হাইকোর্ট বলেছে, যেকোনো নিখোঁজ নাগরিককে খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি যদি নিজেকে লুক্কায়িত রাখেন অথবা কোনো প্রাইভেট কাস্টডিতেও থাকেন। তারপরও তাকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। গতকাল বৃহস্পতিবার এই অভিমত দিয়ে হাইকোর্ট বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে খুঁজে বের করে রবিবার সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে কেন আদালতে হাজির করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে। স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের আইজি, র্যাব মহাপরিচালক, ডিএমপি কমিশনার, ঢাকা জেলা প্রশাসকসহ আটজনকে এই সময়ের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯১ ধারায় দায়েরকৃত এক আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের ডিভিশন বেঞ্চ এই আদেশ দেয়।
আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আদালত রুল জারি করেছে। এর মধ্যে সালাহউদ্দিন আহমেদকে খুঁজে পাওয়া গেলে তাকে আদালতের সামনে হাজির করতে হবে।
সালাহউদ্দিন আহমেদের পরিবার ও বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মঙ্গলবার রাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উত্তরার একটি বাড়ি থেকে সালাহউদ্দিনকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার হদিস মিলছে না। তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ গুলশান ও উত্তরা থানায় এ ব্যাপারে জিডি করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে হাসিনা আহমেদ স্বামীর সন্ধান চেয়ে হাইকোর্টে একটি আবেদন দাখিল করেন। আবেদনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে হাইকোর্টে হাজিরের নির্দেশনা চাওয়া হয়।
আবেদনের পক্ষে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, মঙ্গলবার রাতে সালাহউদ্দিন আহমেদকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাকে যেন আদালতে হাজির করা হয় এজন্য নির্দেশনা চেয়ে আমরা আবেদনটি দায়ের করেছি। আমরা রুল চাচ্ছি।
জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, হাইকোর্টে আবেদনটি দায়েরের পর আমি আইজিপির সঙ্গে কথা বলেছি। আইজিপি আমাকে জানিয়েছেন তিনি পুলিশের কাস্টডিতে (হেফাজতে) নেই। কেউ যদি পুলিশের কাস্টডিতে থাকে তখন তাকে হাজির করার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯১ ধারা অনুযায়ী আদালত নির্দেশ দিতে পারে। কিন্তু কেউ পুলিশের কাস্টডিতে না থাকলে আদালত তাকে হাজির করার নির্দেশ দিতে পারে না। এ পর্যায়ে আদালত বলে, রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক যদি নিখোঁজ হয় তাকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব কার? এ দায়িত্ব কি রাষ্ট্রের নয়? অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, হ্যাঁ, এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্র নীরব থাকতে পারে না। কিন্তু এ ব্যক্তি অজ্ঞাত স্থান থেকে কেবল ই-মেইলে বিবৃতি দিতেন। এমনও হতে পারে কেউ আত্মগোপনে থেকে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য কিছু করতে পারে। আদালত বলে, আপনি (অ্যাটর্নি জেনারেল) বলছেন উনি পুলিশের কাস্টডিতে নেই। তার মানে হচ্ছে তিনি কোনো ইলিগ্যাল কাস্টডিতে আছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আদালত রবিবার পর্যন্ত আবেদনের শুনানি মুলতবি রাখতে পারে। আমি এ সময়ের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আবারও যোগাযোগ করব। তারা সালাহউদ্দিন আহমেদকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। এ ব্যাপারে কী অগ্রগতি হয় তা আমি রবিবার আদালতকে অবহিত করব।
জবাবে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, দেশের কী অবস্থা তা সকলেরই জানা। এটা সালাহউদ্দিন আহমেদের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। আমরা পছন্দ করি আর নাই করি, দেশে তো একটা সরকার আছে। সরকারের দায়িত্ব দেশের সকল নাগরিকের নিরাপত্তা দেয়া এবং কেউ নিখোঁজ হলে সরকারের দায়িত্ব তাকে খুঁজে বের করা। তাই সরকার আদালতে এসে বলুক যে সালাহউদ্দিন আহমেদ তাদের হাতে নেই। এজন্যই রুল জারি করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান পৃথিবীতে কোনো কিছুই নেই। এটা আমরা কেউই চাই না কিন্তু আপনারা রবিবার পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করলেন আর দেখা গেল বুড়িগঙ্গা বা অন্য কোথাও তার মরদেহ পাওয়া গেল। তখন এর দায়িত্ব কে নেবে? আদালতের মর্যাদা রক্ষার স্বার্থেই রুল দেয়া প্রয়োজন।
খন্দকার মাহবুব বলেন, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রমহানকে ধরে নেয়ার পর পুলিশ একই কথা বলেছিল। কিন্তু কয়েকদিন পর তার খোঁজ মেলে। তিনি বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল দায়িত্ব নিক যে এর মধ্যে কোনো অঘটন ঘটবে না? তাহলে আমরা রবিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি আছি।
শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করে। শুনানিকালে আদালতে আবেদনকারীর পক্ষে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মদ আলী, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী, ব্যারিস্টার এহসানুর রহমানসহ শতাধিক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
সালাহউদ্দিন নিখোঁজের বিষয়টি তদন্ত হচ্ছে :স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের নিখোঁজের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তদন্ত করে দেখছে। তবে তার পরিবার বিষয়টি নিয়ে যে অভিযোগ করেছে, তা এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে পরিষ্কার ও স্পষ্ট নয়। কে বা কারা তাকে নিয়ে গেছে সে সম্পর্কে পুলিশের কাছেও কোনো তথ্য নেই। পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন বলেই ‘আমরা তা তদন্ত করে দেখছি’ বলে তিনি সাংবাদিকদের জানান।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে মিরপুর পুলিশ স্টাফ কলেজে অনুষ্ঠিত ‘ট্রেনিং অন ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম, সার্ক পারসপেকটিভ’- শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালার সমাপনী ও সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য প্রদান করেন। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যে কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করলে আইন অনুযায়ী তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করা হয়। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ওয়ারেন্ট সংশ্লিষ্ট থানায় কবে পৌঁছাবে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব কিছুই আদালতের নির্দেশে হচ্ছে।
‘প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ষড়ষন্ত্রে জড়িতদের অচিরেই গ্রেফতার’: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আত্মঘাতী নারী দিয়ে হত্যার ষড়ষন্ত্রে জড়িতদের খুঁজে বের করা হবে। এদের অচিরেই গ্রেফতার করা হবে বলে সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদ সদস্য তারানা হালিমের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেন।
তারানা হালিম প্রতিমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, গত ৪ মার্চ ইত্তেফাকে ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আত্মঘাতী নারী দিয়ে হত্যার ষড়ষন্ত্র’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কারা এই পরিকল্পনায় জড়িত তা-ও রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকার পরও কেন পরিকল্পনাকারীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না?
