জীবন বোধহয় এমনই-সাব্বির রহমান রুম্মন

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০১৫, ১২:১০

 

‘ক্যাটস আই’ ছেলেটি প্রথম নয়ন কেড়েছিল সেই এশিয়া গেমসের ফাইনালে। তখনই রব উঠেছিল—রুম্মন আসছেন।  রুম্মনের আসতে একটু সময় লেগে গেল। তবে এসেই নিজেকে ষোলো আনা চেনানোর কাজটা করে ফেলেছেন। বিশ্বকাপে তো রীতিমতো সেলিব্রিটি হয়ে গেছেন লোয়ার অর্ডারে নেমে রোজ ঝড় তুলে। ব্যাটিংয়ের মতোই চলনে-বলনে চঞ্চল রুম্মন এখন রাজশাহী, নিজেদের বাড়িতে। সেখানে বসেই মজায়-আনন্দে বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা, নিজের জীবন চিন্তার কথা বললেন। সাব্বির রহমান রুম্মনের মজার এই একান্ত সাক্ষাত্কার নিয়েছেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়—

সাব্বির, এখন কি রাজশাহীতে?
জি, রাজশাহীতে। আমি দেশে এসে ওইদিন রাতেই বাড়ি চলে এসেছি।
এবার বাড়ি ফেরার অভিজ্ঞতাটা কেমন হলো?
অসাধারণ, অসাধারণ। আমি কল্পনাও করতে পারিনি এই আমি একদিন এভাবে রাজশাহী ফিরব। কত মানুষ যে এসেছিলেন আমাকে স্বাগত জানাতে! এখনও লোকজন আসছেন বাড়িতে। রোজ লোকজন আসছেন, অনেক ফোন পাচ্ছি। এলাকার ছেলেরা আসছে। এলাকার অনেকে আছেন, আমার নাম শুনেছেন, দেখেননি আগে। তারা আসছেন। রাজশাহীতেও আমার অটোগ্রাফ দিতে হচ্ছে। এটা কখনো কল্পনা করিনি।
ঢাকায় পা রেখেই নিশ্চয়ই টের পেয়েছিলেন যে, সবকিছু বদলে গেছে?
হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমরা বিমানবন্দরে নামার পরই শুনলাম, বাইরে নাকি অনেক মানুষ। পরে ওখানে টেলিভিশনে দেখছিলাম, লাখ লাখ মানুষ মনে হয় বিমানবন্দরে চলে এসেছিলেন। অবিশ্বাস্য ব্যাপার। আমরা সবাই খুব আনন্দ পেয়েছি।
আপনারা তো মূল রাস্তা দিয়ে বেরোতেও পারলেন না ভিড়ের কারণে। এমনভাবে ঢাকায় ফিরবেন, যাওয়ার সময় ভেবেছিলেন?
না। ভেবেছিলাম, ভালো কিছু করে ফিরলে লোকজন আসবেন। কিন্তু এত মানুষ কল্পনা করিনি। আমরা তো চেয়েছিলাম সমর্থকদের পাশ দিয়েই বেরোতে। কিন্তু সেটা তো হলো না। পরে পিছনের একটা পথ দিয়ে বেরিয়েছি আমরা। এত মানুষ, এত ভালোবাসা!
সব মিলিয়ে কেমন উপভোগ করছেন? এই সেলফি, ভালোবাসা, অটোগ্রাফের জীবন...
খুব উপভোগ করছি। আমার ভালো লাগে এসব। আমি জানি, এগুলো ভালো খেলার অংশ। ভালো খেললে এই জীবন থাকবে, নইলে থাকবে না। কিন্তু যখন মানুষের ভালোবাসা এভাবে আসে, তার ভালো না লেগে উপায় নেই। ক্রিকেট খেলি দেশের জন্য, দলের জন্য ভালো কিছু করতে চাই। আর সেটা করতে পারলে মানুষ এভাবে ভালোবাসেন। এই ভালোবাসাই তো আমাদের তারকা বানায়। আমি তাই এটা খুব উপভোগ করি। আমার জীবনে এটা অবিশ্বাস্য একটা সময়। সেই এশিয়ান গেমসের সময়টা স্বপ্নের মতো কেটেছিল। আর এবার একটা স্বপ্নের মতো সময় কাটছে।
রুম্মন, ছয় মাস আগে ভাবতে পেরেছিলেন যে, এই বিশ্বকাপে আপনি তারকা হয়ে যাবেন?
অসম্ভব। ছয় মাস আগে আমি তো এক ধরনের হতাশায় সময় কাটাচ্ছিলাম। সেই এশিয়ান গেমসে খেলেছিলাম। তারপর থেকে কতগুলো দিন চলে গেল। আমি জানতাম না, কবে জাতীয় দলে নিয়মিত হব, কবে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিতে পারব। সবারই তো ইচ্ছা করে, তাই না? জিম্বাবুয়ে সফরের আগেও আমি জানতাম না যে আমার জীবনে কী হবে। তারপর তো কয়েকটা মুহূর্তের মধ্যে সব বদলে গেল। এত তাড়াতাড়ি আবার সব এরকম হয়ে যাবে এটা এখনও বিশ্বাস হয় না।
হতাশাটা কেমন ছিল?
হতাশা ঠিক বলব না। আসলে মাঝে মাঝে একটু খারাপ লাগত। মনে হতো, কবে পারব। আমি তো সবসময়ই স্বপ্ন দেখতাম, জাতীয় দলে নিয়মিত হব; সবাই আমাকে চিনতে এবং আমি নিজেকে গুছিয়ে নেব। সেটা হচ্ছিল না। আল্লাহ অবশেষে সেই সময়টা দিয়েছেন। আপনাদের সবার দোয়া, দেশের মানুষের ভালোবাসা আর আল্লাহর ইচ্ছায় সব তাড়াতাড়ি হয়ে গেল। এখন আমার চাওয়া একটাই, যেন নিজেকে ধরে রাখতে পারি, পারফরম করে যেতে পারি যেন।
বিশ্বকাপের কথায় যাই একটু। বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে কন্ডিশন নিয়ে অনেক কথা শুনেছেন। একটা আশঙ্কা ছিল যে, আমাদের ব্যাটসম্যানরা হয়তো খুব ভালো কিছু করতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত উল্টোটাই হয়েছে। আপনারা ভালো করেছেন, নিয়মিত রান করেছেন। এটা কী করে হলো?
আসলে শুধু আমার কথা বলব না, আমরা সবাই খুব পরিশ্রম করেছি। দেশে থাকতে দুই তিন মাস ধরে বাউন্সি উইকেটে নিজেদের মানিয়ে নেয়ার জন্য খুব কষ্ট করেছি আমরা। এরপর ওখানে গিয়ে ১২-১৪ দিন যে সময় পেয়েছিলাম, সে সময়ও দারুণ কষ্ট করেছি। কোচিং স্টাফের কথা বলতে হয়, ওনারা খুব কষ্ট করেছেন আমাদের নিয়ে। আমি বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে যে ১২ দিন মতো সময় পেয়েছি, ওটার কথা বলব। আমরা ওই সময়টা খুব কাজে লাগাতে পেরেছি। তারই ফল পেয়েছি আমরা।
আপনার নিজের ব্যাটিংয়ের কথা বলেন। আপনার জন্য কাজটা তো একটু বেশি কঠিন, তাই না? এমন একটা সময় ব্যাট করতে নামছেন, বড় শট করা ছাড়া উপায় নেই। এই কাজটার সঙ্গে মানিয়ে নেন কীভাবে?
আসলে এটা তো আমার জন্য নতুন কিছু না। আমি ঘরোয়া ক্রিকেটেও এই সাত-আট নম্বরে ব্যাট করি। জাতীয় দলে যে কয়টা ম্যাচ খেলেছি, এই পজিশনেই। আমি নিজে এ ধরনের চ্যালেঞ্জ খুব পছন্দ করি। বল মারতে পছন্দ করি। ফলে আমার কিন্তু এমন অবস্থাই সবসময় বেশি ভালো লাগে।
রুম্মন, একটা ব্যাপার একটু বিশেষ করে জানতে চাই। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের একটা ঘটনা...
হা হা হা...। সাকিব ভাইয়ের ফিফটি আর আমার বাউন্ডারিটা?
