সুন্দরবনে তেলের প্রভাব নিয়ে জাতিসংঘ ও সরকারের যৌথ রিপোর্ট প্রকাশ

দাতাদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করা হবে: পরিবেশ ও বন মন্ত্রী

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৫, ২২:১১
 
 
 
 
 
 
সুন্দরবনে নৌ-দুর্ঘটনায় ছড়িয়েপড়া তেলের কারণে আপাতত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি দৃশ্যমান হয়নি। তবে ছড়িয়েপড়া তেল দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা নির্ধারণ করতে আরো ব্যাপকভাবে কাজ করতে হবে। তেল নিঃসরণের ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণে কাজ করা জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ প্রতিনিধিদল রবিবার এ সুপারিশ করেছে। এ ক্ষেত্রে তারা সরকারকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়ন করার জন্য বেশকিছু সুপারিশও উল্লেখ করেন। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তেল নিঃসরণের প্রভাব বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ‘প্রতিনিধিদলের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য সরকার জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দাতাদেশ ও প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করে কাজ করবে।’
জাতিসংঘ এবং সরকারের যৌথ রিপোর্টে বলা হয়— তেলের ট্যাংকার যখন দুর্ঘটনাকবলিত হয়, তখন নদীতে স্রোত কম থাকায় ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। স্রোতের বেগ বেশি থাকলে দ্রুত তেল ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকত। প্রতিনিধিদলের মতে—সুন্দরবনের যে এলাকায় তেল ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানে ব্যাপকভাবে কাজ করা হয়েছে। বিশেষ করে সুন্দরবনের গাছ, জলজ প্রাণী, পাখি এবং আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাপকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়—তেল ছড়িয়েপড়া অঞ্চলে এখন নতুন করে গাছের চারা গজাতে দেখা গেছে। কোনো কোনো গণমাধ্যমে ডলফিন মারা গেছে সংবাদ প্রকাশিত হলেও এ ধরনের কোনো কিছুর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে তেলের ট্যাংকার দুর্ঘটনায় ওই এলাকার জীবনযাত্রায় কিছু প্রভাব ফেলেছে। জেলেরা বলেছে— তাদের জালে আগের তুলনায় কম মাছ ধরা পড়েছে। কোনো কোনো এলাকার মানুষ তাদের স্বাস্থ্য সমস্যার কথা বললেও এ সংক্রান্ত কোনো রোগীকে হাসপাতালে যেতে হয়নি। তবে দুর্ঘটনাকবলিত এলাকায় পাখির বিচরণ কিছুটা কমেছে।
রিপোর্টে বলা হয়—সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে রাতের বেলা তেলের ট্যাংকার পরিবহন নিষিদ্ধ করা উচিত। কারণ, কেউ এ সময়ে ট্যাংকারের গতিসীমা মেনে চালান না।
এ ছাড়া, রিপোর্টে বেশ কিছু সুপারিশ উল্লেখ করে বলা হয়—এ সব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হলে অচিরেই সুন্দরবন আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে।
জাতিসংঘ এবং সরকারের যৌথ রিপোর্টে তেল দূর্ঘটনায় স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনা নিতেবলা হয়। স্বল্পমেয়াদি যেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলা হয় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—তেল নিঃসরণের কারণে স্থানীয় লোকজনের স্বাস্থ্য সমস্যা হচ্ছে কিনা, তা নিয়মিতভাবে দেখতে হবে। তেল নিঃসরণের আগে সুন্দরবন নিয়ে যে স্ট্যাডি হয়েছে, তার সাথে তেল নিঃসরণ-পরবর্তী অবস্থা মিলিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।
মধ্যমেয়াদি ব্যবস্থার মধ্যে প্রতিনিধিদল বলেছে—আগামী ছয় মাস পর সুন্দরবনের দুর্ঘটনাকবলিত এলাকার অবস্থা কী হয়, তা আবার পরীক্ষা করা যেতে পারে। বিশেষ করে বর্ষাকালের পর বৃষ্টির পানিতে গাছ ও মাটি থেকে তেল ধুয়ে যেতে পারে। এরপর সুন্দরবনের গাছ ও মাটিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ ছাড়া, দীর্ঘমেয়াদে এক বছর পর দুর্ঘটনাকবলিত এলাকার বিভিন্ন কম্পোন্যান্ট পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে তার রিপোর্ট নিয়ে ঢাকায় জাতীয় সেমিনারের আয়োজন করা যেতে পারে। তা থেকে যে সুপারিশমালা আসবে, সে অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ‘সুন্দরবনে তেল ট্যাংকারের দুর্ঘটনা আমাদের জন্য নতুন হলেও খুব সফলতার সাথে তা সামাল দেয়া গেছে। এ জন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘের নেতৃত্বে কাজ করা আন্তর্জাতিক মহল ধন্যবাদ পাবার যোগ্য।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে কোনো নেতিবাচক ঘটনা ঘটলে বিশ্ব মিডিয়া একটি মওকা পেয়ে যায়। নানা সফলতা থাকলেও কোনো দুর্যোগের খবর তারা বড় করে প্রকাশ করে। কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম হয়েছে। জাতিসংঘও তাদের রিপোর্টে দুর্ঘটনা মোকাবিলায় সরকারের নেয়া সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছে।’
পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, ‘যে সময় দুর্ঘটনা ঘটে, তখন স্রোতের জোর কম ছিল। এ জন্য ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। এটি আল্লাহর অশেষ রহমত।’ তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনের তেল ট্যাংকার দুর্ঘটনার পরে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল আমাদের যে সহায়তা করেছে, তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী রবার্ট ওয়াটকিনস বলেন, ‘সুন্দরবনে তেল ট্যাংকার দুর্ঘটনায় বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্য কতটা সুদৃঢ়, তা প্রমাণ হয়েছে। এ ধরনের দুর্ঘটনায় সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে। সুন্দরবন বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। এর ওপর অনেকের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে।’ তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনায় প্রমাণ হয়েছে, জনগণ ইতিবাচকভাবে এগিয়ে আসে। আর বিষয়টির ইতিবাচক সমাধানে সরকারও দ্রুত কাজ করে।’
রবার্ট বলেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং টেকসই পরিবেশ হাতে হাত রেখে চলে। পরিবেশ ঠিক না রেখে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন চলতে পারে না।’
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. কামালউদ্দিন।