ভাঙছে একান্নবর্তী পরিবার শিথিল হচ্ছে বন্ধন

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৯, ০৩:১৮

কালের অতলে হারিয়ে যাচ্ছে একান্নবর্তী সংসার! যা ছিল বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে। এখন সমাজের আকাশে যৌথ পরিবার নামক দুই-একটা নক্ষত্রের দেখা মিললেও সেখানে মিলছে না প্রাণবন্ত আবেগ আর ভালোবাসার নিবিড় বন্ধন। একক পরিবারের কালছায়ায় গড়ে উঠছে স্বার্থপর ও হতাশাগ্রস্ত এক সমাজ। বাড়ির ভেতর সুখের ওড়াউড়ি নেই। শহরে দুরন্ত শৈশব আটকে পড়েছে বারান্দার গ্রিলে। সমাজ গবেষকরা বলছেন, দেশের গ্রামাঞ্চলগুলোতে মাত্র ১০ ভাগের কম যৌথ পরিবার টিকে আছে কোনো মতে। আর কসমোপলিটন শহুরে জীবনে একান্নবর্তী পরিবার এখন আর চোখেই পড়ে না। ফলে যান্ত্রিক হয়ে গেছে পরিবার ও আত্মীয়তার বন্ধন। উত্সবের বাড়ি বা শোকের বাড়ি ছাড়া কারো দেখা-সাক্ষাত্ও হয় না। আবার দেখা হলেও সেখানে ‘কেমন আছো’- জাতীয় কথাবার্তায়ই শেষ হয়ে যাচ্ছে কুশল বিনিময়।

অথচ অতীতের একান্নবর্তী পরিবারের চিত্র ছিল ভিন্ন, সে যেন এক গল্পকথা। গল্পের প্রধান চরিত্রে থাকতেন দাদা, যিনি হতেন পরিবারের কর্তা এবং তিনি বটবৃক্ষের মতো পুরো পরিবারকে ছায়া দিয়ে রাখতেন। আগলে রাখতেন ঝড়-ঝাপটা থেকে। সংসারের সকল সিদ্ধান্ত তিনিই নিতেন এবং তার সিদ্ধান্তেই সংসার পরিচালিত হতো। এই কর্তার স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনি ছিলেন গল্পের অন্যান্য চরিত্র। সমাজের প্রথা অনুযায়ী কর্তা বাড়ির মেয়ে বিয়ে দিয়ে অন্য সংসারে পাঠাতেন আর ছেলে বিয়ে দিয়ে ছেলের বউ নিজ সংসারে আনতেন। কর্তার স্ত্রী অর্থাত্ দাদি ছিলেন সংসারের কর্ত্রী। সংসার দেখাশোনা ও রান্নাবান্নার দায়িত্ব ছিল ছেলের বউদের। নাতি-নাতনিরা দাদির কাছেই বড় হতো। দাদি ছিল তাদের গল্পবুড়ি। মজার মজার ভূতের গল্প, রাক্ষস আর খোক্ষসের গল্প দাদির কাছে শুনেই বড় হতো এই যৌথ পরিবারের সন্তানেরা। প্রতিটি পরিবার ছিল ভালোবাসার সুতোয় গাঁথা। তবে এগুলো সবই এখন রূপকথা। ধীরে ধীরে সেই বটবৃক্ষের ছায়া থেকে অনেক দূরে সরে গেছে পারিবারিক জীবন। কবি পূর্নেন্দু পত্রীর ভাষায়:‘একান্নবর্তীর দীর্ঘ দালান-বারান্দা ছেঁড়া কাগজের কুচি হয়ে গেল..’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড.ফাতেমা রেজিনা ইত্তেফাককে বলেন, একান্নবর্তী পরিবার ছিন্ন জীবন সংসার এখন পাখির বাসার মতো। একটি-দুটি ছোট ঘর, ছোট সংসার, ছোট পরিবার; যেখানে বসবাস করে কেবলমাত্র মা-বাবা আর তাদের এক বা দুটি ছেলে-মেয়ে। যেখানে নেই তেমন আনন্দ; সবই যন্ত্রের মতো, নিরানন্দ, নিঃসঙ্গ। পূর্বের সেই একান্নবর্তী পরিবারে যারা কর্তা-কর্ত্রীর ভূমিকা পালন করতেন, বর্তমান একক পরিবারে তাদের উপস্থিতি মেহমান হিসেবেই গণ্য করা হয়; ঠিক যেন বাইরের লোক। ফলে তারা যে পরিবারের সদস্য সেটা শিশুরা জানছেই না, ওদের মধ্যে দাদা-দাদি, চাচা-ফুফিদের প্রতি কোনো ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ বা সহনশীলতা গড়ে উঠছে না। এই না জানার মূলে রয়েছে ওদের বাবা-মা।

