উগ্রবাদী জঙ্গিরাই অভিজিতের খুনি!

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ০০:১৪

উগ্র মৌলবাদী জঙ্গি গোষ্ঠী লেখক ও ব্লগার প্রকৌশলী অভিজিত্ রায়কে হত্যা করেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। এ হত্যার দায় স্বীকার করে ‘আনসার বাংলা-৭’ নামের একটি সংগঠন টুইটারে স্ট্যাটাস দিয়েছে। স্ট্যাটাসে দেয়া তথ্যে বলা হয়েছে, ‘ভিআইপি টার্গেট ইজ ডাউন। ইয়েস ব্রাদার, উই ক্যান।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশী নিরাপত্তার মধ্যে এ হত্যার ঘটনায় খোদ পুলিশ স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে। রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ, লেখক ও শিক্ষার্থীরা এ ঘটনাকে অবহেলা না করে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার দাবি তুলেছে।
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন ফুটপাতে অভিজিত্ ও তার স্ত্রী বন্যার ওপর হামলা চালানোর সময় টিএসসি’র সামনের রাস্তায় শাহবাগ থানা পুলিশের একটি টহল গাড়ি অবস্থান করছিল। বাংলা একাডেমীর একুশে বই মেলার চত্বরের প্রবেশস্থলেও পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিলেন। ফুটপাত দিয়ে স্বামী-স্ত্রী হেঁটে যাওয়ার সময় পিছন থেকে দুইজন চাপাতিধারী ব্যক্তি তাদের উপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা চলে যাওয়ার সময় একজনের পিছু নেয় একজন পথচারী। ঐ পথচারী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ছবির হাট পর্যন্ত তাকে অনুসরণ করে। এক পর্যায়ে ঐ পথচারী হামলাকারীকে জাপটে ধরে। পরে হামলাকারী তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
ময়না তদন্ত শেষে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে অভিজিতের লাশ রাখা হয়েছে। অভিজিতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য দান করা হবে। মাথার পিছনে তিনটি গুরুতর আঘাত ও অতিরিক্ত রক্তক্ষণেই অভিজিতের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন লাশের ময়না তদন্তকারী চিকিত্সক। তিনি মন্তব্য করেছেন, খুনি অত্যন্ত দক্ষ ও প্রশিক্ষিত।
অভিজিত্ রায়ের ছোট ভাই অরিজিত্ রায়ের স্ত্রী কেয়া বর্মণ জানিয়েছেন, আগামীকাল রবিবার অভিজিত্ রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। কাল সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা তার মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে রাখা হবে। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর মরদেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে গবেষণার জন্য দান করা হবে।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা দুটি চাপাতি ও কাঁধে ঝোলানো একটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। দুটি চাপাতির হাতল কাগজে মোড়ানো ছিল। গতকাল শুক্রবার সকালে লেখক অভিজিত্ রায় হত্যার ঘটনায় জঙ্গিদের দায়ী করে মামলা দায়ের করেছেন তার বাবা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান     বিভাগের সাবেক অধ্যাপক অজয় রায়।  মামলায় অজয় রায় জঙ্গি গোষ্ঠীকে দায়ী করেছেন। অজয় রায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার ছেলেকে হত্যার জন্য উগ্র জঙ্গিবাদীরাই দায়ী’। তিনি বলেন, শুধু অভিজিত্ই নয়, তারা অনেককেই হত্যা করছে, যার পেছনে জামায়াতে ইসলামসহ অনেক জঙ্গিই আছে, সরকারের উচিত এসব অপতত্পরতা বন্ধে পদক্ষেপ নেয়া।
অজয় রায় আরো বলেন, ‘পুলিশ ইচ্ছে করলে ২৪ ঘন্টায় খুনিদের গ্রেফতার করতে পারে। করবে কিনা সেটা তাদের ব্যাপার। আমি আমার ছেলের হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাই।’
গতকাল দুপুরে টিএসসি’র সামনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফুটপাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ডিবির উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের দায়িত্ব ডিবির কাছে না এলেও তদন্তের কাজ শুরু হয়েছে। বিষয়টি ডিবি খতিয়ে দেখছে। এখন পর্যন্ত কেউ আটক হয়নি। প্রতিটি ঘটনা আলাদা। প্রতিটি ঘটনার প্যাটার্ন আলাদা। তদন্তের কার্যক্রম আলাদাভাবে গণ্য। লোকজন অনেক সময় আলাদা হয়। ভিকটিমও আলাদা। তবে ডিবি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে এর পেছনে যারা জড়িত, তাদের খুঁজে বের করতে।
