মুক্তিযুদ্ধ আমাদের নিরন্তর প্রেরণার উত্স। বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলায় তার প্রমাণ মেলে প্রতিবছর। বাঙালির মহান অর্জন এই মুক্তিযুদ্ধ নানাভাবে উঠে আসছে লেখকদের লেখায়। গবেষণায়, গল্পে, স্মৃতিচারণে- মুক্তিযুদ্ধ উঠে আসছে নানামাত্রার প্রকাশনার মধ্য দিয়ে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তিযুদ্ধের বই যেন এক ভিন্নমাত্রার দ্যোতনা নিয়ে উপস্থিত হয় পাঠকদের সামনে। এই সেই ঐতিহাসিক স্থান যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ডাক। এই সেই ঐতিহাসিক স্থান যেখানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল। অপরদিকে ভাষা আন্দোলনের গৌরবগাথাকে সমুন্নত করতে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বাংলা একাডেমি। এ দুই প্রাঙ্গণে একসঙ্গে চলছে বাঙালির প্রাণের মেলা, অমর একুশে গ্রন্থমেলা। এ পর্যন্ত কয়েকশো মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে বলে জানালেন মেলা কর্তৃপক্ষ।
প্রকাশকরা জানালেন সবচেয়ে আশাপ্রদ ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থের সবচেয়ে বড় ক্রেতা তরুণ ও কিশোররা। মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক রচনার প্রতি সব বয়সী পাঠকের আগ্রহ থাকলেও নবীনদের আগ্রহের মাত্রাটা অনেক বেশি। ফলে প্রকাশকরাও এসব বই প্রকাশে বিশেষভাবে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। সেই সূত্র ধরে প্রতিবছরই মেলায় আসছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নতুন বই। তথ্যসংবলিত বইয়ের পাশাপাশি গল্প-উপন্যাস কিংবা কবিতার চরণেও উঠে আসছে একাত্তরের বীরত্বগাথা।
তাম্রলিপির প্রকাশক এ কে এম তারিকুল ইসলাম রনি বললেন, মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘গ্রামের নাম কাঁকনবিবি’ এবার তরুণদের আগ্রহের শীর্ষে রয়েছে। তারা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আগ্রহী বলেই এই কিশোর উপন্যাসটি কিনছেন।
বৃষ্টি-স্নাত ম্লান মেলা
এদিকে, বুধবার রাতভর বৃষ্টি ঝরেছে। তার প্রভাব পড়েছে মেলায়। মেলা প্রাঙ্গণে স্থানে স্থানে পানি জমে আছে, অনেক জায়গায় কাদা জমে পিচ্ছিল হয়ে পড়েছে। ফলে ক্রেতাদের বেশ অসুবিধায় পড়তে হয়েছে। এদিকে, বৃষ্টিতে অনেক প্রকাশনা সংস্থার স্টলে পানি প্রবেশ করায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অনেক প্রকাশক। প্রকাশকরা বলছেন, মেলার আয়োজক বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ আর অঙ্গসজ্জার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা স্টেপ মিডিয়ার উদাসীনতায় এমনটি ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান জানান, ‘বৃষ্টি একটি প্রাকৃতিক বিষয়, এতে আমাদের কারো কোন হাত নেই। আমরা সঠিকভাবেই স্টল সজ্জা করেছি। একই সঙ্গে আমরা স্টল বরাদ্দ দেওয়ার সময়ই বলে দিয়েছিলাম, প্রকাশকরা যেন রাতের বেলা নিজেদের বই ট্রাঙ্কে ভরে রাখেন। একই সঙ্গে যেন পলিথিন দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয় ট্রাঙ্কটি। কিন্তু তারা তেমনটি করেননি।’ এছাড়া বৃষ্টিতে মেলার ছন্দপতন ঘটবে না বলেও মনে করেন তিনি।
