ইরান-ছয় জাতি আলোচনা

পরমাণু চুক্তি হবে তো

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৫, ১৩:২৫
 
পরমাণু কর্মসূচি থেকে ইরানকে বিরত রাখতে সুইস নগরী লসানেতে চলছে ছয় জাতির জোর আলোচনা। চুক্তিতে পৌঁছার সময়সীমা শেষ হবার আগ মুহূর্তে ঐ আলোচনা নিয়ে বিরাজ করছে টানটান উত্তেজনা। চলতি মাসের মধ্যেই সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে তাদের। আর চলতি মাসের বাকি মাত্র ১ দিন। ইরানের সাথে এই সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। তবে কোন্ পক্ষ আলোচনার সঞ্চালক হবে, সেটা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ন্যায্য অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে এতটুকু ছাড় দেয়ার মানসিকতা নেই ইরানের। তেহরান মনে করে, আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের অংশ হিসেবে উপযুক্ত মর্যাদা তার প্রাপ্য। আর আলোচনার প্রতিপক্ষ ছয় বিশ্বশক্তি চায়, যেভাবেই হোক ইরানের পরমাণু কর্মসূচি থামাতে হবে। কারণ পশ্চিমা দেশগুলোর সন্দেহ, গোপনে পরমাণু অস্ত্র বানানোর চেষ্টা করছে তেহরান। এ কারণে চুক্তি করার ক্ষেত্রে ছয় জাতির আগ্রহই বেশি। বিনিময়ে ইরানের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা বলছেন তারা। নানামুখী দেন দরবার শেষ করে রাজনৈতিক এই চুক্তির ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির সময়সীমা আগামীকাল। আর আগামী ৩০ জুনের মধ্যে স্বাক্ষরিত হবে চূড়ান্ত চুক্তি।
জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্র্যাঙ্ক ওয়াল্টার স্টেইনমেয়ার এরই মধ্যে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ইরানের সাথে প্রায় ১২ বছর ধরে আলোচনা হয়েছে। ৩১ মার্চের মধ্যে যে কয়েক মুহূর্ত সময় বাকি আছে, তা আলোচনার জন্য নয়, বরং সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ অবশ্য অগ্রগতির ব্যাপারে ব্যাপক আশাবাদী। সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সাথে প্রাথমিক আলোচনাও সেরে ফেলেছেন তিনি। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্র্যাঙ্ক ওয়াল্টার স্টেইনমেয়ার এবং ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট ফেবিয়াসের সাথে বৈঠকের পর ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ জানান, সংকটের সবদিক নিয়েই আলোচনা হয়েছে। এখন চলছে লেখালেখির কাজ, যা হবে চূড়ান্ত চুক্তি। তবে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফেবিয়াস বলছেন অন্য কথা। ছয় জাতির পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট বিষয়ে অগ্রগতি হলেও ইরানের দিক থেকে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। বিবিসি জানিয়েছে, সবচেয়ে স্পর্শকাতর কয়েকটি বিষয়ে এখনও কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি নেতারা।
বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- তেহরানের উপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পরিমাণ, সম্ভাব্য চুক্তির মেয়াদ এবং ইরানের পরমাণু স্থাপনা পর্যবেক্ষণের পরিধি। সিএনএন বলছে, পশ্চিমা শক্তি এমন কিছু বিষয়ে আলোচনা করছেন, যা নিয়ে সমাধান না হলে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে সম্ভাব্য চুক্তিটি। মার্কিন কূটনীতিকদের বরাত দিয়ে তারা বলছে, আলোচনার জটিল পর্যায়ে আছে দুই পক্ষই। তবে চুক্তিতে আসতে ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো। শুক্রবার টেলিফোনে কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল। পরে তারা এক বিবৃতিতে জানান, বল এখন ইরানের কোর্টে। বাড়তি সমস্যার সমাধানে ইরানকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ইরানের রয়েছে অন্তত তিনটি ইউরেনিয়াম খনি। এগুলো হলো- সাঘাঁদ, ইয়াজ্দ ও গাচিন। এসব ইউরেনিয়াম খনির উপর নির্ভর করে আরাক, ফর্দো, নাতাঁজ, ইস্পাহান ও বুশেহের এলাকায় ইরান গড়ে তুলেছে পরমাণু স্থাপনা। সেখানে কি হচ্ছে সে ব্যাপারে তেমন একটা তথ্য নেই বিশ্ববাসীর কাছে। তবে পরমাণু গবেষণা চুল্লি রয়েছে তেহরান, রামসার ও বোনাব এলাকায়। পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে আশঙ্কার কারণ অবশ্য অন্যখানে। সেটা হলো ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি পারচিনের ভৌগোলিক অবস্থান। পারচিন সামরিক ঘাঁটির সবচেয়ে কাছাকাছি রয়েছে তেহরান, ফর্দো ও নাতাঁজ পরমাণু স্থাপনা। আণবিক বোমা তৈরিতে সহজ সুযোগ ও সক্ষমতা দুই-ই রয়েছে ইরানি বৈজ্ঞানিকদের। এ কারণেই বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তেহরানের আশ্বাস বাণীর উপর ভরসা নেই পশ্চিমা বিশ্বের। ২০০২ সালেই প্রথম আলোচনায় আসে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। তত্কালীন সরকার বিরোধী একটি গ্রুপ ইরানের এই গোপন তথ্য ফাঁস করে। তাতে বেরিয়ে আসে দেশটির ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার একটি কারখানা এবং এক ভারি জলীয় চুল্লিসহ বেশ কিছু গোপন কর্মসূচির খবর। পরমাণু বোমা তৈরি করতে এমন দু’টি কারখানাই যথেষ্ট। এরপরই ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও সন্দেহ-সংশয় জোরদার হতে থাকে। অনেক চেষ্টা তদবির করেও সেই সন্দেহ-সংশয় দূর করতে পারেনি আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা-আইএইএ। যু্ক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ২০০৩ সালে পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি নিয়েছিলো ইরান। যা ফাঁস হবার পরই তা থেকে সরে আসেন তেহরানের নেতারা। ইরান পরমাণু বিস্ফোরক তৈরি করছে, ২০১১ সালে এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে দাবি করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আইএইএ। এরপর ২০১২ সাল থেকে শুরু হয় ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা জারি।
যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্র দেশগুলোর সন্দেহ-সংশয়ের বিপরীতে তেহরান বলছে, বেসামরিক ও সাধারণ মানুষের স্বার্থে পরমাণু কর্মসূচির আইনগত অধিকার রয়েছে ইরানের। ইরানের দাবিই যদি সত্য হয়, তবে তা পর্যবেক্ষণ করতে দিতে বাধা কোথায়।