রাজউকে নকশা বাণিজ্য ‘ওপেন সিক্রেট

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ০০:৫৬
 
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নকশা বাণিজ্য এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। রাজউকের এক শ্রেণির কর্মকর্তা কর্মচারী থেকে শুরু করে এই কর্মকাণ্ডে জড়িত সংঘবদ্ধ দালাল চক্র। যেখানে সঠিক নিয়মে নকশা অনুমোদনে সময় লাগার কথা ৪৫ দিন সেখানে একটি নকশা অনুমোদনে সময় লেগে যায় এক বছরেরও বেশি। প্রতি বছর এই খাতে দুর্নীতি হচ্ছে কয়েক শ কোটি টাকা বলে জানা গেছে।
অবশ্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, রাজউকের দুর্নীতি রাতারাতি বন্ধ করা না গেলেও তা সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, ৪৫ দিনের মধ্যে বাড়ির নকশা অনুমোদনের জন্য রাজউককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মানুষের দুর্ভোগ দূর করতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়ামাত্র দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্বে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বিশেষজ্ঞের মতে, প্রশাসনিকভাবে জবাবদিহিতার জায়গা দুর্বল বলেই দালালদের হাতে জিম্মি আবেদনকারীরা। আর রাজউক বলছে, দালাল বাণিজ্যের জন্য দায়ী জমির মালিকরা।
জানা গেছে, ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র পেতেই একজন আবেদনকারীকে কয়েক টেবিল পার করতে হয়। রাজউকের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল, দীর্ঘ মেয়াদী ও ঝামেলাপূর্ণ। নকশা অনুমোদনের জন্য রাজউকে আবেদন করার  ৪৫ দিনের মধ্যে নকশা অনুমোদন করার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। অনেকেই বাড়ির নকশা অনুমোদন করতে দীর্ঘ সময় রাজউকে ঘুরপাক খাচ্ছেন। অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোন আপত্তি থাকলে এক মাসের মধ্যে রাজউক থেকে তা গ্রাহককে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়ম মানা হয় না।
প্রতি বছর ২০ থেকে ২৫ হাজার বাড়ির নকশা অনুমোদনের জন্য রাজউকে জমা পড়ছে। তার মধ্যে নানা কারণ দেখিয়ে ৮০ শতাংশ নকশা অনুমোদন হচ্ছে না।
নগরীর বহু জমির মালিক যথাযথ নিয়মে নকশা অনুমোদনের আবেদন করেও সীমাহীন ভোগান্তিতে হয়ে পড়েন দিশেহারা।
প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে দালাল বাণিজ্যের কারণ জানতে চাইলে তারা সরাসরি দায়ী করেন জমির মালিকদের।
নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, প্রশাসনিক ভাবে জবাবদিহিতার জায়গা দুর্বল বলেই কমছে না দালাল আর বাড়ছে দুর্ভোগ ।
ভুক্তভোগী ব্যারিস্টার আক্তারুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, রাজউক আবার দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হচ্ছে এস্টেট ও প্ল্যানিং শাখায়। টাকা-পয়সা দিয়েও মানুষ সীমাহীন হয়রাণির শিকার হচ্ছেন প্ল্যানিং শাখায়। এখানে বাড়ির প্ল্যান পাসে এক বছরেরও অধিক সময় লাগছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রাজউক থেকে ক্ষুদ্র ও বৃহত্ প্রকল্প হিসাবে প্ল্যান পাস করা হয়। ৩ থেকে ৯ তলা পর্যন্ত ক্ষুদ্র আর ১০ তলার উর্ধ্বে ভবনকে বৃহত্ প্রকল্প বলা হয়। ক্ষুদ্র প্রকল্পের জন্য ৫ থেকে ১০ লাখ, আর বৃহত্ প্রকল্পের জন্য ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত উেকাচ গ্রহণ করার অভিযোগ রয়েছে। মোটা অংকের উেকাচ দিলেও ৩ মাসের আগে কোন প্রকল্প পাস হচ্ছে না।
রাজউকে বাড়ির প্ল্যান পাস করতে আসা কয়েকজন ভুক্তভোগী ও একাধিক ডেভেলপার জানান, একটি বৃহত্ প্রকল্প পাস করতে ভূমি ছাড়পত্রসহ ১৩টি সংস্থা থেকে ছাড়পত্র সংগ্রহ করে অনুমোদনের জন্য ফাইল রাজউকের প্ল্যানিং শাখায় জমা দিতে হয়। প্রতিটি ছাড়পত্রের মেয়াদ থাকে সর্বোচ্চ এক বছর। রাজউকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও দালালদের চাহিদা মাফিক অর্থ না দিলে বাড়ির প্ল্যান পাস না করে ভুক্তভোগীদের মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর নানা অজুহাতে ঘুরানো হয়। এতে করে ১৩টি সংস্থা থেকে সংগ্রহ করা ছাড়পত্রের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। ফলে ভুক্তভোগীরা সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে পড়েন। (১৩টি ছাড়পত্র সংগ্রহ করতেও কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়)।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের এক প্রকৌশলী ইত্তেফাককে বলেন, ইতিপূর্বে একই স্থানে সব ধরনের সেবা দেয়ার লক্ষ্যে গঠন করা হয় ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেল। তবে কিছুদিন পর তা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। সমপ্রতি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী পুনরায় ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর নির্দেশ দিলেও রহস্যজনক কারণে তা কার্যকর হচ্ছে না। এদিকে গত ডিসেম্বর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে নকশা আবেদন প্রক্রিয়া ডিজিটাল হবার কথা থাকলেও  তা কার্যকর হয়নি।
২৬ বিসি কমিটি গঠন
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতে ৮টি থেকে বাড়িয়ে ২৬টি বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন (বিসি) কমিটি গঠন করার পরিকল্পনা নিয়েছে। শিগগিরই কমিটি গঠনের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। এই কমিটির কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জি এম জয়নাল আবেদীন ভুঁইয়া।
রাজউকের সদস্য (পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ) শেখ আবদুল মান্নান ইত্তেফাককে জানান, ৯তলা থেকে তার ঊর্ধ্বে ইমারত নির্মাণ সংক্রান্ত অনুমোদনের জন্য ২টি বিসি কমিটি থাকবে। কমিটির প্রধান থাকবেন রাজউকের সদস্য পরিকল্পনা এবং সদস্য উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ। বাকি ২৪টি কমিটির প্রধান থাকবেন জোনাল অফিসের পরিচালকরা। জোনাল অফিসের জন্য গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ ও সাভারে নতুন কার্যালয় স্থাপন এবং জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। বিসি কমিটি গঠিত হলে জোনাল অফিসের কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হবে। ইমারত নির্মাণ সংক্রান্ত নকশার অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, বিল্ডিং নির্মাণ তদারকিসহ যাবতীয় কাজ জোনাল অফিস থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। কেউ ইমারত নির্মাণ করতে চাইলে তাদের কষ্ট করে আর রাজউক ভবনে আসতে হবে না।
রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জি এম জয়নাল আবেদীন ভুঁইয়া ইত্তেফাককে বলেন, ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর প্রক্রিয়া চলছে। রাজউকের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং রাজউকের সেবা জনগণের দৌরগোড়ায় পৌঁছে দিতেই এসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করি, শিগগিরই বিসি কমিটি গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন  হবে। এই কমিটির কার্যক্রম শুরু হলে জনগণের দুর্ভোগ বহুলাংশে কমে আসবে। পাশাপাশি রাজউকের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।