এদিকে, মেলা ঘুরে দেখা যায় বাংলা একাডেমি অংশে থাকা কোন সংস্থার স্টলে পানি প্রবেশ করেনি। তবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায় উল্টো চিত্র। উপরে ত্রিপলের ফুটো দিয়ে পানি পড়ে বই ভিজে একাকার। সবাইকেই পানি সরিয়ে বসতে হয়েছে বইয়ের পসরা সাজিয়ে। প্রায় শতাধিক স্টলের বই ভিজে যাওয়ায় তারা মেলা প্রাঙ্গণে শুকাতে দেন। ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশনা সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে— শিল্পতরু, গতি, বিভাস, অন্যপ্রকাশ, অন্বেষা, মূর্ধণ্য, অন্যধারা, ইত্যাতি গ্রন্থপ্রকাশ, হাওলাদার পাবলিকেশন, শিকড়, উত্স প্রকাশন, কালি ও কলম প্রকাশন, চারুলিপি, নালন্দা, আদি প্রকাশন, কথাপ্রকাশ, অবসর, জাগৃতি, আলপনা, সাহিত্যদেশ, চন্দ্রাবতী একাডেমি, ফেয়ার পাবলিশিং হাউজ, শ্রাবণ, প্রিয়মুখ, আগুন্তুক, শিখা প্রকাশনী, মনন, আলেয়া বুক ডিপো, ধ্রুবপদ, আদর্শ, আহমদ পাবলিশিং, উত্তরণ, কাগজ প্রকাশন, সিদ্দিকিয়া পাবলিশিং হাউস, বিজয় প্রকাশ, টুম্পা প্রকাশনী, মিজান পাবলিশিং হাউস, অঙ্কুর, জোনাকী, প্রান্ত, মেলা, গতিধারা প্রভৃতি।
নজরুল মঞ্চে মোড়ক উন্মোচন
বৃহস্পতিবার মেলার নজরুল মঞ্চে ১৯টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। এর মধ্যে— সিজন নাহিয়ানের ‘তাল না মেলানোর ছন্দ’র মোড়ক উন্মোচন করেন মফিদুল ইসলাম। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু উন্মোচন করেন সৈয়দা রাশিদা বারীর ‘সুস্থ শরীর সুন্দর’, ‘যদি সুস্থ থাকতে চান’ ও ‘ঝংকৃত কথামালা’, মোহম্মদ সোহেল হোসেনের ‘সে আলোয় তোমায় দেখি না’। কবি ও রাজনীতিবিদ নূহ-উল-আলম লেনিন উন্মোচন করেন আয়েশা হকের ‘মক্কা মদিনায় ৩৩ দিন’, ফারহান জাহাঙ্গীরের ‘লিজেন্ডস’ এবং দর্পণ কবীরের ‘এক মলাটে ৮ উপন্যাস’।
নতুন বই
গতকাল বৃহস্পতিবার মেলার ১৯তম দিনে নতুন ৭৭টি বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ১১, উপন্যাস ৮, প্রবন্ধ ২, কবিতা ২৫, ছড়া ২, শিশুসাহিত্য ৮, জীবনী ২, মুক্তিযুদ্ধ ১, বিজ্ঞান ১, ভ্রমণ ২, সায়েন্স ফিকশন ২ এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর ১৩টি নতুন বই এসেছে।
মেলামঞ্চের আয়োজন
বৃহস্পতিবার মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শামসুদ্দিন আহমদ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন কামালউদ্দিন, ড. ফেরদৌসী বেগম এবং নূরুন্নাহার মুক্তা। সভাপতিত্ব করেন মোঃ শাহ-ই-আলম। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মো. মোশাররফ হোসেনের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘দৃষ্টি’, এম আর মনজুর পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘শুভজন’, শেখ উজ্জ্বলের পরিচালনায় আওয়ামী সাংস্কৃতিক ফোরাম এবং বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে।
আজকের অনুষ্ঠান
আজ শুক্রবার বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘ভাষাসংগ্রামী আবদুল মতিন’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আহমাদ মাযহার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন মাসুদা ভাট্টি এবং মোহাম্মদ আলী। সভাপতিত্ব করবেন লেখক-গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ।
এর আগে সকালে অমর একুশে উদ্যাপন উপলক্ষে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। বিচারক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন আবৃত্তিজন আশরাফুল আলম, ডালিয়া আহমেদ এবং মাহিদুল ইসলাম। প্রতিযোগিতায় সভাপতিত্ব করবেন একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান।