বিজয় আনন্দে উদ্বেল দেশ

আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৫, ০০:০৩

বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ইংল্যান্ডকে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের হারানোর দ্বিতীয় দিনেও আনন্দে উদ্বেল সারা দেশ। বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে উঠায় ক্রিকেটারদের অভিনন্দন জানিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিজয় মিছিল করেছে দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন দল ও সংগঠন। মিছিলে অংশ নিয়েছেন সকল পেশা-শ্রেণির নাগরিক। রাজধানীসহ দেশের সকল জেলা-উপজেলায় বিজয়ের উল্লাস চলছেই। ক্রিকেটভক্তদের উন্মাদনায় গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উত্সবমুখর ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকা। বিজয় মিছিলে জেগে উঠে রাজধানীর রাজপথ থেকে পাড়া-মহল্লার গলিও। ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন ও দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ। এছাড়াও মিছিল বের করে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।

গতকাল সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে টিএসসিতে সন্ত্রাস-বিরোধী রাজু ভাস্কর্যের সামনে মিলিত হন বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা। তাদের আনন্দ সমাবেশে যোগ দেয় ছাত্রলীগও। এতে টিএসসি প্রাঙ্গণ পরিণত হয় জনসমুদ্রে। ঢোল বাজিয়ে নেচে-গেয়ে তারা উদযাপন করেন বাংলাদেশের বিজয়। জাতীয় পতাকা মাথায় বেঁধে, ক্রিকেট দলের লাল-সবুজ জার্সি পরে বিজয় উত্সবে শরিক হন অনেকে। আবার বিভিন্ন স্থানে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বিজয় মিছিল বের করেন তরুণ-তরুণীরা। জাতীয় পতাকা সংবলিত প্লাকার্ড, ব্যানার, সাবাশ বাংলাদেশ সংবলিত ব্যান্ড মাথায় বেঁধে ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ শ্লোগানে মুখরিত করেন রাজপথ। একইসাথে রঙ ছিটিয়েও তারা বিজয় উদযাপন করেন। বিজয়ের আবির ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছাড়িয়ে পুরান ঢাকা, গুলিস্তান, মতিঝিল, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, গুলশান, বনানী, উত্তরাসহ নগরের বিভিন্ন প্রান্তে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাড়াও বিজয় মিছিলে অংশ নেয় শ্রমজীবী, পেশাজীবী মানুষও।
আওয়ামী লীগের বিজয় মিছিল
ক্রিকেট দলের বিজয়ের পরই মঙ্গলবার দেশব্যাপী আনন্দ মিছিলের আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে গতকাল দেশের বিভিন্ন স্থানে বিজয় মিছিল করে সর্বস্তরের জনগণ। গতকাল দুপুরে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে থেকে বিজয় মিছিল বের করে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ। এতে নেতৃত্ব দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। বিজয় মিছিল বঙ্গবন্ধু এভিনিউ থেকে শুরু হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে পূর্বের স্থানে গিয়ে শেষ হয়। এতে আওয়ামী ওলামা লীগ, মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
মিছিলের আগে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বিজয়ে হরতাল শিথিল করার মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার লজ্জা ভাঙছে। বাংলার দামাল ছেলেদের এই বিজয়ে খালেদা জিয়ার লজ্জা একটু হলেও ভেঙেছে। খালেদা জিয়া ১২ ঘণ্টা হরতাল শিথিল করেছেন; কিন্তু অবরোধ তোলেননি। দেশের মানুষ যেন খোলা মনে আনন্দ-উল্লাস না করতে পারে সেই জন্য তিনি অবরোধ প্রত্যাহার করেননি। ইতিমধ্যেই জনগণ তাকে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত করেছে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে দেশে ক্রিকেটে বিজয় হয়, ফুটবলে বিজয় হয়। এমনকি পাহাড়-সমুদ্রও বিজয় হয়। আর খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকলে ধ্বংস হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়ও আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বিজয় মিছিল বের হয়। জাতীয় শ্রমিক লীগ সভাপতি শুক্কুর মাহমুদের নেতৃত্বে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে একটি আনন্দ মিছিল বের করা হয়।
এদিকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মধুর ক্যান্টিনের সামনে থেকে আনন্দ মিছিল বের করে ছাত্রলীগ। সংগঠনের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগের নেতৃত্বে মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলে ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেহেদী হাসান ও সাধারণ সম্পাদক ওমর শরীফও অংশগ্রহণ করেন।
দুপুর ১২টার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আনন্দ মিছিল করে বিএনপি। কদম ফোয়ারা ঘুরে বিএমএ ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয় মিছিল। এতে বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক আসাদুল করিম, সহ-স্বেচ্ছাসেবক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফ হোসেন, শওকত মাহমুদ, রুহুল আমিন গাজী অংশগ্রহণ করেন। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়ও বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের উদ্যোগে বিজয় মিছিল বের হয়। এছাড়া ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়ে ছাত্রদল রাজধানীর কাঁটাবন এলাকায় মিছিল করে।
