বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ডাকা টানা অবরোধের ৪৭তম দিন পার হল গতকাল শনিবার। দীর্ঘ দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা অবরোধের মধ্যে থেমে থেমে চলছে হরতাল। বিরোধী জোটের এই কর্মসূচিতে পেট্রোলবোমার ব্যবহার হচ্ছে হামেশাই। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও পেট্রোলবোমায় দগ্ধ হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
কর্মসূচিতে ককটেলের ব্যবহারও খুবই সাধারণ ঘটনা। প্রতিদিন রাজধানীতেই অন্তত দুই থেকে তিন ডজন ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছে। ফুটপাথ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পার্ক— যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে ককটেল। আর এই পড়ে থাকা অবিস্ফোরিত ককটেলের নির্মম শিকার হচ্ছে পথশিশুরা। রাস্তা-ঘাটে কুড়িয়ে পাওয়া এসব ককটেল নিয়ে খেলতে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটছে। এতে আহত হচ্ছে শিশুরা।
রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘এটা অত্যন্ত অমানবিক। আমাদের সবার পরিবারে শিশু আছে। তাই আমাদের সবাইকে শিশুদের ব্যাপারে আরো সতর্ক হতে হবে। এভাবে যদি রাস্তা-ঘাটে কুড়িয়ে পাওয়া ককটেলে শিশুরা হতাহত হতে থাকে তাহলে জাতির জন্য ভবিষ্যতে ভয়ঙ্কর দিন অপেক্ষা করছে। তখন শত চেষ্টা করেও পরিত্রাণ মিলবে না।’
গত এক সপ্তাহে অন্তত ৪ জন শিশু পরিত্যক্ত ককটেল নিয়ে খেলতে গিয়ে বিস্ফোরণে আহত হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর আজিমপুরে মধ্যকলোনি স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণে ইমন হোসেন নামে এক শিশু আহত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ওই এলাকায় একটি বেলগাছের গোড়ায় তিনটি ককটেল পড়ে ছিল। সেখানে ইমন হোসেন এবং তার আরও দু’জন বন্ধু নাইম ও তানজিল ঘোরাফেরা করছিল। ইমন না বুঝে বেলগাছ থেকে বেল পাড়ার জন্য একটি ককটেল ছোঁড়ে। এ সময় ককটেলটির বিস্ফোরণ হয়। এতে ইমনের বাম পায়ে আঘাত লাগে। তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সা দেয়া হয়েছে। ইমনের বাবার নাম হারুন মিয়া। আজিমপুরে সে তার দাদার সঙ্গে থাকে। ইমনের দাদা আশরাফ আলী কবরস্থানে কাজ করেন। ইমন আজিমপুর আদর্শ বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে।
শুধু ইমন নয়, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী তিনটি শিশু ককটেল বিস্ফোরণে আহত হয়েছে। শাহবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কুড়িয়ে পাওয়া ককটেল নিয়ে হোসাইন, মানিক ও রিপন নামে তিনটি পথশিশু খেলা করছিল। হঠাত্ তাদের হাতেই সেগুলোর বিস্ফোরণ ঘটে। এতে তিনজনই আহত হয়। এদের মধ্যে রিপনের হাতের কব্জি উড়ে গেছে।’ পরে এই শিশুদের চিকিত্সা দিয়ে পরিবারের জিম্মায় দেয়া হয়েছে। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, এভাবে পথেঘাটে ককটেল পড়ে থাকলে পথশিশুরা ভয়ঙ্কর ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ তাদের এমনিতেই স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, আমাদের দেশে পথশিশুরা নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে দিন পার করে। স্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকে শুরু করে সব ধরনের ঝুঁকিই তাদের রয়েছে। এর মধ্যে ককটেল নতুন ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি পরিত্যক্ত ককটেল বিস্ফোরণে বেশ কিছু শিশু আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ককটেল তৈরি এবং নিক্ষেপকারীদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে অভিযান চালাচ্ছে। এদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। প্রতিদিনই বোমাবাজ বা নিক্ষেপকারী পুলিশের হাতে গ্রেফতার হচ্ছে। পুলিশের চলমান অভিযান আরো জোরদার করা হবে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
গত বছরের ২৫ আগস্ট যশোরে পরিত্যক্ত ককটেল নিয়ে খেলার সময় বিস্ফোরণে তিনটি শিশু আহত হয়। আহতরা হলো– ওই এলাকার মনিরুল ইসলামের ছেলে রিয়েল (৭), সহিদুল ইসলামের ছেলে সিয়াম (৮) ও আব্দুস সাত্তারের ছেলে আব্দুর রহমান (১২)। যশোর কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইনামুল হক তখন বলেছিলেন, শিশু তিনটি শহরের ঘোপ সেন্ট্রাল রোডের আমবাগানে খেলছিল। এ সময় তারা লাল টেপে মোড়ানো একটি ককটেল দেখে টেনিস বল মনে করে খেলতে শুরু করে। এরই এক পর্যায়ে সেটি বিস্ফোরিত হলে তারা আহত হয়।
২৪ জুলাই পুরান ঢাকার ইসলামবাগের নামাপাড়ার কমিশনার গলিতে কুড়িয়ে পাওয়া একটি ককটেল বিস্ফোরিত হলে তিন শিশু আহত হয়। শিশু তিনটি হল প্লাস্টিক কারখানার কর্মচারী নয়ন মিয়ার মেয়ে সাদিয়া আক্তার (১০) ও তার প্রতিবেশী সুলতানা (৭) ও রিফাত (৪)। নয়ন মিয়া জানান, সকালে কমিশনার গলিতে শিশুরা খেলা করছিল। সেখানে বস্তাবন্দী অবস্থায় রাখা ছিল কিছু ভাঙ্গারি সরঞ্জাম। এ রকম দু’টি বস্তার ফাঁকে লাল টেপে মোড়ানো একটি কৌটা দেখতে পায় সুলতানা। সে কৌটাটি বের করে রিফাতের হাতে দিয়ে বলে, ‘দ্যাখ তো, এইটা কী?’ রিফাত একটু নেড়েচেড়ে বলে, ‘এইটা তো মনে লয় বোমা।’ তখন অন্য দুই শিশু ভয়ে দ্রুত বোমা ফেলে দিতে বলে। তড়িঘড়ি করে রিফাত কৌটাটি ফেলে দিলে সেটি বিস্ফোরিত হয়। এ সময় স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়ে তিনজনই আহত হয়। পরে লোকজন তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
এভাবে প্রতিনিয়তই রাজধানী বা রাজধানীর বাইরে পরিত্যক্ত ককটেল বিস্ফোরণে শিশুরা আহত হচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণের পথ কি? এমন প্রশ্নের জবাবে মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশে যে প্রবণতা চলে আসছে, আমরা তা থেকে বের হতে পারিনি। আসলে অভিভাবকদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে। সর্বোপরি গণতন্ত্রের ভিত যখন দুর্বল হয়ে যায় তখন শুধু শিশু নয়, সব ধরনের মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হতে থাকে। এ থেকে পরিত্রাণের পথ-গণতান্ত্রিক ভিতকে আরো শক্তিশালী করা। তাহলে কোন সমস্যাই থাকবে না।
