‘যৌক্তিক’ পরিণতিতে না পৌঁছা পর্যন্ত ‘শান্তিপূর্ণ’ আন্দোলনের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোট প্রধান বেগম খালেদা জিয়া। একইসঙ্গে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সকলের অংশগ্রহণে দ্রুত একটি নির্বাচনের আয়োজন করলেই কেবল চলমান সংকটের সুরাহা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এই নির্বাচনের জন্য সরকারকে সুনির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে দ্রুত সংলাপের আয়োজন করতে হবে। গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় প্রতি কার্যদিবসেই ডাকা হরতাল কর্মসূচি এবং ৬ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে এখনও চলমান অবরোধের ৬৭তম দিনে গতকাল শুক্রবার নিজের গুলশান কার্যালয়ে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
দীর্ঘ লিখিত বক্তব্যে চলমান পরিস্থিতিকে ‘রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট’ অভিহিত করেন খালেদা জিয়া। অবরোধ-হরতালের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ার পাশাপাশি তিনি এই সংকট থেকে উত্তরণে একগুচ্ছ প্রস্তাবনা রেখেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আজকের এই সংকট সমাধানের চাবিকাঠি সরকারের হাতে। সভা-সমাবেশ-মিছিলসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আরোপিত সকল প্রকার বিধি-নিষেধ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। সারাদেশে গ্রেপ্তারকৃত ২০ দলের নেতা-কর্মীদের মুক্তি দিতে হবে। এছাড়া গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যকাণ্ড বন্ধ, পুলিশি ও যৌথবাহিনীর হয়রানি বন্ধ, নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ‘মিথ্যা ও হয়রানিমূলক’ সকল মামলা প্রত্যাহার এবং বিচার বহির্ভূত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তি দিতে হবে।’
বিএনপি চেয়ারপারসন সংকট থেকে উত্তরণে সরকারকে সুনির্দিষ্ট করে কোনো সময়সীমা বেঁধে দেননি। তবে পরোক্ষভাবে তিনি ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসের আগেই সংকট সমাধানের উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সংকট নিরসনের মাধ্যমে সরকারের জাতীয় ঐক্যের পথ খুলে দিতে পারে। আশা করি, তারা সমঝোতার পথে ফিরে আসবে। আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান সংকট দ্রুত নিরসনের উদ্যোগ নেবে।’
তিনি বলেন, ‘নির্দলীয় সরকারের অধীনে একটি নির্বাচনের বিষয়ে ক্ষমতাসীনরা যদি কোনো আলোচনা করতে না চায়, তাহলে সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব এককভাবে তাদের ওপরই বর্তাবে। সংসদের অধিবেশন চলছে। পঞ্চদশ সংশোধনী তারা ইচ্ছা করলে বাতিলও করে দিতে পারে। তাতে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পথ খুলবে। এই সংশোধনীর পর বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা পদত্যাগ করে নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করলেই দেশে সংকটের অবসান ঘটবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের পর আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিতের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এবারের লাগাতার আন্দোলনের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আলোচনার ভিত্তি হিসেবে আমরা সাত দফা প্রস্তাব তুলে ধরি। সরকার তা নাকচ করে দেয়। এই পরিস্থিতিতে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে আনতে আন্দোলন ছাড়া আর কোনো পথ আমাদের সামনে খোলা রাখা হয়নি। কিন্তু শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ স্বাভাবিক করতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তিনি বলেন, আন্দোলনে দেশবাসী, নেতা-কর্মীদের কষ্ট ও ক্ষয়-ক্ষতির কথা আমরা জানি, বুঝি। সাহসিকতার সঙ্গে সবাই অংশগ্রহণ করলে এই আন্দোলন সফল হবে। এ আন্দোলনে সবাইকে সামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যারা এখনও নিষ্ক্রিয় তারা সক্রিয় হোন। নিজ নিজ অবস্থান ও এলাকায় আন্দোলন গড়ে তুলুন।
২০ দলের অবরোধ-হরতাল চলাকালে পেট্রোল বোমায় মানুষ হতাহতের ঘটনা সম্পর্কে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, রাজনৈতিক সংকট সমাধানের কোনো সদিচ্ছা এই সরকারের নেই। তাই তারা সংকটকে দীর্ঘায়িত করতে চায়। সেই উদ্দেশ্যেই আন্দোলন চলাকালে তারা অন্তর্ঘাত চালিয়ে আন্দোলনকে জঙ্গি তত্পরতা বলে দেশে-বিদেশে অপপ্রচার চালাচ্ছে। বিএনপি ও ২০ দল নিরপরাধ মানুষকে হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না।
বিএনপির ‘নিখোঁজ’ যুগ্ম-মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করে তিনি বলেন, তাকে গ্রেপ্তার করে তিনদিনেও সরকার স্বীকার করেনি। এখন পর্যন্ত তার কোনো হদিস নেই। অবিলম্বে তাকে মুক্তি দেয়া না হলে পরিণতি ভালো হবে না। তিনি নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, তার ব্যাপারেও সরকার প্রথম অস্বীকার করে, পরে ২১ ঘণ্টা পর তাকে গ্রেপ্তার দেখায়।
লিখিত বক্তব্যের পর তিনি কোনো প্রশ্ন নেননি। তার সঙ্গে গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান করা বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান, বেগম সেলিমা রহমান ও শিরিন সুলতানা এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস ও প্রেসসচিব মারুফ কামাল খান সোহেল সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