ঘটনার পর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অপরাধ শনাক্তকরণ দল ঘটনাস্থলের আলামত সংগ্রহ করে।
গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুব্রত গোলদার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। এরপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বেলা পৌনে ১টা থেকে সোয়া ১টা পর্যন্ত ময়না তদন্ত করেন। সুরতহাল রিপোর্টে বলা হয়েছে, অভিজিত্ রায়ের মাথায় (ঘাড়ের উপরে) তিনটি গুরুতর জখম, অন্যপাশে আরও দুটি এবং পিঠে একটি জখমের চিহ্ন রয়েছে।
চিকিত্সক সোহেল মাহমুদ জানিয়েছেন, অভিজিত্ রায়ের মাথার পিছন দিকে ডান পাশে তিনটি গভীর আঘাতের চিহ্ন ছিল, যেগুলো করা হয়েছে চাপাতির মতো কোনো ধারাল অস্ত্র দিয়ে। একটি আঘাত থেকে আরেকটি আঘাতের দূরত্ব আধা ইঞ্চি, সবই সমান্তরাল। ঐ আঘাত এতোই মারাত্মক ছিল যে চামড়া ও হাড় কেটে একবারে মগজে পৌঁছেছে। এছাড়া পিঠে ও বাঁ চোখের ভ্রূ’র কাছে জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মূলত মাথার পেছনে তিনটি আঘাতের প্রচণ্ডতা ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই অভিজিতের মৃত্যু হয়েছে বলে এই চিকিত্সকের ধারণা।
তিনি বলেন, এটি খুব দক্ষ হাতের কাজ। কোথায় মারলে মানুষ মারা যায়, সেটা হামলাকারীরা জানে। তারা অত্যন্ত দক্ষ ও হিংস্র ছিল। তিনটি আঘাত করেছে আধা ইঞ্চি ব্যবধানে, একটি আরেকটির ওপর পড়েনি। ‘পরিকল্পনা, দক্ষতা আর হিংস্রতা’ ছাড়া এভাবে মানুষ হত্যা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন সোহেল মাহমুদ।
পুলিশের রমনা জোনের সহকারী কমিশনার শিবলী নোমান বলেন, অভিজিত্ হত্যাকাণ্ডটিকে বলা যায় টার্গেট ওরিয়েন্টেড কিলিং, প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর কাজ এটি। অনেক সময় জনসমাগম এলাকায় টার্গেট ওরিয়েন্টেড কিলিং-এ অংশ নেয়াদের হাতে নাতে ধরা কঠিন হয়ে যায়। পুলিশ এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ, র্যাব ও সিআইডি তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। এই ধরনের ব্যক্তিকে কারা হত্যা করতে পারে, তার হত্যাকাণ্ডে কারা বেশি লাভবান হতে পারে সে বিষয়টি মাথা রেখেই তদন্ত শুরু হয়েছে। 
র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ জানান, নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ঘাতকরা বই মেলা থেকেই তাদের টার্গেট করে আসছিল। বই মেলার বাইরে তারা চলে আসার পর তাকে হিট করা হয়েছে। 
খুনিরা প্রশিক্ষিত না হলে শত শত লোকের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। এছাড়া মূল কিলিংয়ে ২ জন অংশ নিলেও খুনের সঙ্গে পরোক্ষাভাবে আরো অন্তত ১০/১৫ জন ছিল। দুই ঘাতককে রক্ষা করতে আশপাশেই অবস্থান ছিল তাদের। তারা তাদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। খুনের সঙ্গে জঙ্গি গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা থাকার সম্ভাবনাই বেশি। এই হত্যার সঙ্গে মিরপুরে ব্লগার রাজীব খুনের যথেষ্ট মিল রয়েছে।
মুক্ত চিন্তার ব্যক্তিদের হত্যার ধারাবাহিক মিশনেরই একটি অংশ কি না তাও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। কেননা অন্য আরো ৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও প্রায় একই ধরনের।
একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, আনোয়ার-আল-আওলাকীর পরিচালনায় ইয়েমেনভিত্তিক আল-কায়দা জঙ্গি সংগঠনের নেটওয়ার্কের অনুসারী ‘আনসার বাংলা’। দুই বছর আগে বরগুনা থেকে গ্রেফতারকৃত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানির সঙ্গে ‘আনসার বাংলা’ সংগঠনের সদস্যদের যোগাযোগ ছিল। ‘আনসার বাংলা’ সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে অনেকের সঙ্গে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের যোগাযোগ রয়েছে। 

স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে বন্যা : স্বামী অভিজিত্ রায়ের সঙ্গে সন্ত্রাসী হামলার শিকার ডা. রাফিদা আহমেদ বন্যাকে ঢাকা মেডিক্যাল থেকে গতকাল সকালে স্কয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আহমেদুর রশিদ টিটু জানিয়েছেন, বন্যাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে।