ঐতিহ্যের বাকরখানি যাচ্ছে বিদেশে

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ০৩:৫৩

যান্ত্রিক সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার সঙ্গে খাদ্য বিজ্ঞানেরও অনেক উন্নতি সাধিত হয়েছে। খাদ্য তালিকায় চলে এসেছে স্যান্ডউইচ, বার্গার, প্যাটিসসহ নানা রকম ফাস্টফুড। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এ ধরনের তৈরি খাবার নাস্তা হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের মাঝে, যদিও ফাস্টফুডের রয়েছে নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। তবে পুরনো ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে সকালের হালকা খাবার হিসেবে বাকরখানি এখনো চাহিদার শীর্ষে অবস্থান করছে। আড়াই শতাব্দীর ঐতিহ্যের ধারক এ বাকরখানি আর মগ ভর্তি চা না হলে যেন সকালটাই চাঙ্গা হয় না। ইদানিং বরং বাকরখানির চাহিদা আরো বেড়েছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বাকরখানি এখন বিদেশের মাটিতে রফতানি হচ্ছে। পুরান ঢাকা থেকেই বাকরখানি যাচ্ছে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, কুয়েত, মধ্যপ্রাচ্যসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশে। প্রবাসী বাঙালিদের কাছে বাকরখানির বিশেষ চাহিদা রয়েছে বলে জানা গেছে।

আগা বাকের থেকে বাকরখানি
পুরান ঢাকার ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাকরখানি তৈরির পিছনে রয়েছে অমর এক প্রেমকাহিনী। আগা বাকের নামে তুর্কিস্তানের এক ভাগ্যবিড়ম্বিত বালক ক্রীতদাস হয়ে এসেছিলো এদেশে। বাংলার সুবেদার নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ সুদর্শন এ বালককে কিনে নিয়েছিলেন। আগা বাকেরের বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ নবাব তাকে লেখাপড়া ও সামরিক বিদ্যায় সুশিক্ষিত করে তোলেন। যৌবনে আগা বাকের প্রথমে চট্টগ্রামে ফৌজদারের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি বাকলা চন্দ্রদ্বীপের শাসনকর্তা ছিলেন। তার নামানুসারে বাকেরগঞ্জ (পরবর্তীকালের বরিশাল) জেলার নামকরণ হয়। আগা বাকের ভালবেসেছিলেন সুন্দরী নর্তকী খনি বেগমকে। তার প্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন উজির জাহান্দার খাঁর ছেলে কোতয়াল জয়নুল খাঁ। এই নর্তকীকে ঘিরে আগা বাকের ও জয়নুল খাঁর দ্বন্দ্ব ছিল তুঙ্গে। নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ এই দ্বন্দ্বের জের ধরে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে বাকেরকে বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করেছিলেন। শক্তিধর বাকের বাঘকে হত্যা করে খাঁচা থেকে বীরদর্পে বেরিয়ে এসেছিলেন। ততক্ষণে খনি বেগমকে অপহরণ করে দুর্গম চন্দ্রদ্বীপের গহীনে পালিয়ে গিয়েছিলেন জয়নুল খাঁ। আগা বাকের প্রেমিকাকে উদ্ধারে রণসাজে চন্দ্রদ্বীপে উপস্থিত হলে জয়নুল খাঁ খনি বেগমকে হত্যা করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
পুরান ঢাকার প্রখ্যাত লেখক নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তীর ঢাকা’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, খনি বেগমকে না পেলেও প্রেমের স্মৃতি চিরজাগরুক রাখতে আগা বাকের নতুন ধরনের শুকনো রুটি তৈরি করিয়ে তার নাম দিয়েছিলেন বাকেরখনি। সাধারণ মানুষের উচ্চারণে যা ক্রমে বাকরখানি হয়ে গেছে।
নবাবদের বাকরখানি তৈরি হতো মালাই-মাখন দিয়ে
কারিগরদের সাথে আলাপ করে জানা য়ায়, অতীতে ময়দার সাথে দুধের মালাই ও মাখন মিশিয়ে খামির তৈরি করে বাকরখানি বানানো হতো। এটা ছিলো নবাব আর আমীর-ওমরাদের প্রিয় খাবার। মালাই-মাখনের বাকরখানি এখন আর তৈরি হয় না। তবে ঢাকার অনেক পুরনো খানদানি পরিবার বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য আগাম অর্ডার দিলে মালাই-মাখনের বাকরখানি এখনো সরবরাহ করা হয়ে থাকে। আগে ঢাকার বনেদি পরিবার নিজেদের বাড়িতেই বাকরখানি তৈরির আয়োজন করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে দুধের মালাইয়ের পরিবর্তে বাকরখানিতে ডালডা ও তেল ব্যবহারের প্রচলন হয়। সাধারণ রুটি-পরটার সাথে বাকরখানি তৈরি ও এর স্বাদের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।
বাকরখানির রকমফের
পুরান ঢাকার বাসিন্দা হাজী শরিয়ত উল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, তার দোকানে ৮ রকমের বাকরখানি তৈরি হয়। এর মধ্যে রয়েছে ছানা, পনির, চিনি, নোনতা, কাবাব, কিমা ও নারিকেলের সংমিশ্রণে তৈরি বাকরখানি। এছাড়া গরু ও খাসির মাংসের ঝুরা দিয়েও এক ধরনের বাকরখানি তৈরি করা যায়। যা অত্যন্ত সুস্বাদু। মাংসের ঝুরার বাকরখানি সাধারণত ঈদের সময় স্পেশাল অর্ডার দিয়ে তৈরি করা হয়। আবার ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে নোনতা বাকরখানি।
যেভাবে তৈরি হয় বাকরখানি
ময়দার সাথে সামান্য খাবার সোডা, ডালডা, একটি তন্দুর এবং এর মাঝে উত্তাপ ছড়ানো জ্বলন্ত কয়লা। প্রথমে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় ময়দা, সামান্য পানি এবং ডালডার সমন্বয়ে খামির তৈরি করা হয়। এবার তৈরিকৃত খামির থেকে কেটে ছোট ছোট গোলাকার কোয়া তৈরি করা হয়। এবার বেলুনি দিয়ে কাঠের পিঁড়িতে কোয়াটি দিয়ে গোলাকার কাঁচা রুটি তৈরি করা হয়। কাঁচা রুটির মাঝখানে ছুড়ি দিয়ে লম্বা করে তিনটি দাগ কেটে দেয়া হয়। এবার এর এক পাশে পানির সামান্য প্রলেপ দিয়ে তন্দুরের দেয়ালে আটকিয়ে দেয়া হয়। ৫ থেকে ৭ মিনিটে তৈরি হয়ে যায় বাকরখানি। আবার ঘি দিয়েও বিশেষ যত্নের সাথে এই বাকরখানি তৈরি করা হয়ে থাকে। তবে ক্রেতাকে ঘি আলাদাভাবে কিনে দিতে হয়। পনির দিয়েও এই রুটি বিশেষ কায়দায় তৈরি করা হয়ে থাকে। ঠিক একইভাবে ক্রেতাকে পনির আলাদা কিনে দিতে হয়।
যেখানে মেলে বাকরখানি
পুরনো ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের দুই পাশে রয়েছে বাকরখানির অনেক দোকান। এসব দোকানের বাকরখানি স্বচ্ছ পলিথিনের প্যাকেটে ভরে ধানমন্ডি, উত্তরা, বনানী, গুলশানসহ রাজধানীর এলাকার সাধারণ দোকানে ও ডিপার্টমেন্ট স্টোরে সরবরাহ করা হয়।
ব্যবসায়ীরা জানান, লালবাগ কেল্লার কাছেই প্রথম বাকরখানির দোকান গড়ে ওঠেছিল। এরপর সেখান থেকে ধীরে ধীরে পুরান ঢাকার চানখাঁরপুল, আগা নবাব দেউড়ি, কোতোয়ালি, বংশাল, চকবাজার, হাজারীবাগ, শ্যামপুর, গেন্ডারিয়া ও সূত্রাপুর এলাকায় বিস্তার লাভ করে। অবশ্য বর্তমানে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরাও বাকরখানি ব্যবসার জন্য বিখ্যাত।
এছাড়া আমলীগোলা, ইসলামাবাদ, লালবাগ, আবুল হাসনাত রোড, আগা সাদেক রোড, নাজিরাবাজার, সিদ্দিকবাজার, ওয়ারী, বনগ্রাম, মৈশুন্ডি, লক্ষ্মীবাজার, একরামপুর, নারিন্দা, দয়াগঞ্জ—এক কথায় পুরনো ঢাকার সর্বত্র অলিগলিতে বাকরখানির দোকান নজরে পড়ে। পুরান ঢাকার ধনী-দরিদ্র সব পরিবারে অতিথি এলে চায়ের সাথে বাকরখানি দিয়ে আপ্যায়নের রেওয়াজ এখনো প্রচলিত।
যাচ্ছে বিদেশে
বাকরখানি ব্যবসায়ী বজলুর রশীদ ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমানে পুরান ঢাকার বাংশাল থেকেই ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, কুয়েত, মধ্যপ্রাচ্যসহ  বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়ে থাকে বাকরখানি।
অর্ধলক্ষাধিক শ্রমিক নিয়েজিত
বাকরখানি ব্যবসায়ীরা জানান, রাজধানী ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে অর্ধলক্ষাধিক শ্রমিক বাকরখানি তৈরির কাজে নিয়োজিত। এই শ্রমিকদের সিংহভাগই আবার সিলেট অঞ্চলের অধিবাসী। হবিগঞ্জের বাসিন্দা আবদুল আলিম বাকরখানি তৈরির কারিগর হিসেবে কাজ করেন চকবাজারের শাহী বাকরখানি কারখানায়। তিনি জানান, প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই মণ বাকরখানি বিক্রি করেন তারা।
যা দিয়ে খাবেন
রুটি বা পরটার সাথে বাকরখানির স্বাদের একটি বড় তফাত্ হলো এই, ঠাণ্ডা হলেই রুটি বা পরটার স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু বাকরখানি ঠাণ্ডা হলেও স্বাদ থাকে একই রকম। এক সপ্তাহ/ দশ দিন সহজেই ঘরে সংরক্ষণ করে বাকরখানি খাওয়া যায়।
বাকরখানি চায়ের সাথে খাওয়ার প্রচলন বেশি। এছাড়াও গরু, খাসির অথবা মুরগির মাংসের সাথেও বাকরখানির স্বাদও অতুলনীয়। ক্ষীর ও পায়েসের সাথেও পরিবেশন করা হয় বাকরখানি।
মূল্য

বাকরখানি কেজি দরে বিক্রি করা হয়। প্রতি কেজির মূল্য ১০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা। ৩৫ থেকে ৪০টি বাকরখানি ধরে প্রতি কেজিতে।