একের পর এক প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারত আজ বৃহস্পতিবার চারবারের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার মোকাবেলায় নামছে। দুদলের শক্তি ও সামর্থ্যের বিচারে এটি হতে যাচ্ছে বিস্ফোরক এক লড়াই।
দুদলকে ঘিরে সমর্থকদের প্রত্যাশাও এমন গগনচুম্বী হয়ে উঠেছে যে, ভারতের এনডিটিভি জানিয়েছে ৪৪ হাজার আসনের সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের টিকিটের জন্য রীতিমত হাহাকার দেখা যাচ্ছে। কেননা ক্রিকেটে অ্যাশেজ ও ভারত-পাকিস্তানের লড়াই আগের সেই মেজাজ হারানোর পর এ দুটি দলের লড়াই এখন সবচে বেশি উপভোগ করে দর্শক। তাছাড়া দুই দলে আছেন বিশ্ব সেরা কয়েকজন পারফর্মার।
বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ের মধ্যকার দ্বৈরথও আলাদা নজর কাড়তে পারে এ ম্যাচে। রবিচন্দন অশ্বিনের ক্যারম বল বনাম গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের পাইরোটেকনিক, ডেভিড ওয়ার্নারের পেসার মোহাম্মদ সামির বিরুদ্ধে চড়াও হওয়া, মাইকেল ক্লার্কের বহু বছরের অভিজ্ঞতার সামনে রবিন্দ্র জাদেজার আঁটসাঁট বোলিং আজকের ‘ব্লক বাস্টার’ লড়াইকে বাড়তি মাত্রা দেবে। এছাড়াও থাকবে ভারতের প্রধান ব্যাটসম্যান বিরাট কোহলির বিরুদ্ধে মিচেল স্টার্কের ঝাঁপিয়ে পড়া।
কোহলি যদিও বলেছেন অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর এটাই ভাল সুযোগ, তবে সবার নজর থাকবে তার উপরও। কেননা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এবারের বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচটিতে সেঞ্চুরি হাঁকানোর পর তিনি আর পঞ্চাশ পেরোনো সংগ্রহ গড়তে পারেননি। তবে বড় পরিসরেই নিজেকে মেলে ধরেন কোহলি। কাজেই অস্ট্রেলিয়ার উঁচু মানের পেস আক্রমণ তাকে তাতাতে পারে।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল অবশ্য কেবল কাগজে-কলমের হিসেবের ব্যাপার নয়। চাপের মুখে কোন দল কতটা ভালভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে তার উপরও অনেক কিছু নির্ভর করবে। নিউজিল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার প্রথম সেমিফাইনালটি তারই প্রমাণ। চাপের মুখে শ্রেয়তর থাকার সুবাদেই প্রথম ফাইনালে যোগ দিতে সক্ষম হয় ব্ল্যাক ক্যাপসরা। কাজেই আগামী রবিবারের মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডের ফাইনালে কে হবে ব্রেন্ডন ম্যাককালামের নিউজিল্যান্ড দলের বিপক্ষ, তা নির্ধারণের আগে আজ সিডনির লড়াইটি পরতে পরতে উত্তেজনা ছড়াতে যাচ্ছে।
বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় ভারত টানা সাত জয়ে দুরন্তপনা দেখিয়েছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দুই ঘরানার ক্রিকেট মিলিয়ে সাত খেলায় একটি জয়ও নেই। এমনকি এগুলোর মধ্যে থাকা ৪৩ দিন আগের বিশ্বকাপের প্রাক্কালে খেলা প্রস্তুতি ম্যাচটিতেও হেরেছে তারা। কিন্তু চারটি টেস্ট, ত্রিদেশীয় সিরিজের দুটি ওয়ানডে এবং প্রস্তুতি ম্যাচটির দুঃসহ স্মৃতি ভুলে মহেন্দ্র সিং ধোনির দল বিশ্বকাপে এসে ঠিকই ঘুরে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ভারতের যে বোলিং আক্রমণ নিয়ে সবচে বেশি দুশ্চিন্তা ছিল সেটাই আসল সময়ে একের পর এক বিপক্ষকে অলআউট করে দেয়। ভারতের সাত খেলায় নেয়া ৭০টি উইকেটের মধ্যে মোহাম্মদ সামি (১৭), উমেশ যাদব (১৪) ও মোহিত শর্মা (১১) নিয়েছেন ৪২টি।
মাইকেল ক্লার্কের অস্ট্রেলিয়ার জন্য সিডনির এই ভেন্যুটির উইকেট তাদের পছন্দের নাও হতে পারে। কেননা ঐতিহ্যগতভাবে এর উইকেট স্পিন সহায়ক। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার জয়ে দুই স্পিনার ইমরান তাহির ও জেপি ডুমিনি যথাক্রমে চার ও তিনটি উইকেট নিয়েছিলেন। সিডনির পিচ কিরকম হবে, সে সম্পর্কে কিউরেটর কাল পর্যন্ত ধারণা দেননি। তবে স্পিন সহায়ক হলে ভারতের পোয়াবারো। কেননা তাদের আছে অশ্বিন ও রবিন্দ্র জাদেজার মতো দুজন স্পিনার। বিশেষ করে অশ্বিন যিনি দুসরা দিয়ে ১২ উইকেট নিয়েছেন। তবে স্পিনারদের মোকাবেলায় অস্ট্রেলিয়া দলে আছেন স্টিভ স্মিথের মতো ব্যাটসম্যান; স্পিনের বিরুদ্ধে যার ফুটওয়ার্ক খুবই ভাল।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের অধিকাংশেরই মত হলো, কন্ডিশন যাই হোক টস জয়ী দলের ব্যাটিং নেয়াই ভাল। ভারত জিতলে তাদের সুবিধা এই যে, শিরোপাধারীদের টপ অর্ডার আজকের আগ পর্যন্ত খুবই ভাল করেছে। অন্তত প্রতিটি ম্যাচেই কেউ না কেউ বড় সংগ্রহ হাঁকিয়েছেন। এদের মধ্যে শিখর ধাওয়ান ৩৬৭ রান করে শীর্ষে আছেন। তবে স্টার্ক ও জনসনের মতো বোলারদের সামলাতে তাকে হিমশিম খেতে হবে। রোহিত শর্মার জন্যও বিশ্বকাপটি এখন পর্যন্ত ভাল গেছে।
স্বাগতিকদের হয়ে খেলাটি আয়ত্তে আনার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল যিনি আইপিএলে খেলার সুবাদে ভারতীয় বোলারদের খুঁটিনাটি জানেন। নিজেদের দিনে বিপক্ষকে তছনছ করে দিতে পারেন স্টার্ক এবং ওয়ার্নারও। স্টার্ক ১৮ উইকেট নিয়ে তার জাত চিনিয়েছেন। ১৪৫ কিলোমিটার গতিতে বল করতে পারেন তিনি। তার ইয়র্কারও ভয়ংকর। শেন ওয়াটসনের ফর্মে ফেরাও ক্লার্কের দলের জন্য ইতিবাচক।
ক্লার্ক নিজে ম্যাচটিকে কতটা গুরুত্বের সাথে নিচ্ছেন তার প্রমাণ নেটে কিংবদন্তী লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্নকে ডেকে এনে অনুশীলন করা।
মোদ্দা কথা একটা জমাটি সেমিফাইনালের সমস্ত রসদই প্রস্তুত। এখন কেবল ঝাঁপানোর পালা অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের, যাদের নিজেদের আছে নয়টি ফাইনালে খেলার অভিজ্ঞতা।
