গতকালের পর )
শেষ
কিস্তি
শুধু আসিফ নয়, অধিকাংশ কণ্ঠশিল্পী, অভিনয় শিল্পীদের আছে চাপা ক্ষোভ। মুস্তাফা কামাল রাজ-এর ছবি ‘ছায়া-ছবি’ কবে রিলিজ হবে কেউ জানে না। গত ৩ বছর ধরেই রিলিজের খবরই ছাপা হচ্ছে স্বপন আহমেদের ‘পরবাসিনী’ ছবিটির। রেদওয়ান রনি তার ‘চোরাবালি’র পর নতুন ছবির ঘোষণা দিয়ে অতঃপর সেটিও বাদ দিয়ে নতুন আরেকটি ছবির প্রযোজনায় নিজের প্রচারণা শুরু করেছেন। এদিকে চোরাবালির প্রযোজক সালেহীন স্বপন নির্মাতা রনির কাছে প্রায় এক কোটি টাকার হিসেব না পেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ফেরত গেছেন চলচ্চিত্র থেকে বিমূখ হয়ে! অথচ এর ভেতরে প্রত্যেকে নিজের নাটক, বিজ্ঞাপন বা কর্পোরেট যেকোনো কাজে ঠিকই নিয়মিত আছেন। গিয়াসউদ্দিন সেলিম বা সালাউদ্দিন লাভলুর চলচ্চিত্রের প্রতি কোনো কমিটমেন্ট নেই বলেই নিয়মিত ঝুঁকি নিতে চাননি তারা। কারণ খান আতাউর রহমানদের ভেতরে যে প্রেম ছিল ফিল্ম নিয়ে সেই প্রেম বা নেশার বিন্দুমাত্র তাদের ভেতরে নেই। অর্থাত্ মৌসুমী বাতাসের মতো চলচ্চিত্র করে নিজের কিছু উপরি রোজগারের নাম তাদের কাছে ‘ফিল্ম’। আগের দিনের মতো খান আতাউর রহমান, সুভাষ দত্ত , কিংবা সর্বশেষ শহীদুল ইসলাম খোকনরা যেমন স্ত্রীর গয়না বন্ধক করে বা বাড়ি মর্টগেজে দিয়ে চলচ্চিত্র করতেন। একটি ছবি ফ্লপ হলে পরেরটার জন্য আশায় বুক বাঁধতেন। সেই নেশাতুর পরিচালকদের গল্প আজ অলিখিত এক রূপকথার বইয়ে ঠাঁই পেয়েছে। ফলে এই মৌসুমী নির্মাতাদের ভেতরে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ডিকশনারিতে আজ ‘কমিটমেন্ট’ শব্দটি উধাও হয়ে গেছে। তারা শুধু ইন্ডাস্ট্রি থেকে নিতেই এসেছেন, দিতে নয়। বা নিজেকে শপে দিতে আসেননি। নিজে এই জরাজীর্ণ ইন্ডাস্ট্রিতে দাঁত কামড়ে বসে থাকতে আসেননি কেউ। আর তরুণ নির্মাতা বা চলচ্চিত্র কর্মীদের দোষ দিয়েই বা কী লাভ। তারা তো অগ্রজদের কাছ থেকেই শিখবে!
এদিকে এম এ জলিল অনন্তের ‘মুনসুন ফিল্মস’ থেকে শুধু তার নিজের ছবিই রিলিজ হয়। তাই সেটাকে পুর্ণাঙ্গ ‘শিল্পপ্রান’ প্রডাকশন হাউজ বলা মুশকিল। তবে তিনি ব্যক্তি চেষ্টায় বা নিজের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়াবার স্বার্থে হলেও এই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য কিছু করার চেষ্টা করছেন নিয়মিতই। এটাই বা কম কী? নয়তো তিনি তার লগ্নি অনায়াসে অন্য ব্যবসাতেও করে লাভবান হতে পারতেন।
একটি চলচ্চিত্রের নির্মাতা নঈম ইমতিয়াজ নিয়ামুল তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে চলচ্চিত্রের কিছু নাম নিয়ে ব্যঙ্গ করছেন। কিন্তু পরিচালক সমিতির সিনিয়র নির্মাতারাও যে ইন্ডাস্ট্রির জন্য বিশেষ কিছু করছেন তাও নয়। যেমন সিনিয়র পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের চলচ্চিত্রের নাম ‘ওয়াও বেবী ওয়াও’। এই নাম নিয়ে নানা স্তরে নিন্দা আর হাস্যোরস ছড়িয়েছে। অনেকেরই সঙ্গত ধারণা চ্যানেলের অল্প বাজেটে নির্মাতা
সোহানের পুরোনো সম্মানটুকুও পুরোপুরি বিলুপ্তির জন্য এই একটি ছবিই যথেষ্ঠ।
