগ্নিসংযোগ এবং মানুষ পুড়িয়ে মারছে। তাদের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে ইতিমধ্যে প্রায় একশ’ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন কয়েক শ’। পেট্রোল বোমায় আহতদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিট। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা অকারণে সাধারণ মানুষ পুড়িয়ে মারছে, তারা কি মানুষ না দানব? এটা কি ধরনের রাজনীতি? তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট যা করছে তা সন্ত্রাসী ও জঙ্গি কার্যকলাপ। শেখ হাসিনা বলেন, পেট্রোলবোমা হামলায় দগ্ধদের সকলে শ্রমজীবী নিরপরাধ মানুষ। তারা বাস-ট্রাকের ড্রাইভার, হেলপার ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। খালেদা জিয়ার কাছে এসব মানুষের কোন মূল্য নেই।
আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি মুজিবুর রহমান জানান, সকালে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে করে আনসার একাডেমির মাঠে অবতরণ করেন। সকাল সোয়া ১০টার দিকে তিনি মোটর শোভাযাত্রা সহকারে প্লাটুন কমান্ডার ইয়াদ আলী প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছান। এসময় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও বাংলাদেশ আনসার বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. নাজিম উদ্দীন প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান। পরে তিনি খোলা জিপে করে আনসার বাহিনীর প্যারেড পরিদর্শন এবং সালাম গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক মাসের বেশি সময় ধরে বিএনপি জোট আন্দোলনের নামে পেট্রোলবোমা মেরে সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে। মুখের গ্রাস কেড়ে নিচ্ছে। তারা ধর্মের কথা বলে, কিন্তু তারা বিশ্ব ইজতেমা, মহানবীর (স.) জন্ম-ওফাত দিনেও হরতাল-অবরোধ দিয়েছে। ১৫ লাখ শিক্ষার্থীর এসএসসি পরীক্ষা হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। কোটি কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তারা দেশকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে চায়। নাশকতা ঠেকাতে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রেলপথের নাশকতা রোধে ১ হাজার ৪১ পয়েন্টে ৮ হাজার ৩২৮ জন আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিভিন্ন সড়কেও পর্যায়ক্রমে ৯৯৩ পয়েন্টে ১২ জন করে আনসার সদস্য নিয়োজিত করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নয়নে গত ছয় বছরে তাঁর সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, অর্থনৈতিকভাবে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন হচ্ছে। মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। বিদেশে আমাদের নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। প্রায় ৮৫ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করছে। দারিদ্র্যের হার ২৪ শতাংশে নেমে এসেছে। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ১৯০ ডলার হয়েছে। আমরা ঘরে ঘরে বিদ্যুত্ পৌঁছে দিচ্ছি। দ্রব্যম্যূলের দাম স্থিতিশীল। মূল্যস্ফীতির হার ১ দশমিক ৫৯ শতাংশে নামিয়ে এনে প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর এই বাহিনীকে জাতীয় পতাকা প্রদান করা হয়। ব্যাটালিয়ন আনসারদের চাকরি স্থায়ীকরণের সময়সীমা ১৫ বছর থেকে কমিয়ে ৯ বছর করা হয়। আরও কমানো যায় কিনা, তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
ব্যাটালিয়ন আনসারদের মূল বেতনের ৩০ শতাংশ ঝুঁকি ভাতা, টাইম স্কেল, দুইটি বার্ষিক বর্ধিত বেতন ছাড়াও রেশন ভাতা ৫০ থেকে ৮০ টাকায় উন্নীত করার কথাও বলেন তিনি। কর্তব্যরত অবস্থায় কোনো আনসার সদস্য মারা গেলে ৫ লাখ টাকা ও গুরুতর আহত হলে ২ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেয়ার কথাও বলেন সরকার প্রধান। তিনি বলেন, আমরা অস্থায়ী ব্যাটালিয়ন আনসার, বিশেষ আনসার, হিল আনসার ও অঙ্গীভূত আনসার সবার জন্য মহার্ঘ্য ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করেছি। গত বছর ৬৭২ জন মহিলা আনসার সদস্যকে স্থায়ী পদে পদায়ন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সকলের মনে রাখা প্রয়োজন দেশের জনগণ সবার ওপরে। প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অবস্থান থেকে জনগণের জান-মালের হেফাজত করা পবিত্র দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সকলের সহযোগিতায় ২০২১ সালের মধ্যে আমরা একটি ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা মুক্ত ও প্রযুক্তি-নির্ভর বাংলাদেশ গঠনের মাধ্যমে উন্নয়নের পথ ধরে সম্মুখে এগিয়ে যাব।
অনুষ্ঠানে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর দুজনকে বাংলাদেশ আনসার পদক (সাহসিকতা), ১৫ জনকে রাষ্ট্রপতি আনসার পদক (সাহসিকতা), দুজনকে রাষ্ট্রপতি ভিডিপি পদক (সাহসিকতা), সাতজনকে বাংলাদেশ আনসার  (সেবা) পদক, ৩৮ জনকে রাষ্ট্রপতি আনসার (সেবা) পদক, আটজনকে বাংলাদেশ ভিডিপি (সেবা) পদক ও ২৫ জনকে রাষ্ট্রপতি ভিডিপি (সেবা) পদক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নারায়ণগঞ্জের বন্দর ও নগরবাসীর দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত ‘শীতলক্ষ্যা’ সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। আগামীকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করবেন। এ উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়।