৭২ লাশ উদ্ধার, হস্তান্তর ৫৭

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ০১:৩৮

পদ্মায় লঞ্চডুবি
এম ভি মোস্তফাকে টেনে তুলেছে রুস্তম, অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা

পাটুরিয়া ঘাটের নিকট পদ্মায় ডুবে যাওয়া লঞ্চ এমভি মোস্তফা গতকাল সোমবার ভোরে টেনে তোলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত রবিবার বেলা পৌনে ১২টায় লঞ্চডুবির পর মাওয়া থেকে ছেড়ে আসা উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম রাত বারটার দিকে উদ্ধার কাজ শুরু করে। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ৬৯ লাশের নাম-তালিকা থাকলেও উদ্ধারকাজে অংশ নেয়া ‘সেফ’ নামের উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা এ সংখ্যা ৭২ বলে জানিয়েছেন। আত্মীয়-স্বজনের নিকট এ যাবত্ ৫৭টি লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ১৪ জন শিশু, ২০ জন নারী ও অন্যগুলো পুরুষের লাশ। লঞ্চ থেকে একে একে উদ্ধার হওয়া লাশ আত্মীয়-স্বজনের কাছে হস্তান্তরের সময় লোকজনের আর্তচিত্কারে গোটা এলাকায় এক শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নিখোঁজদের আত্মীয়রা হন্নে হয়ে স্বজনদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