তাই এখন প্রয়োজন কমিটেড ও প্রফেশনাল নির্মাতা এবং সর্বোপরি প্রয়োজন প্রফেশনাল প্রডাকশন হাউজ। এদেশে ‘ইমপ্রেস টেলিফিল্ম’ অনেক সস্তা মানের ছবির পাশাপাশি কিছু দুর্দান্ত চলচ্চিত্রও উপহার দিয়েছেন। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো তারা নিয়মিত প্রযোজনা করছেন। আমাদের অভাবী ইন্ডাস্ট্রিতে তাই চলচ্চিত্রের জন্য এখনকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঘর এটিই। এরপর ধরা যায় ‘জাজ মাল্টিমিডিয়া’। তারা শুধু মাহীকে নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পণ করে কাজ করলেও অন্তত সেই উপলক্ষে নিয়মিত প্রযোজনা করে ছবি রিলিজ করছেন। তাই আপাতদৃষ্টিতে জাজ-এর ভূমিকা অবশ্যই ইতিবাচক। তাই এই জরাজীর্ণ ইন্ডাস্ট্রি দাঁড় করাতে হলে প্রয়োজন কিছু প্রফেশনাল হাউজ। ‘ভার্সেটাইল মিডিয়া’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই পথে হাঁটা শুরু করেছে মাত্র। তাই এই প্রতিষ্ঠানটি কতটা প্রফেশনালি এগোবে তা বলার সময় এখনও আসেনি। এছাড়া এশিয়াটিক-এর মতো বড় কর্পোরেট হাউজ ছবি প্রযোজনায় এসেছেন। এটিও ইতিবাচক ঘটনা, যদি তারা শুধু স্পন্সর মুনাফা নয়, ইন্ডাস্ট্রির অবকাঠামোতেও প্রযোজক হিসেবে ভূমিকা রাখেন নিয়মিত।
আর এইসব নন-প্রফেশনাল পরিচালক যখন প্রফেশনাল প্রযোজকদের অযাচিতভাবে ঠকিয়ে বিরক্ত করে ফেলেন তখন ওই নির্মাতা আসলে শুধু প্রযোজকের বুকে ছুরি বসান না, ছুরিকাঘাত প্রাপ্ত হয় গোটা ইন্ডাস্ট্রি। যে ছুরিগুলো বসিয়েছেন রাজ, রনি, টুটুলের মতো নির্মাতারা।
কারণ অনিমেষ আইচের বিরুদ্ধে যখন প্রযোজক আড়াই কোটি টাকার হিসেব মেলাতে না পেরে তার ‘না মানুষ’ ছবিটি শুরু করেও পালিয়ে বাঁচেন বা দীর্ঘ ৬ বছরে শাকিব খান ও নির্মাতার খামখেয়ালীতে ‘এইতো প্রেম’ ছবির বাজেট যখন তিন চারগুণ বেড়ে যায়, অতঃপর প্রযোজক শাহীন কবির কোনোমতে ছবিটি রিলিজ দেয়াকেই একমাত্র সাফল্য হিসেবে মন্দের ভালো বলে হাফ ছাড়েন। তখন এইসব উদাহরণ কখনই ইন্ডাস্ট্রির জন্য ইতিবাচক হয় না। তাই এই মৌসুমী নির্মাতাদের ধোঁকাবাজিতে ইন্ডাস্ট্রি যেমন ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে তেমনি প্রফেশনাল প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান না থাকায় নতুন লগ্নিকারকরা নির্মাতার দারস্থ হচ্ছেন এবং ধোঁকায় পড়ছেন। ফলে নানা অনৈতিক কাজ বেড়ে যায় ফিল্মকে কেন্দ্র করে। কোনো কোনো নায়িকার ছবি রিলিজ হয়নি বললেই চলে, কিন্তু ফ্ল্যাট বুকিং বা নিত্য নতুন গাড়ি কেনার খবর প্রায়ই আসে। ফলে ফ্রাসট্রেশন আসে তার থেকে বেশি মেধার নায়ক বা অন্যদের ভেতরেও। বলে রাখা ভালো ছবিতে ‘লগ্নিকারী’ আর ‘প্রযোজক’ দুইটি ভিন্ন জিনিষ। কিন্তু আমাদের দেশে এই সিস্টেমটাও আজ অবধি সেভাবে চালু হয়নি। তাই এখন একান্ত প্রয়োজন প্রফেশনাল প্রযোজনা সংস্থা। যারা নিয়মিত ছবি রিলিজ দেবে ব্যবসায়িক চিন্তা থেকেই। সেখানে কোনো ছবি লাভ হবে, কোনোটা লোকসানে ডুববে কিন্তু তাতে রিলিজ বন্ধ হবে না।