ব্যানার লাগাতে গিয়ে বিএনপির নেতা আটক
অন্যদিকে ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়ে ব্যানার টানানোর সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক রায়হান আমিন রনিকে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশানের কার্যালয়ের সামনে ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়ে ব্যানার লাগাতে গেলে তাকে আটক করা হয়।
বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের কাছে ইংল্যান্ড দল ধরাশায়ী হওয়ার পর গতকাল সারাদেশ ছিল উত্সবে মুখর। বিজয় উত্সব করেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। দেশের সর্বত্র আনন্দ মিছিল, সমাবেশ হয়েছে। এসব মিছিলে যে যেভাবে পারেন সেজে যোগ দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, ২০১১ সালের বিশ্বকাপে চট্টগ্রামের মাটিতে ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল টাইগাররা। চার বছর পর অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। সেই আনন্দে গতকাল মঙ্গলবার সারা নগরীতে বের হয় অসংখ্য আনন্দ মিছিল। মিছিলের জন্য নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগেভাগেই ছুটি দেয়া হয়। মিছিলে অংশ নেন নানা বয়সের অসংখ্য মানুষ। কারো হাতে ছিল ব্যাট-বল। আবার কারো হাতে টাইগারদের জন্য শুভ কামনা জানিয়ে লেখা বর্ণাঢ্য প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন। অনেকের মুখমণ্ডলে হলুদ-কালো রঙ্গে আঁকা ছিল রয়েল বেঙ্গল টাইগারের হিংস্র মুখাবয়ব। মিছিল অতিক্রম করার সময় ঢাক-ঢোল আর বাঁশির শব্দে একেকটি এলাকার পরিবেশই পাল্টে যাচ্ছিল।
নগরীতে সবচেয়ে বড় মিছিলটি বের হয় আন্দরকিল্লার নগর ভবনের সামনে থেকে। মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন সিটি মেয়র এম মনজুর আলম ও ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। তবে মূল আকর্ষণ ছিল বিভিন্ন স্কুলের খুদে শিক্ষার্থীরা। এছাড়া আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারেও আনন্দ মিছিল হয়। তবে বিএনপির মিছিলগুলো ছিল অনেকটা ‘ঝটিকা’ ধরনের। ১৫/২০ জন মিলে মিছিল করে আবার দ্রুত গা-ঢাকা দেন বিএনপির কর্মীরা। 
রাজশাহী অফিস জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে গতকাল রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারের নেতৃত্বে বেলা ১১টায় ছাত্রলীগ বিশাল জাতীয় পতাকা নিয়ে নগরীতে বিজয় মিছিল করে। মিছিলটি নগরীর প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে রাজশাহী কলেজে গিয়ে আনন্দ সমাবেশে মিলিত হয়। এতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ছাড়াও সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেয়।
এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর মুহম্মদ মিজান উদ্দিন ও উপ-উপাচার্য প্রফেসর চৌধুরী সারওয়ার জাহানের নেতৃত্বে মঙ্গলবার দুপুরে সিনেট ভবনের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অংশ নেন। র্যালি শুরুর আগে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে রাবি উপাচার্য বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়দের অভিনন্দন জানান। অন্যদিকে টাইগারদের বিজয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাবি শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কিছুক্ষণ পর ক্যাম্পাসে আনন্দ শোভাযাত্রা বের করে।
রংপুর প্রতিনিধি জানান, গতকাল দুপুরে মহানগরীর বেতপট্টিস্থ জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় থেকে বিজয় মিছিল বের করা হয়। জাতীয় পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুন সহকারে বের হওয়া বিজয় মিছিলটি নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি শাফিয়ার রহমান শফি, সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মন্ডল, আওয়ামী লীগ নেতা ইদ্রিস আলী, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান সিদ্দিকী রনি প্রমুখ।
সিলেট অফিস জানায়, সিলেটে বিজয় মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ। নগরীর কোর্ট পয়েন্ট থেকে মিছিলটি বের হয়ে শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ, জেলার সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা আশফাক আহমদ প্রমুখ।
বরিশাল অফিস জানায়, বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের উল্লাসে গোটা নগরী সোমবার রাত থেকে গতকাল মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত ছিল ক্রিকেটপ্রেমীদের দখলে। সকালে নগরীসহ জেলার প্রতিটি উপজেলায় আনন্দ মিছিল বের করে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সব বয়সের মানুষই যোগ দিয়েছিলেন আনন্দ মিছিলে।

জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে রাজপথে আনন্দ মিছিল বের করেন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেন পথচারীরাও। পর্যায়ক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়, বিএম কলেজসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও আনন্দ মিছিল বের করেন।