ড. ফাতেমা আরো বলেন, এই সময়ের পরিবারের সন্তানগুলো বৈবাহিক সম্পর্কে জড়ানোর অল্পকিছু দিনের মধ্যেই তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বামী-স্ত্রী দুইজনের একক পরিবার গড়ে তুলছে; বাদ যাচ্ছে না পরিবারের একমাত্র ছেলেটিও। বৃদ্ধ বাবা-মাকে ছেড়ে নিজেরা আলাদা থাকতেই আজ তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। যার ফলশ্রুতিই বৃদ্ধাশ্রম। এছাড়াও বর্তমান সমাজে যে অসহযোগিতার চর্চা দেখা যাচ্ছে তার জন্যও খানিকটা এই একক পরিবারব্যবস্থা দায়ী।

এই সমাজ বিজ্ঞানীর মতে, একান্নবর্তী পরিবার আর সমাজে ধরে রাখা সম্ভব না। তবে আমরা চেষ্টা করতে পারি। যেমন জাপানে একান্নবর্তী বা যৌথ পরিবারের সংখ্যা বেশি। সেখানে তো বিশ্বায়নের প্রভাব আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। তারপরও তারা এটা ধরে রেখেছে এবং এর সুফলও ভোগ করছে। সেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে যৌথ পরিবার ধরে রাখার জন্য উত্সাহিত করা হচ্ছে। আমরাও তাদের অনুসরণ করতে পারি।

সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিজিটাল সময় যেন সবকিছুকেই ডিজিটালাইজড করে দিচ্ছে ক্রমাগত। পরিবার, সম্পর্ক, হূদ্যতা চলে এসেছে হাতের মুঠোয়, মোবাইল ফোনের মনিটরে। পরিবারকেন্দ্রিক যে সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের ঝরনায় ছিল বাঙালি সিক্ত, সেখানে জমেছে যেন বিচ্ছিন্নতার গল্পহীন ধূলোর আস্তরণ। আবেগের পলেস্তরাগুলো ক্রমশ উঠে যেতে বসেছে। পড়ে আছে চুনকামহীন একান্নবর্তী পরিবারের সেই মর্মছোয়া বিমর্ষ অনুভূতি। নাগরিক জীবনে বহুকাল ধরে জীবন এখন একচিলতে বারান্দা, একরত্তি জানালা আর মুক্ত আকাশবিহীন আচ্ছাদনের ঘেরাটোপে আবৃত হয়ে আছে। পারিবারিক সম্পর্কের স্বপ্ন এখানে ধূলো জমা পিয়ানো, গিটার, ভায়োলিন, সেতার, এস্রাজ, তানপুরা-হারমোনিয়ামের অবয়বের মতো অবরুদ্ধ। এখন ‘সেলফ ফ্যামিলি ম্যানারিজম’ সবাইকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। শহুরে নতুন প্রজন্ম প্রকৃতির অপূর্বময়তার সংস্পর্শ থেকে আজ বঞ্চিত। সবমিলিয়ে পরিবর্তিত সমাজ ব্যবস্থায় সংকটে পড়ছে ছোট পরিবারগুলো!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, আধুনিক শিক্ষার প্রভাব, নগরায়ণ ও শিল্পায়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ফলে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে একক পরিবার হচ্ছে। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে এই সামাজিক পরিবর্তনকে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি প্রয়োজন। নতুবা মানুষের আন্তরিকতা এবং সম্প্রীতি দিন দিন কমতেই থাকবে। তিনি বলেন, মূলত স্বাধীনতার পর থেকে ভাঙতে থাকে একান্নবর্তী পরিবারগুলো।

বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, দিন দিন যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে যাওয়ায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আন্তরিকতা, মমতা, স্নেহ ও ভালোবাসা কমে আসছে। যৌথ পরিবারের সদস্যরা কখনোই একাকিত্বে ভোগে না। তাদের সুখ-দুঃখ-হাসি-কান্না ভাগাভাগি করার অনেক মানুষ থাকে। এ ছাড়া যেকোনো দুর্ঘটনায় মানসিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন অতি সহজেই তারা পরিবারের অপর সদস্যদের কাছ থেকে পেয়ে থাকে। এ জন্য ওদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে।

আরও পড়ুন: আরও দুদিন বাড়লো বইমেলা

কোনো কোানা সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিশ্লেষক জানান, একাধিক কারণে গ্রামাঞ্চলে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। আধুনিক শিক্ষার প্রভাব, নগরায়ণ ও শিল্পায়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ, অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতির বিকাশের প্রভাব ছাড়াও বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্ব, ননদ-ভাবির দ্বন্দ্ব, একা থাকার প্রবণতা ও আত্মকেন্দ্রিকতাও এর জন্য দায়ী। তারা জানান, যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ায় পারিবারিক অশান্তি, কলহ, বিবাদ ও অবিশ্বাসের ঘটনা বাড়ছে।

ইত্তেফাক/আরকেজি