বাবার কবরে এক গুচ্ছ ফুল দিয়ে কেঁদে উঠলো তাহসিন বিন রহমান রামী (১৪)। নিরব বেদনা যেন কান্না হয়ে বের হতে থাকলো। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দাদী কোহিনুর রহমান বুকে আগলে নিলেন। চিৎকার করে কাঁদতে থাকলো রামী। ছয় বছর আগে এই দিনে সকাল ৮ টার দিকে তার বাবা মেজর মিজানুর রহমান বাসা থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। সকালে দরবার হলে বৈঠকে অংশ নিবেন। এর কিছু সময় পর দাদীর কাছ থেকে শুনতে পান যে দরবার হলে গোলাগুলি হচ্ছে। দুইদিন পর বাবার লাশ পায় রামী। রামী এখন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের নবম শ্রেণীর ছাত্র।
পিলখানা হত্যাকাণ্ড দিবসের এই দিনে বাবার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে রামী শুধু বাবার কথাই মনে করছে। বাবা তাকে প্রায়ই বলতেন, দেশ গড়তে হলে সৎ ও নির্ভীক সৈনিক হতে হবে। সেই নির্ভীক সৈনিক হয়েই তার বাবাকে প্রাণ দিতে হলো।
বনানী সামরিক কবরস্থানে পিলখানা হত্যাকাণ্ড দিবসে নিহত ৫৭ জন সামরিক কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। সকাল ৯ টায় রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হোসেন ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বীর বিক্রম শ্রদ্ধা জানান। এরপরই নিহত সেনা সদস্যদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পক্ষে সিনিয়র স্বরাষ্ট্র সচিব মো. মোজাম্মেল হক খান, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া, নৌ-বাহিনীর প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল এম ফরিদ হাবিব, বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল মোহাম্মদ ইনামুল বারী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমদ। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শহীদদের সম্মানে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয় এবং তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এরপর শ্রদ্ধা জানান জাতীয় পার্টির চেযারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এরশাদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর নিহতদের স্বজন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা শ্রদ্ধা জানান। সেখানে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা কবর জিয়ারত করেন। পরিবারের মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তান ও ভাই-বোনরা কবরের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকেন। ছয় বছর পরও সেই বিভীষিকাময় ঘটনার কথা মনে হতে তাদের মন হু হু করে কেঁদে ওঠে।
মেজর রফিকুল ইসলামের স্ত্রী সানজানা সোনিয়া জোবায়দা জানান, তার স্বামীকে কী কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবেন। ও (স্বামী) মারা যাওয়ার আট মাস পর আমার প্রথম সন্তানের জন্ম হয়। এই ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে এখন আমি কী করবো। আমার ছেলে মাঝে মধ্যেই বলে আব্বু কোথায়। আমি কী জবাব দেব।’
তিনি বলেন, ‘আমার একটাই চাওয়া যেন শুধুমাত্র বিদ্রোহকারী নয়। এর নেপথ্যে যারা ছিলো তাদেরও যেন বিচার হয়। শুধু বিচারের রায় ঘোষণা নয়, রায় কার্যকরও দ্রুত করতে হবে।’
ঘটনার বিবরণ দিয়ে মেজর মিজানুর রহমানের মা কোহিনুর রহমান জানান, বড় আশা নিয়ে ছেলেকে দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে। দেশ গড়ার কাজে বলীয়ান হয়ে নিজের ও পরিবারের গৌরব বয়ে আনবে। কিন্তু হঠাৎ ঝড়ে সব শেষ করে দিয়েছে তার সেই স্বপ্ন। ঘটনার দিন সকাল পৌনে ৮টায় বাসা থেকে বের হয় তার ছেলে। কিছুক্ষণ পর জানতে পারেন পিলখানায় গোলাগুলি হচ্ছে। শুনেই আঁতকে উঠেন। সেই যে গেলো আর ফিরে এলো না।
বাবার কবর জিয়ারত করতে আসা রামী ও ফারদিন রহমান সামীকে (৮) দেখিয়ে কোহিনুর কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ঘটনার ৯ মাস আগে মিজানের স্ত্রী দুরারোগ্য ব্রেইন ক্যান্সারের কাছে হার মেনে আমাদের ছেড়ে যান। এরপর এই দুই ছেলে তাদের বাবাকেও হারায়।’
বিজিবি’র কর্মসূচি : পিলখানা হত্যাকাণ্ডে শহীদ ব্যক্তিবর্গের রুহের মাগফিরাত কামনায় বিজিবি’র সকল রিজিয়ন, সেক্টর, প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় বাদ ফজর খতমে কোরআন, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিএনপি’র কর্মসূচি : বিএনপি’র পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধি দল সকাল ৯ টায় সামরিক কবরস্থানে শহীদদের স্মৃতি স্তম্ভে পুষ্পস্থবক অর্পণ করেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন- বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মেজর জেনোরেল (অব.) রুহুল আলম চৌধুরী, মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, লে. কর্নেল (অব.) আবদুল লতিফ, মো. কামারুজ্জামান, মেজর (অব.) মিজানুর রহমান প্রমুখ।
