বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট বলেছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী মতামতের প্রতি সুরক্ষা প্রদান এবং রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেই কেবল গণতন্ত্র পরিপূর্ণ বিকশিত হতে পারে। গতকাল রবিবার দুপুরে সেগুনবাগিচায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের মানুষ যে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিল, সেই স্বাধীনতা গণতন্ত্র অর্জনের প্রধান স্তম্ভ। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর সাহস গণতন্ত্র প্রক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য।
গতকাল মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকায় কর্মরত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড ও তার সহকর্মীদের সই করা টেলিগ্রাম জাদুঘরে হস্তান্তর করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। টেলিগ্রাম গ্রহণ করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ডা. সারোয়ার আলী, স্থপতি রবিউল হুসাইন, জিয়াউদ্দীন তারিক আলী ও আক্কু চৌধুরী। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৪ বছর পর আলোচিত এ ব্লাড টেলিগ্রাম বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের কাছে হস্তান্তর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। রাজধানীর সেগুনবাগিচার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন এই ঐতিহাসিক দলিল।
আর্চার কে ব্লাড ও তার সহকর্মীদের সই করা ওই টেলিগ্রামকে ‘বিশেষ উপহার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, আর্চার কে ব্লাড এবং তার সতীর্থরা এদেশের স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের জন্য সাহস দেখিয়েছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্র সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সই করা ১৯৭১-এর বিখ্যাত এই টেলিগ্রামে বাংলাদেশ প্রশ্নে মার্কিন নীতির বিপক্ষে নিজেদের ভিন্নমত তুলে ধরেছিলেন।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এসে প্রথমে তানভীর মোকাম্মেল নির্মিত ‘বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস ঃ ৪৭ থেকে ৭১’ শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্র দেখেন। এরপরে তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ঘুরে দেখেন।
উল্লেখ্য, আর্চার কেন্ট ব্লাড (১৯২৩-২০০৪), ১৯৭১ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কনসাল জেনারেল নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে চলমান নৃশংসতা বন্ধে ব্যর্থ হওয়ায় কঠোর ভাষায় একটি টেলিগ্রাম বার্তা পাঠানোর জন্য বিখ্যাত। তার সেই বিখ্যাত টেলিগ্রাম বার্তা ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ঢাকা শহরে গণহত্যা শুরু করে। ৬ এপ্রিল ১৯৭১ মার্কিন দূতাবাস থেকে একটি তারবার্তা পাঠানো হয়েছিল ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে। ঢাকায় কর্মরত মার্কিন কর্মকর্তারা ২৫ মার্চের ‘কলঙ্কিত রাতের’ গণহত্যা এবং সে বিষয়ে নিক্সন-কিসিঞ্জারের অন্ধ ইয়াহিয়া ঘেঁষা নীতির প্রতিবাদ জানাতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছিলেন। তারা খুব ভেবেচিন্তে একটি তারবার্তা লিখেছিলেন যাতে স্বাক্ষর করেছিলেন ব্লাড ও তার ২০ জন সহকর্মী। তারা তাতে ঢাকায় ইয়াহিয়ার গণহত্যার প্রতি ওয়াশিংটনের অব্যাহত নীরবতার নিন্দা করেছিলেন। ব্লাড তাতে কেবল স্বাক্ষরই দেননি, বাড়তি ব্যক্তিগত নোটও লিখেছিলেন।
নোটে তিনি লিখেছিলেন, “আমি বিশ্বাস করি, পূর্ব পাকিস্তানে এখন যে সংগ্রাম চলছে, তার সম্ভাব্য যৌক্তিক পরিণতি হলো বাঙালিদের বিজয় এবং এর পরিণতিতে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা।’’
টেলিগ্রামে বলা হয়েছিল, আমাদের সরকার গণতন্ত্রের দমনকে অভিযুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের সরকার নিদারুণ নিষ্ঠুরতাকে অভিযুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের সরকার তার নাগরিকদের রক্ষা করার জন্য শক্তিশালী ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে যেখানে একই সময়ে পশ্চাত্মুখী নতজানুতা প্রভাবশালী পশ্চিম পাকিস্তানী সরকারকে শান্ত করতে এবং তাদের বিরুদ্ধে যে কোনো নেতিবাচক আন্তর্জাতিক জনসংযোগের চাপ হ্রাস করতে সচেষ্ট থেকেছে। আমাদের সরকার এমন প্রমাণিত হয়েছে যাকে অনেকেই মানসিক দেউলিয়া বিবেচনা করবে, কিন্তু আমরা বেছে নিয়েছি মধ্যস্থতা না করা, এমনকি মানসিকভাবে, এটিকে আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব মনে করে, যাতে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বহুল শ্রমসাধ্য পরিভাষা ‘গণহত্যা’ প্রযোজ্য হয়, এটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের পরিষ্কার অভ্যন্তরীণ বিষয়। সাধারণ আমেরিকানরা চরম-বিরক্তি প্রকাশ করেছে। আমরা পেশাদার বেসামরিক চাকুরে হিসেবে, বর্তমান কূটনীতির সাথে আমাদের ভিন্নমত প্রকাশ করি এবং মনে প্রাণে চাই যে আমাদের সত্যিকার এবং স্থায়ী স্বার্থ এখানে চিহ্নিত হবে এবং আমাদের কূটনীতি পুনঃনির্ধারিত হবে।’