হ্যাঁ! আপনি বুঝে ফেলেছেন!
হ্যাঁ। আমি জানতাম, কেউ না কেউ এই প্রশ্নটা করবেন।
তাহলে একটু বলেন। ওই বাউন্ডারিটা মেরে অমন অপরাধী-অপরাধী মুখ করলেন। তারপর আবার কতকগুলো বল ইচ্ছে করে রান করলেন না।
আসলে হয়েছিল কী, তখন আমাদের জিততে আর পাঁচ রান লাগত; সাকিব ভাইয়ের ফিফটি হতে দরকার ছিল দুই রান। আমি ভাবলাম, সিঙ্গেল নেব। সাকিব ভাই আরামসে দুই রান নিয়ে ফিফটি করে ফেলতে পারবে। কিন্তু পুশ করলে হয়ে গেল চার। তাই একটু খারাপ লেগেছিল। ভাবলাম, এই ওভারে আর রানই নেব না। ওনাকে ফিফটি করার চান্সটা দেই।
সাকিব ওই প্রান্তে দাঁড়িয়ে কী বলছিল?
না, উনি আমাকে মারতেই বলছিলেন। উনি বলছিলেন, ‘ন্যাচারাল খেল, রান নিয়ে নে।’ কিন্তু আমি ভাবলাম, এত বড় একজন খেলোয়াড়; ওনার একটা ফিফটি আমার কারণে মিস হবে! তাই করলাম আর কী।
আপনার নিজের ফিফটির ইচ্ছে ছিল না?
নাহ। আমার তো তখনও আট রান লাগে। ছয় মারলেও হয় না। তাই চেষ্টা করিনি। আর আমি একটা ব্যাপার বুঝি, টিমমেটের জন্য কিছু করতে হয়। আমাকে কেউ ফোর্স করেনি, কেউ বলেনি, এটা করতে হবে। আমার মনে হয়েছে, আজ আমি এটা করব, কাল অন্য কেউ আমার জন্য করবে। জীবন তো এরকমই।
একটা ফিফটি আছে, দুটো দারুণ চল্লিশের ঘরে ইনিংস আছে। বিশ্বকাপে নিজের কোন ইনিংসটা পছন্দ বেশি?
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ওই ৪২ রানের ইনিংসটা সবচেয়ে ভালো লেগেছে। আর বিশ্বাস করবেন, বাকি ইনিংসগুলোর চেয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৪ রানের ইনিংসটাকে আমি এগিয়ে রাখব। এটা কথার কথা না। আমি ফিফটি বা সেঞ্চুরি করেও যদি ম্যাচ না জেতে দল, তাহলে সেটাকে আমি দাম দেই না। ওর চেয়ে জেতা ম্যাচের এক রানও অনেক বড় ইনিংস।
এটা তো খুব আবেগের কথা। এমনিতে বড় ইনিংস খেলতে ইচ্ছে হয় না? মনে হয় না যে, আরেকটু ওপরে খেললে সেঞ্চুরি, সত্তর-আশি করতে পারতাম?
মনে হয়। সবার এরকম মনে হয়। বড় ইনিংস কার খেলতে ইচ্ছে করে না? আমারও করে। কিন্তু আগে দলের প্রয়োজন। আমার যে ব্যাটিং স্টাইল, তাতে আমাকে এই পজিশনেই বেশি দরকার দলের। আসলে দল তো কারো মনে হওয়ায় চলবে না। দলের কী দরকার, সেটা হলো মূল কথা। দলের এখানে আমাকে দরকার। অন্য জায়গায় কখনো দরকার দলে তখন দেখা যাবে।
রুম্মন, বোলিং নিয়ে একটা কথা। ইদানীং অফস্পিন করছেন। এই আরেকটা বৈচিত্র্যের কারণ কী?
হা হা হা...। আরেকটু ভেরিয়েশন এলো। আসলে লেগস্পিন তো ছাড়িনি। স্বাভাবিক অবস্থায় লেগস্পিনই করি। তবে বাঁহাতি ব্যাটসম্যান পেলে অফস্পিন করি। আসলে নিজেকে যত কার্যকরী করে তোলা যায়, ততই ভালো। যতভাবে দরকার দলের জন্য খেলার চেষ্টা করা আর কী।