মুক্তিযুদ্ধ ও প্রেমের চলচ্চিত্র

শাকিব-বিন্দুর ‘এই তো প্রেম’

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৫, ১৩:৪৫
গুণী বাবার যোগ্য সন্তানই বলতে হবে সোহেল আরমানকে। তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘এই তো প্রেম’ মুক্তির পর থেকেই দর্শকদের ভালোবাসা অর্জন করতে শুরু করেছে। আর জননন্দিত চলচ্চিত্র পরিচালক আমজাদ হোসেনকে এক নামে সবাই চেনেন। সোহেল নির্মিত এই ছবিটি মুক্তি পেতে কয়েক বছর সময় লাগলেও সুন্দর গল্প ও নির্মাণশৈলীর জন্য দর্শকরা গ্রহণ করেছেন সাদরে। ঢালিউডের কিং শাকিব খান ও লাক্সসুন্দরী বিন্দু জুটির প্রেমের রসায়নটাও মানানসই। সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রের হালহকিকত জানাচ্ছেন খালেদ আহমেদ
 
‘আমি তোমার মনের ভেতর একবার ঘুরে আসতে চাই’—এই গানটির সাথে কমবেশি সবারই পরিচয় আছে। ‘এই তো প্রেম’ ছবির এই গানটি গেয়েছেন হাবিব ও ন্যান্সি। ২০০৯ সালে গানটি প্রকাশের পরপরই ব্যাপক শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। তাই তো গানটির জনপ্রিয়তার কারণেই এই ছবিটি নিয়ে চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু ছবির শুটিং শেষ করতে অনেক বেশি সময় নিয়েছিলেন পরিচালকা সোহেল আরমান। একটা সময়ে শুটিং শেষ হলেও ছবিটির মুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। কথায় আছে, সবুরে মেওয়া ফলে। তার ধৈর্যের ফলাফলও সুন্দর হয়েছে। গত সপ্তাহে সারাদেশে মুক্তি পেয়েছে তার প্রথম চলচ্চিত্র। শ্রোতাপ্রিয় এই গানটি সৃষ্টির একটি গল্প রয়েছে। সেটি জানতে চাইলে এর রচয়িতা সোহেল আরমান বলেন, ‘আমি সারারাত জেগে বারবার একটি গান লিখছিলাম। কিন্তু আমার ভালো লাগছিল না। কাগজের টুকরোগুলো মেঝেতে ফেলে একসময় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমার মা সকালবেলা এসে ঘর ঠিকঠাক করার সময় কাগজগুলো তুলে তুলে পড়ছিল। ঘুম থেকে আমাকে ডেকে বলল, এসব কী তুই লিখেছিস? আমি ঘুমঘুম চোখে বললাম, হ্যাঁ মা। কিন্তু ভালো হয়নি। তখন মা বলল, বলিস কী? খুব সুন্দর হয়েছে তো তোর এ গানটা। আমি অবাক হয়ে বললাম, সত্যি বলছ? মা বলল, হ্যাঁ। মায়ের দোয়া আশীর্বাদ নিয়ে গানটি রেকর্ড করলাম। হাবিব ও ন্যান্সির গাওয়া ‘আমি তোমার মনের ভেতর একবার ঘুরে আসতে চাই’ এই গান শুনে সারা বাংলাদেশ মুগ্ধ হয়ে গেল। আর ছবির গল্পটা কেমন? উত্তরে তিনি বললেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত এই ছবিতে দেশপ্রেমের পাশাপাশি রোমান্টিকতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। ৭১-এ শুধু কি যুদ্ধই হয়েছে, যুদ্ধের মধ্যেও তো ছেলেমেয়েরা প্রেম করেছে। আমার গল্পের নায়ক এক ব্রাহ্মণের মেয়েকে ভালোবাসে। মুক্তিযুদ্ধের সময় হিন্দু-মুসলমান আলাদা কোনো ব্যাপার ছিল না। তখন সবাই এক ছিল। কেউ ধর্ম নিয়ে টানাটানি করেনি। ওই সময় ব্যক্তি প্রেমের চেয়ে ঊর্ধ্বে ছিল দেশপ্রেম। সেটাই দেখানো হয়েছে ছবিতে।’ চলচ্চিত্র নির্মাণের শুরুর গল্পটা ছিল এ রকম—সময়টা ২০০৯ সাল। সোহেল আরমান তখন মাত্রই ছবির কাহিনী ও চিত্রনাট্য লিখে শেষ করেছেন। এফডিসিতে মহাব্যস্ত শাকিব। তাই তার সঙ্গে কথা বলার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো সোহেলকে। কাজের বিরতিতে পরিচালকের গাড়িতে উঠে শাকিব বললেন, ‘ছবির কাহিনীটা শুনি।’ হাতে সময় অল্প। সোহেল আরমান বললেন, ‘আমার মনে আছে, মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য কাহিনী শোনার জন্য এসেছিলেন শাকিব। কাহিনী শোনার সময় কিছুক্ষণ পরপর তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, ‘তারপর!’ এদিকে কাজের তাড়া দিতে অনেকে ডাকলেও শাকিব তাদেরকে গাড়ির ভেতর থেকেই ইশারায় জানিয়ে দেন, ‘আসছি।’ পুরো গল্প শোনার পর সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। গল্পটা শেষ হতেই শাকিবের চোখ ছলছল করল। তার সময় পাওয়া অনেক মুশকিল ছিল তখন। তবুও শাকিব বললেন, ‘ছবিটিতে কাজ করতে চাই।’ ওই সময় বিন্দু খিজির হায়াত খানের ‘জাগো’ ছবিতে অভিনয় করছিলেন। পাশাপাশি সোহেল আরমানের ধারাবাহিক নাটক ‘নাইওর’-এর কাজও ছিল তার হাতে। কাজের ফাঁকে প্রায়ই ছবির গল্পটা বিন্দুকে বলতেন সোহেল। কদিন পর ‘জাগো’ ছবির সেটে তাকে প্রস্তাব দেওয়ার পর সবার সামনে তিনি মুচকি হেসে বলে দেন, ‘আমি অবশ্যই কাজটা করব।’ ২০১০ সালে এ ছবির প্রথম দৃশ্যায়ন হয়। মানিকগঞ্জের কৈরি গ্রামের একটি হিজল গাছের নিচে শাকিব ও বিন্দু প্রস্তুত। সেখানে এক বিলের মাঝে কচুরিপানা, মাঝ দিয়ে চলে গেছে সরু মেঠোপথ। গানের শুরুতে শাকিব ও বিন্দু মেঠোপথ দিয়ে চলে যান। কিন্তু কেউই জানতেন না, গ্রামের বাসিন্দাদের চলাফেরার সুবিধার্থে বানানো হয়েছে এটি। শাকিব-বিন্দু দুজনই সুরে সুরে পথ দিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু ফেরার সময় যেখানেই তারা পা দেন, তলিয়ে যায় মাটি! বিলের দু’পাশ পূর্ণ কচুরিপানায়। তাই ইউনিটের লোকজনের সহায়তায় তারা দু’জন ওই পথটা পার হতে পেরেছিলেন। চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে শাকিব খান বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এটি সুন্দর একটি বাংলা চলচ্চিত্র। গল্প, নির্মাণ সব মিলিয়ে সব ধরনের দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে আমার বিশ্বাস। আর আমার চরিত্র নিয়ে বলতে চাই না, দর্শকরা সিনেমা হলে গিয়ে আমাকে এবং সুন্দর একটি ছবি দেখুক।’ বিন্দু বলেন, ‘এই ছবিটির জন্য প্রায় পাঁচ বছর ধরে অপেক্ষা করছি। মাঝে ভেবেছিলাম, ছবিটি বুঝি আর আলোর মুখ দেখবে না। অবশেষে সবার কল্পনাকে হার মানিয়ে গত সপ্তাহে ছবিটি মুক্তি পেয়েছে। ছবির গল্প ও নির্মাণ অনেক ভালো। আমার চরিত্রটিতেও ভিন্নতা আছে। আর দর্শকদের ছবিটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হওয়ায় আমি খুবই আনন্দিত।’ ছবিটি প্রসঙ্গে পরিচালক সোহেল আরমান বলেন, ‘ছবিটির শুটিং করেছিলাম ৩৫ মি.মি. ক্যামেরায়। পরে ডিজিটাল ফরম্যাটে রূপান্তর করতে অনেক সময় লেগে যায়। সবকিছু মিলিয়ে ছবিটি মুক্তি দিতে এত দেরি হয়েছে। প্রথম সপ্তাহে আমরা ৮০টি হল পেয়েছি। পরের সপ্তাহে তা ১০০ ছাড়িয়ে যাবে। আমি ছবিটির সাফল্যের ব্যাপারে যথেষ্ট আশাবাদী। যতই সময় যাচ্ছে, ততই ভালো লাগছে। পাশাপাশি একটা মানসিক চাপও কাজ করছে। আমার বিশ্বাস, ছবিটিতে যে ধরনের উপাদান আছে, তা সব বয়সী দর্শকের ভালো লাগবে। আমি খুব যত্ন নিয়ে ছবিটির কাজ করেছি।’ ছবির প্রযোজক শাহিন কবির বলেন, ‘ছবিটি নিয়ে দর্শকদের যে পরিমাণ আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে। এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি, ছবিটি নিয়ে দর্শকেরা যে অপেক্ষা করেছেন, তার ফল তারা পাবেন। ছবিটি তাদের নিরাশ করবে না।’ ছবি মুক্তির শুরুতেই দর্শকের আগ্রহ দেখে বোঝা যায়, সোহেল আরমানের প্রথম ছবি ‘এই তো প্রেম’ তাকে চলচ্চিত্র জগতে প্রতিষ্ঠিত করবে। তার জন্য শুভ কামনা।