কুমিল্লার বাসা থেকে রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি হানাদাররা যখন পুত্র দিলীপ দত্তসহ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে তুলে নিয়ে যায় তখন তিনি অশীতিপর বৃদ্ধ। বয়স ৮৫। শরীর ন্যুব্জ। কিন্তু মেরুদণ্ড ইস্পাতের মতো দৃঢ়। শির উন্নত। দিনটি ছিল ২৯ মার্চ ১৯৭১। তারপর তাঁরা আর ফিরে আসেননি। এমনকী পাওয়া যায়নি তাঁর দেহাবশেষও। পরে আমরা জেনেছি যে, ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল।
মাতৃভাষা, মাতৃভূমি ও মাতৃভূমির মানুষের প্রতি প্রবল ভালবাসা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের চরিত্রের একটি উজ্জ্বলতম দিক। এর জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু এ-নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ বা অনুশোচনা ছিল না। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময়ে তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার ব্যবস্থাপক পরিষদের ডেপুটি লিডার। ছিলেন কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতাদের একজন। তখন দেশত্যাগ করে ভারতে চলে গেলে উচ্চপদে আসীন হতে পারতেন, পেতেন উপযুক্ত সম্মান ও স্বীকৃতি। অন্যদিকে, ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান যে তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবাবিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে—তা তিনি জানতেন। তা সত্ত্বেও পাকিস্তানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পরেও তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের অনেকেই দেশ ছেড়ে গেছেন প্রাণভয়ে। তখনও তিনি দেশত্যাগের কথা একবারও ভাবেননি। বরং বরাবরের মতোই ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রশ্নকে ছাপিয়ে উঠেছে তাঁর দেশপ্রেম ও কর্তব্যবোধ। একাত্তরের ২৫ মার্চের গণহত্যাযজ্ঞের পর যখন দলে দলে লোক দেশ ছেড়ে যাচ্ছে, তখনও তিনি দেশত্যাগে সম্মত হননি একই কারণে। বরং সপুত্র জীবন দিয়েই মাতৃভূমি ও মাতৃভূমির মানুষের প্রতি তাঁর ভালবাসা ও কর্তব্যবোধের অনবদ্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তিনি।
মহত্ত্বের তপস্যায় সমর্পিত সত্যিকারের একজন বড়ো মাপের মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর বড়ো হয়ে ওঠার কাহিনীটিও পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অতি সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম। মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত এখানেই লেখাপড়া করেছেন। প্রবেশিকা পাস করার পর কলকাতার রিপন কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। কলকাতায় অবস্থানকালে তিনি শুধু ভারতবর্ষের স্বাধীনতার মন্ত্রেই উদ্বুদ্ধ হননি, সেই স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন সক্রিয়ভাবে। নিয়মতান্ত্রিক পথে যে দেশকে স্বাধীন করা যাবে না তা নিয়ে তাঁর মধ্যে দ্বিধা ছিল না। কিন্তু প্রবল প্ররোচণা সত্ত্বেও অনিয়মতান্ত্রিক পথে পা বাড়াননি। যোগ দেননি উগ্রপন্থীদের দলে। তিনি বেছে নিয়েছিলেন ‘নরমপন্থী’ সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অহিংসার নীতিতে বিশ্বাসী মহাত্মা গান্ধীর পথ।
জওহরলাল নেহরুর মতো পারিবারিক ঐতিহ্য কিংবা মহাত্মা গান্ধীর মতো পেশাগত খ্যাতি কোনোটাই তাঁর ছিল না। বলা যায়, একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছিল তাঁকে। কুমিল্লা পৌরসভা থেকে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভা পর্যন্ত যতো নির্বাচনে তিনি অংশ নিয়েছেন—নানা ধরনের প্রতিকূলতা সত্ত্বেও—একটি ছাড়া সব নির্বাচনেই তিনি জয়ী হয়েছেন। অবিভক্ত ভারতে ও পাকিস্তানে একাধিকবার আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। মন্ত্রী ছিলেন। পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য হিসেবে শাসনতন্ত্র প্রণয়নসহ পালন করেছেন বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে সমাজের তলা থেকে চূড়ায় উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু এই যে উত্তরণ সেখানে কোনো উল্লম্ফন নেই। নেই কোনো প্রকার শঠতা, চাতুর্য কিংবা চাটুকারিতার পৃষ্ঠপোষকতা। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে পা রেখে তাঁকে উঠে আসতে হয়েছে। উত্তীর্ণ হতে হয়েছে একের পর এক অগ্নিপরীক্ষায়। স্বীকার করতে হয়েছে অপরিসীম ত্যাগ। শুধু ব্রিটিশ শাসনামলেই তাঁকে পাঁচবার কারাবরণ করতে হয়েছে। পরিতাপের বিষয় হলো, যে স্বাধীনতার জন্যে তিনি এতো ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সেই স্বাধীন পাকিস্তানেও বিনা বিচারে জেল খাটতে হয়েছে তাঁকে। শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আমৃত্যু তাঁকে বহন করতে হয়েছে লাঞ্ছনা আর অপমানের দুর্বহ যন্ত্রণা। কিন্তু দেশের জন্যে শুধু যে হাসিমুখে সব দুঃখ বরণ করে নিয়েছেন তাই নয়, নিজের জীবনও উত্সর্গ করে গেছেন স্বদেশের স্বাধীনতার বেদিমূলে।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মৃত্যু সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর ভারতীয় পার্লামেন্টে গৃহীত এক শোকপ্রস্তাবে বলা হয়েছিল যে, তিনি এমন একজন নেতা যাঁকে নিয়ে যে-কোনো জাতি গর্ব করতে পারে। কথাটি একটুও অতিরঞ্জিত নয়। পরাধীন ভারতবাসীর স্বাধীনতার জন্যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। লড়েছেন পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধেও। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো কাটিয়ে দিয়েছেন কারার অন্তরালে। সাধারণ পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তিনি যে সর্বভারতীয় নেতাদের সারিতে ঠাঁই করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন—সেটা সম্ভব হয়েছিল তাঁর অতুলনীয় ত্যাগ, নিষ্ঠা ও অনাড়ম্বর জীবনাদর্শের কারণে। ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্যে পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি যে অসামান্য যুক্তি তুলে ধরেছিলেন তা আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। মূলত তাঁর এ প্রস্তাবকে কেন্দ্র করেই বায়ান্নের সেই মহাবিস্ফোরণের ক্ষণ গণনা শুরু হয়ে যায়। তবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যদি সেদিন এ প্রস্তাব উত্থাপন নাও করতেন—তবু নির্লোভ, নিরহঙ্কার ও অসামান্য মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি আমাদের কাছে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকতেন।
n লেখক: কবি, সাংবাদিক
