পোশাক শিল্পে শ্রমিকের জীবনমান

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০১৫, ১৫:৩৮
তৈরি পোশাক শিল্প হিসেবে মানব সভ্যতার চেয়ে প্রাচীন না হলেও পোশাক আর মানব সভ্যতা প্রায় সমসাময়িক কালের। পূর্বে গাছের পাতা ও পশুর চামড়া শরীরের আবরণ হিসেবে ব্যবহূত হলেও তৈরি পোশাক হচ্ছে সভ্যতার ক্রমাগত উন্নয়নের ফসল। তৈরি পোশাক বিশ্বময় একটি বিকশিত শিল্প আর বাংলাদেশ এক্ষেত্রে রাখছে উল্লেখযোগ্য অবদান। অর্জন করছে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা এবং বেকারত্বের মিছিলে ভূমিকা রাখছে ত্রাণকর্তা হিসেবে।
উল্লেখ্য যে, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে কুটির শিল্পের একক আধিপত্য থাকলেও এ শিল্প বিকশিত হয়ে গড়ে উঠল বৃহত্ শিল্পে। পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন ’বিজিএমইএ’-এর একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৮৪-’৮৫ সালে প্রতিষ্ঠান ছিল ৩৮৪টি এবং কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২০ হাজার। কালের আবর্তে এটি একটি রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আর বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে ২০১৩-১৪ সেশনে অর্জন করে ২৪,৪৯১.৮৮ মার্কিন ডলার; যা কিনা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮১.১৬ শতাংশ। বর্তমানে দেশের মোট পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৫৬০০টি। আর এতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ; কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে- স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও এ খাতে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন এবং আমরণ অনশনের মতো কর্মসূচি দাবি আদায়ের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৪ সালের জুন মাসে স্বীয় পঠিতব্য বিষয় হিসেবে সাভার, আশুলিয়া ও উত্তরার ৪৭টি পোশাক কারখানার ২৫০ জন শ্রমিকের উপর চালানো একটি মাঠকর্ম হতে দেখা যায় যে, তাদের অর্জিত মাসিক বেতন দিয়ে মৌলিক চাহিদাসমূহ যথাযথভাবে পূরণ হয় না।
মূলত বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে আমরা পাই- খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিত্সা ও বিনোদন। মাঠকর্ম হতে দেখা যায় যে, বর্তমানে ৪-৫ জনের একটি শ্রমিক পরিবারে মাসে খাদ্য সামগ্রী বাবদ ৫০০০-৬০০০ টাকা, বাসা ভাড়া বাবদ ২০০০-৩০০০ টাকা, সন্তানদের পড়াশোনা বাবদ ১০০০-১৫০০ টাকা, চিকিত্সা বাবদ ৪০০-৬০০ টাকা, পোশাক সামগ্রী বাবদ ৬০০-৭০০ টাকা খরচ হয়, আর বিনোদনে তেমন খরচ হয় না। এ হিসাব অনুযায়ী একটি পরিবারের ন্যূনতম জীবন-যাপন করার জন্য মোট  খরচ হয় প্রায় ১১,৩০০ টাকা। আর ‘বাংলাদেশ টেক্সটাইল-গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের’ এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৪-৫ জনের একটি পরিবারের কোন রকমে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন ১৩,১০০ টাকা। অন্যদিকে আয়ের হিসেবে মাঠকর্ম দেখায় যে, পরিবারের একক উপার্জনকারী হিসেবে ওভারটাইমসহ পায় ৬০০০-৭০০০ টাকা আর যৌথ উপার্জনকারী হিসেবে ওভারটাইমসহ পায় প্রায় ১২০০০-১৫০০০ টাকা। আর উপরোল্লিখিত ফেডারেশনের মতে বিগত ৩৪ বছরে শ্রমিকের মজুরি কমেছে ৩৪ ডলার, কারণ ১৯৯০ সালে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ছিল ৯০ ডলার অর্থাত্, ৯৩০ টাকা। আর ২০১৫ সালে তা দাঁড়ায় ৬৬ ডলার অর্থাত্, ৫৩০০ টাকা; কিন্তু ফেডারেশনের দাবি হচ্ছে বাংলাদেশের বাজার দরের যুক্তি বাদ দিয়ে শুধু ডলার হিসেবে মজুরি হওয়ার কথা ৭২০০ টাকা; কিন্তু শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা হতে বঞ্চিত। আর ন্যূনতম বেতন ৮০০০ টাকা করার দাবির প্রেক্ষিতে ‘বিজিএমইএ’ ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর ন্যূনতম মজুরি হিসেবে ৫৩০০ টাকা নির্ধারণ করে; যা দিয়ে শ্রমিকদের অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ ছাড়াও মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়াও রয়েছে কারখানায় নিরাপত্তাহীনতার ভয়; ২০১২ সালে তাজরিন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডে ১১১ জন এবং চার মাস পর রানা প্লাজার ভবন ধ্বসে ১১৩৭ জনের মার্মান্তিক মৃত্যু শ্রমিকদের হতবিহ্বল করে দিয়েছে। জীবনের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সর্বাগ্রে হলেও শ্রমিকরা আজো এ বিষয়ে শঙ্কিত। দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতরা এখনো উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পায় নি। তাদের কর্মপরিবেশ, জীবনধারণ এবং মৌলিক চাহিদা এখনো বৈষম্যপূর্ণ।
সর্বোপরি, স্বাধীনতার ৪৪ বছরে এ খাতে উদ্যোক্তা বেড়েছে, শিল্প প্রতিষ্ঠান বেড়েছে, রপ্তানি আয় বেড়েছে এবং শ্রমিকের সংখ্যাও বেড়েছে; কিন্তু শ্রমিকের জীবন-মান বাড়েনি, উন্নত হয়নি তাদের মৌলিক অধিকার। তাই এবারের স্বাধীনতা দিবসের প্রত্যয় হোক- শ্রমিকের জীবনমানের উন্নয়ন।
n লেখক :শিক্ষার্থী, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল:[email protected]