সংসদ সদস্য মহিবুর রহমান মানিক প্রশ্ন করেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরয়োনা জারির পর তা বাস্তবায়নে ধীর গতি কেন? মন্ত্রণালয় কি বিষয়টি খতিয়ে দেখবে? জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। আইনের বাইরে কিছু করতে চাই না। আমরা ওয়ারেন্ট পাওয়া মাত্রই তা প্রতিপালন করবো। তাছাড়া পরোয়ানা না পৌঁছা কিংবা দেরিতে পৌঁছানোর বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত নয়। এ বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে।
একই প্রশ্ন করেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাজী মো. সেলিম। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে ১৩৭টি মামলা হয়েছিল। আমাদের গ্রেফতারের সময় ওয়ারেন্ট তাড়াতাড়ি চলে যায়; কিন্তু খালেদা জিয়ার কাছে যেতে এত সময় লাগে কেন?
সংসদ সদস্য শরীফ আহমেদের লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পলাতক খুনিদের সম্পত্তি ক্রোক ও বাজেয়াপ্ত করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাসপোর্টের মেয়াদ ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। মেয়াদ ১৫ বছর করার কোনো পরিকল্পনাও এই মুহূর্তে সরকারের নেই।
এ কে এম মাঈদুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী সংসদে জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে মঞ্জুরিকৃত মোট পুলিশের সংখ্যা ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮০৯ জন। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-এর সর্বমোট জনবল ৪৯ হাজার ৬২৩ জন।
‘আমার স্বামীকে ফেরত দিন’
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি দাবি জানিয়েছেন তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ। তিনি বলেন, একটি মানুষকে তুলে নিয়ে যাবে, আর তার কোন হদিস থাকবে না, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী অস্বীকার করবে যে, তাকে নিয়ে যাওয়া হয়নি। তারা না নিয়ে গেলে কে নিয়ে গেলো? মানুষকে এভাবে তুলে নিয়ে যাবে, কেউ কিছু বলবে না, আর আমরা থানায় থানায় ঘুরবো, কোন প্রতিকার পাবো না,আমরা কোন দেশে বসবাস করছি? হাইকোর্টের রুল জারির পর গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের ‘ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের কার্যালয়ে এক প্রেস-ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
হাসিনা আহমেদ বলেন, দুই দিন হলো আমার স্বামীর কোন হদিস নাই। আমরা যখন থানায় জিডি করতে গেলাম, আমার জিডি নেয়া হয়নি। জাতির কাছে এতটুকুই চাওয়া, আমার স্বামীকে আমার কাছে ফেরত দেয়া হোক। তিনি দাবি করেন, গোয়েন্দা পরিচয়ে আমার স্বামীকে তুলে নেয়া হয়েছে। যারা তাকে তুলে নিয়ে গেছেন তারা ওই বাসার দারোয়ানের কাছে নিজেদের ‘গোয়েন্দা’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। মঙ্গলবার রাত ১০টার পর সালাহউদ্দিনের সঙ্গে তার আর যোগাযোগ হয়নি বলে জানান তিনি।
হাসিনা আহমেদ বলেন, গত শনিবার রাত পৌনে তিনটা থেকে চারটার দিকে আমার বাড়ির দুই ড্রাইভার ও আমার স্বামীর ব্যক্তিগত সহকারীকে যার যার বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। দুইদিন তাদের পরিবারবর্গ তাদের কোন খোঁজ জানতে পারেনি। তাদেরকে অমানসিক অত্যাচার করা হয়েছে। তিনদিন পর তাদেরকে গুলশান থানায় দিয়ে আসে। তাদেরকে বোমা বিস্ফোরণের মামলায় দিয়েছে। এখন তারা তিন দিনের রিমান্ডে আছে। এরা তো গরিব মানুষ, পেটের দায়ে চাকরি করে, ওদের কি দোষ?