শিবালয় দক্ষিণ তেওতার লঞ্চ কর্মচারী আবুল হাসেম হাসু (৫৫), নড়াইল নরাগাতি গ্রামের আলেয়া বেগম (৩২), লোহাগাড়ার শাহেদা বেগম (৬০), রাজবাড়ীর পাংশার আজিরুন্নেছা (৩৮), হালিমা বেগম (৪৫), শাকেরা বেগম (৫০), সদরের রেখা রানী মালাকার (৪৫), ঝিনাইদহ শৌলকুপার মারুফা আক্তার (৫), ঢাকা কদমতলীর বাসিন্দা ব্র্যাক কর্মকর্তা মোস্তফা মন্ডলসহ (৩৫) ১৫ জন নিখোঁজ রয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের দেয়া তথ্যানুযায়ী নিহতরা হচ্ছে ঃ মানিকগঞ্জের শিবালয়ের ছোট বোয়ালীর অঞ্জলী সূত্রধর (৬০), ষাইটঘরের লঞ্চ কর্মচারী রতন চন্দ্র সরকার (৫২), শিমুলিয়ার হোসাইন (২), লতা (২২), ইন্তাজগঞ্জের আবুল হাসেম (৪৫), দৌলতপুরের ইমরান (৮), বাঘুটিয়ার লাবনী আক্তার মুক্তা (১৫), সেলিম (২২), পাবনা কোলাদী গ্রামের বাসিন্দা বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক ফজলুর রহমান খাঁন (৫৫), রাজবাড়ী পাংশার হালিমা বেগম (৪৫), বালিয়াকান্দীর মঞ্জিলা বেগম (৪৫), নাছিমা আকতার (৩৬), এনামুল (১৪), ব্রাহ্মণদীয়ার রাবেয়া বেগম (২৮), গোয়ালন্দের রুমা আক্তার (২৫), উত্সব (৭), নুসরাত নূর (২) ফারজানা আক্তার স্মৃতি (২), সুফিয়া (২৮), নবীজান (৩২), বত্তারপুরের অসিমা রানী (৪০), শিবরামপুরের জয়নাল শেখ (৪০), ছাবেরা (৫০), রহমান (৫৫), কুষ্টিয়ার কমলাপুরের মেহদি হাসান বাপ্পী (৩০), মিলপাড়ার লায়লা (৬), নাসির উদ্দিন (৪০), কুমারখালীর বিথী (১৫), মর্জিনা (৫), ডলি খাতুন (৩৪), ইমন (১), ইদ্রিস (৫০), মধুসুধন সাহা (৬০), খোকসার মোস্তফা (৫৫), এনামূল হক (১৮), ছেঁউড়িয়ার সাবু (২৫), মিরপুরের শরিফ (২৫), আসাদুল (২৮), আরুয়াপাড়ার ডা. নবনিতা পাল টিনা (৩০), ফাতেমা (৪০), নড়াইল নাড়াগাতির আমেনা বেগম (৩৫), হুসাইন ফকির শফি (২৮), কেয়া মনী (৭), হাফছা (৮), ফরিদপুর কোতয়ালীর মমতা বেগম (৪০), নার্গিস (১১), রতন কুমার সরকার (৩৪), পাপন (৫), রেবেকা সুলতানা (৩৩), নগরকান্দার বাঁধন (৫), সালথার চম্পা রানী (৫৮), বৈধ্য নাথ মালো (৫৫), অনিমা রানী মালো (৪৫), অর্চণা (৪৫), বোয়ালমারির শারমিন (২৫), মারজানা (৬), সদরপুরের স্বপন সরকার (৫২), কাশিয়ানীর শাহানাজ (৪৫), মাগুরা শ্রীপুরের লাইলী বেগম (৬৫), গোপালগঞ্জ কাশিয়ানীর জুনায়েদ (১), বনগ্রামের আসলাম মোল্লা (৩৫), আরুয়াকান্দীর রিনা (২৩), কুমিল্লার আব্দুল মোন্নাফের পুত্র আবুল হাসান (৬৫), সুরেন্দ্র ভৌমিকের পুত্র পরিমল ভৌমিক (৪৫), মেহেরপুরের হায়দার আলী (৫০), নীলফামারী দুলাপাড়ার রিয়া মনী (৩), শেরপুর নকলার লিটন (৫০)।
আত্মীয়-স্বজনের নিকট লাশ হস্তান্তরের সময় জেলা প্রশাসন ও লঞ্চ মালিকের পক্ষ থেকে নগদ ২০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়। প্রয়োজনীয় তথ্যের ভিত্তিতে আরো ১ লাখ ৫ হাজার টাকা করে দেয়া হবে বলে নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান ঘটনার দিন বিকালে ঘোষণা দেন। 
অভিযোগ উঠেছে, দুর্ঘটনাস্থলে অগভীর পানিতে তলিয়ে থাকা লঞ্চ উদ্ধারে স্থানীয় প্রশাসনের রহস্যময় দীর্ঘসূত্রতা ও অযথা সময় নষ্টের কারণে বেঁচে যাওয়া যাত্রী, আত্মীয়-স্বজনের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। উদ্ধারকর্মী ও ডুবুরিরা জানান, ঘটনাস্থলে ১৮ ফুট পানির গভীরতা রয়েছে। লঞ্চের একাংশ পানির ওপর দৃশ্যমান ছিল। ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, কম গভীরতায় লঞ্চ নিমজ্জিত হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা থেকে আসা ডুবুরিদলকে যথাসময়ে লাশ উদ্ধারের কাজে লাগানো হয়নি। উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম ঘটনাস্থলে পৌঁছে শেষ রাতে লঞ্চটি প্রায় ৩ কিলোমিটার ভাটিতে টেনে নিয়ে পদ্মার তীরে তোলে। সকাল ১০টার দিকে পাটুরিয়া কন্ট্রোল রুম ‘মোহনায়’ মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, ডুবে যাওয়া লঞ্চ টেনে তোলার জন্য ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত গভীরতা না থাকায় সুবিধাজনক স্থানে তা টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া, লঞ্চ উদ্ধারকাজ সমাপ্ত হলেও লাশ খোঁজা অব্যাহত থাকবে। শিবালয় থানা ওসি রকিবুজ্জামান ইত্তেফাককে জানান, কার্গোটির মালিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে। কার্গো থেকে আটক ৩ লস্কর  বর্তমানে থানা হাজতে রয়েছে।
অপরদিকে দুর্ঘটনা তদন্তে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর ও বিআইডব্লিউটিএ যথাক্রমে পাঁচ ও তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে। গঠিত কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।
জেপি’র শোক

জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও  মহাসচিব ও সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌ-রুটে লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৭২ জনের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে জেপি নেতৃদ্বয় বলেন, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার কারণ বের করে দোষী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। জেপি নেতৃদ্বয় মরহুমদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোক-সন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।-প্রেস বিজ্ঞপ্তি