গায়ক তিনি। নায়কও বটে। স্কুল শিক্ষক, আবার সংসারী মানুষ। সমাজকে আলোকিত করতে কাজ করছেন। সমাজকে দেখতে শেখান। অথচ তিনি চোখে দেখেন না। বলছিলাম মুকুলের কথা। পুরো নাম মোখলেসুর রহমান মুকুল। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মুকুল।
অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে শত প্রতিকূলতা আর সামাজিক বঞ্চনা ডিঙিয়ে অজেয়কে জয় করা যায়, তারই অনন্য দৃষ্টান্ত চট্টগ্রামের দৃষ্টিশক্তিহীন এই সঙ্গীতশিল্পী। যিনি কণ্ঠের পাশাপাশি মানুষকে মোহমুগ্ধ করে রাখতে পারেন সঙ্গীতের নানা যন্ত্র বাজিয়ে। অর্জন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি।
চোখের দৃষ্টি নেই তাতে কি? অন্তর্দৃষ্টি, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর সুরেলা কণ্ঠ দিয়েও যে অন্ধত্ব জয় করা যায় তার অনন্য উদাহরণ মুকুল। নিজের লেখা চল্লিশটিসহ শতাধিক গানে সুর দিয়েছেন জন্মান্ধ এই শিল্পী। তার স্বীকৃতিও মিলেছে বেশ। মুকুল এখন শিক্ষকতা করেন নগরীর একমাত্র সরকারি প্রতিবন্ধী স্কুলে। নিজেই গড়ে তুলেছেন একটি সঙ্গীত একাডেমি।
কথা হয় মুকুলের সঙ্গে। জানা যায়, মাত্র ছয় মাস বয়সে কোল থেকে পড়ে চোখে মারাত্মক আঘাত পান তিনি। সেই আঘাতে চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারান। তবে চোখের আলো হারালেও মনের জোর হারাননি। প্রচণ্ড মানসিক দৃঢ়তা এবং লক্ষ্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা নিয়ে তিনি অর্জন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মুকুল ইতিহাস বিভাগ থেকে বিএ ও এমএ পাস করেন।
শিক্ষার পাশাপাশি সঙ্গীতকেও তিনি বেছে নিয়েছেন নিজের ধ্যান ও জ্ঞান হিসেবে। আজীবন সুরের সাধক মুকুল ইতিমধ্যেই পরিচিতি লাভ করেছেন গুণী শিল্পী, সুরকার ও গীতিকার হিসেবে। কয়েক বছর আগে ‘মাটির সুরে’ নামে গানের একটি অ্যালবাম বের হয়েছে তার। নগরীর ঝাউতলা এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন মুকুল সঙ্গীত একাডেমি নামে একটি গানের স্কুল।
কর্মজীবনে তিনি নগরীর মুরাদপুর এলাকায় চট্টগ্রাম সরকারি দৃষ্টি, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষক। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত পল্লীগীতি শিল্পী। শুধু কণ্ঠের কারুকার্যেই নয়, চট্টগ্রামে মুকুলের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে যন্ত্রশিল্পী হিসেবেও। দোতারা, বাঁশি, বেহালা, তানপুরাসহ বিভিন্ন সুরযন্ত্র এবং তবলা বাদনেও তিনি সমানভাবে দক্ষ।
মুকুল জানান, গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী থানার চর কাউনিয়া গ্রামে। এ গ্রামের ধার ঘেঁষে বয়ে গেছে মেঘনা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর শাখা নদী। ছোটবেলায় নদীর পাড়ে বসে মাঝিমাল্লা আর জেলেদের উদাত্ত কণ্ঠের গান আর পাখ-পাখালীর কুহুতান তন্ময় হয়ে শুনতে শুনতেই গানের প্রতি ভালোবাসা জন্মে তার।
বাড়িতেও গানের পরিবেশ ছিল। দাদা আবদুল ওহাব মুন্সী এবং নানা আবদুল খালেক উভয়েই ছিলেন মরমী গানের শিল্পী। তাদের দরাজ কণ্ঠের গান অন্ধ শিশু মুকুলকে দিতো অপার্থিব আলোর সন্ধান। সেই আলোকবর্তিকা দিয়েই মুকুল অনুভব করতেন পৃথিবীর রূপ-রস, গন্ধ, বর্ণ।
শৈশবের এই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি মুকুলের। মামা মহরম আলীর হাত ধরে একদিন ট্রেনে চড়ে কিশোরগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামে আসেন মুকুল। মামা তাকে ভর্তি করিয়ে দেন মুরাদপুরের প্রতিবন্ধী স্কুলে। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত চট্টগ্রামেই ছিলেন। এরপর চলে যান কুমিল্লায়। সেখানে ভিক্টোরিয়া কলেজ স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন।
মুকুলের বাবা রেলওয়ে স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। এসএসসি পরীক্ষায় পাস করার পর বাবার চাকরি সূত্রে ফের চট্টগ্রামে আসতে হয়। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর মুকুল ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। সেখান থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষক ও সতীর্থদের অবাক করে দেন তিনি।
মুকুলের বাবা ও মায়ের নাম মুজিবর রহমান ও মেহেরুন নেসা। ৬ ভাই-বোনের সকলেই প্রতিষ্ঠিত। মুকুল ভালোবেসে বিয়ে করেছেন নাসিমা আক্তারকে। তাদের ঘরে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। মুকুল বন্দরনগরীর এক প্রিয়মুখ। সবাই তাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। কারো করুণার পাত্র হিসেবে নয়, নিজের যোগ্যতা দিয়েই মানুষের হূদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছেন মুকুল।
সুরের ঝঙ্কার দিয়ে অসংখ্য মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন জীবন যুদ্ধের সাহসী সৈনিক মুকুল। মুকুল বলেন, পরম করুণাময় আমাকে দৃষ্টিশক্তি দেননি। এতে আমার আক্ষেপ নেই। কারণ তিনি আমার কণ্ঠে সুর দিয়েছেন। গানের আলো দিয়েই আমি চোখের অন্ধকারকে দূর করতে শিখেছি।
নিজের চোখে আলো নেই। তারপরও সুরের আলোয় অন্যদের আলোকিত করে যেতে চান এই সঙ্গীত শিল্পী।
