আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আত্মসমর্পণ করুন

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০১৫, ০০:১৫

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, গ্রেফতারী পরোয়ানা মোতাবেক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ভদ্রলোকের মতো আদালতে আত্মসমর্পণ করা উচিত। আর এটাই ভদ্রতা। অন্যথায় জনগণ তাকে ক্ষমা করবে না এবং উনি দেশের মানুষের সামনে যেতে পারবেন না। ওয়ারেন্ট ইস্যু হওয়ায় আইন-আদালত মেনে খালেদা জিয়া আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তাঁর কার্যালয়ে হরতাল, অবরোধ ও অগ্নিদগ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে আর্থিক সহায়তা প্রদানকালে এ কথা বলেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের চলমান হরতাল, অবরোধ ও অগ্নি হামলায় নিহত ৪ জনের পরিবার ও আহত ৩৩ ব্যক্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত ১৯৯টি বাস-ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনের মালিকসহ মোট ক্ষতিগ্রস্ত ২৩৬ জনের হাতে ৫ কোটি ৪২ লাখ ৮ হাজার টাকার চেক তুলে দেন। এ নিয়ে তৃতীয়দিনের মতো হরতাল-অবরোধে নাশকতায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে অর্থ বিতরণ করলেন প্রধানমন্ত্রী।
ধ্বংসাত্মক রাজনীতি বন্ধ করার জন্য খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বাংলাদেশকে ধ্বংসের পথে নিতে চান। মানুষ যখন আর্থিকভাবে সচ্ছল, শান্তিতে বসবাস করছে, যখন তারা সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে, তখনই তাণ্ডব চালাচ্ছে বিএনপি-জামায়াত। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া আইন-আদালত কিছুই মানেন না। উনার দুর্নীতির মামলায় ৬৭ বার হাজিরার তারিখ ছিলো। কিন্তু উনি মাত্র ৭ দিন আদালতে গেছেন। অধিকাংশ দিন আদালতে হাজির না হয়ে উনি মূলত আদালত অবমাননা করেছেন। এছাড়া বিএনপি নেত্রী তার ক্যাডারদের নিয়ে আদালতে গিয়ে আদালতের কাছে আইনজীবীদের লাঞ্ছিত করে ও গাড়ি পুড়িয়ে আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্নের চেষ্টা করেছেন। মানুষ পুড়িয়ে হত্যার জন্য বিএনপি-জামায়াত চক্রের তীব্র সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত চক্র আড়াই মাস ধরে হরতাল ও অবরোধ দিয়ে এবং অগ্নি হামলার মাধ্যমে জনগণের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই চক্রের নৃশংস হামলায় অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। অনেকে পঙ্গু এবং নিঃস্ব হয়েছে। জনগণের জন্য নয়, নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই তারা রাজনীতি করে।
খালেদা জিয়ার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ (বৃহস্পতিবার) পত্রিকায় দেখলাম একটি ছোট্ট শিশু ৩৫ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে মারা গেছে। এই শিশুর মৃত্যুর জন্য তিনি কী জবাব দেবেন? এই শিশুটির কি অপরাধ ছিলো? সাধারণ দরিদ্র মানুষের ওপর তাদের কেন এই জুলুম? তাদের মানবিক অনুভূতি বা মনুষ্যত্ব বলে কিছু নেই। দেশের যে ক্ষতি বিএনপি-জামায়াত জোট করেছে তাতে জনগণের অভিশাপেই এই দলগুলো একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তবে আইনগত যে ব্যবস্থা নেয়া দরকার সেটা আমরা নেবো। তিনি বলেন, বিএনপি নেত্রীর নির্দেশেই দেশজুড়ে জঙ্গি কায়দায় সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। আর এ অপরাধের জন্য তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার অবস্থানের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উনি বাড়ি ছেড়ে অফিসে গিয়ে বসে থাকলেন। অফিসে কী মধু আছে জানি না। তিনি অফিস থেকে বের হন না। ওখানে বসে বসে হুকুম দেন, আর তার ছেলে লন্ডনে বসে হুকুম দেয়। এ দু’জনের হুকুমে তাদের সন্ত্রাসী ক্যাডাররা পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করছে, ধ্বংস করাই তাদের কাজ। বিএনপি জোটের চলমান সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। চলমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশংসা করে শেখ হাসিনা বলেন, তারা দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। এসএসসি পরীক্ষার মধ্যে অবরোধের পাশাপাশি বিএনপির হরতাল ডাকার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেদিন থেকে পরীক্ষা শুরু সেদিন থেকেই অবরোধের সাথে হরতালেরও ডাক দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের তো ধ্বংসাত্মক অবস্থার মধ্যে ফেলতে পারি না। তাই শুক্রবার আর শনিবার করে পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। না হলে পরীক্ষা অনেক আগেই শেষ হয়ে যেতো।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী প্রথমেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত চারজনের স্বজনদের হাতে ১০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র তুলে দেন। পেট্রোল বোমায় নিহত সোহাগের মা দৃষ্টিহীন সেলিনা বেগমকে পারিবারিক সঞ্চয়পত্রের পাশাপাশি প্রতিমাসে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ৫ হাজার টাকা করে আজীবন মাসোহারা দেয়ার ঘোষণা দেন তিনি। পেট্রোল বোমায় নিহত পুলিশ কনস্টেবল শামীম মিয়ার বাবা লাল মিয়া আকন্দকে ১০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র দেয়ার পাশাপাশি তার স্ত্রী মোসাম্মত্ বিলকিস বেগমকেও ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দেয়া হয়। এছাড়া নিহতদের স্বজন ও আহতদের প্রত্যেককে ১০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র দেয়া হয়।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা, পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতউল্যাহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে গত ৬ জানুয়ারি থেকে লাগাতার অবরোধ চালিয়ে আসছে বিএনপি-জামায়াত জোট। অবরোধের মধ্যেই কর্মদিবসগুলোতে থাকছে তাদের হরতাল। দু’মাসেরও অধিক সময় ধরে চলমান এসব কর্মসূচিতে প্রায় প্রতিদিনই যাত্রীবাহী বাসসহ বিভিন্ন গাড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ, অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও হাতবোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। নাশকতার এসব ঘটনায় এ পর্যন্ত  ১১৯ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের অর্ধেকের বেশি দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। অবরোধে ১ হাজার ৮শ’ গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ৬০ লাখ টাকার অনুদান
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে ৫০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন। বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ কবির হোসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এ অনুদানের চেক হস্তান্তর করেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব একেএম শামীম চৌধুরী সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। চেক হস্তান্তরের সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি আহসানুল হক খান টিটু ও সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক খান। এছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালিকও ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ১০ লাখ টাকা অনুদান দেন।
সুচিকিত্সার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মংলায় সেনা কল্যাণ সংস্থার নির্মাণাধীন সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ধসে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। গতকাল রাতে এক শোক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী নিহতদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। প্রধানমন্ত্রী আহতদের দ্রুত সুচিকিত্সার নির্দেশ দেন।