যেভাবে হত্যা করা হয় ব্লগার ওয়াশিকুরকে

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৫, ২২:৫৯
 
জঙ্গি গ্রুপের হাতে লেখক ও ব্লগার ড. অভিজিৎ রায় হত্যার এক মাসের ব্যবধানে আরো একজন ব্লগারকে হত্যা করা হলো। জঙ্গিদের হাতে খুন হওয়া চতুর্থ ব্লগার হলো ওয়াশিকুর রহমান বাবু (২৬)। সোমবার সকালে তেজগাঁওয়ের দক্ষিণ বেগুনবাড়ি এলাকায় প্রকাশ্যে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে বাবুকে হত্যা করা হয়। এসময় কয়েকজন হিজরা হামলাকারীদের ধাওয়া করে দুই ঘাতককে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।
 
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশের হেফাজতে থাকা গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে জিকির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানিয়েছে, নরসিংদীর রায়পুরা থানার গজারিয়াকান্দি গ্রামে তার বাড়ি। তারা বাবার নাম মইনুদ্দিন। গত রমজান মাসে নরসিংদী থেকে চট্টগ্রামে ট্রেনে যাওয়ার সময় মাসুম নামে একজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। মাসুম অত্যন্ত ধার্মিক ব্যক্তি। ইসলাম ধর্ম নিয়ে তিনি গবেষণা করেন। ট্রেনে পরিচয়ের সময় তার সঙ্গে ধর্ম নিয়ে বিভিন্ন কথোপথন হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে তার সঙ্গে সে দেখা করত। ধর্ম নিয়ে তাদের মধ্যে অনেক অলোচনা হতো। মাসুমের সঙ্গে দেখা করার জন্য সে শনিবার ট্রেনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসে। যাত্রবাড়ী এলাকার একটি মসজিদে তার এক আত্মীয়র কাছে সে ঐ রাত কাটায়। রবিবার বিকালে হাতিরঝিলে মাসুমের সঙ্গে দেখা করে। ঐ সময় আরিফ ও তাহের নামে দুই ব্যক্তি তাদের আলোচনায় অংশ নেয়। ঐ দুই ব্যক্তিও ধার্মিক প্রকৃতির।
 
মাসুম সেখানে একটি ছবি দেখিয়ে জানায় যে, এই ব্যক্তি ইসলাম ও নবী সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে কটুক্তি করে। একে হত্যা করা আমাদের ফরয কাজ। ঐ মাসুম তার ব্যাগ থেকে তিনটি চাপাতি তাদেরকে দেয়। এই চাপাতি দিয়ে ঐ ব্যক্তিকে হত্যা করতে হবে।
 
কথা মতো মাসুম তাদেরকে নিয়ে দক্ষিণ বেগুনবাড়ির বিসমিল্লাহ ভিলার সামনে যায়। ঐ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মাসুম দেখিয়ে দেয় যে কিভাবে ঐ ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে।
 
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত অপরজন আরিফ জানান, তার বাবার নাম তাজুল ইসলাম। কুমিল্লার তিতাস থানার বারকাউনিয়া গ্রামে তাদের বাড়ি।
 
মিরপুরে দারুল উলুম মাদ্রাসায় পড়াশুনার সময় দেড় মাস আগে মাসুমের সঙ্গে পরিচয়। মাসুম বিভিণ্ন সময়ে তাকে ইসলাম নিয়ে যারা কটুক্তি করতো তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দিতো। তবে  সে মানসিকভাবে দুর্বল চিত্তের ছিল বলে হত্যায় সে চাপাতি ব্যবহার করতে পারবে না বলে জানিয়েছিল।
 
এজন্য মাসুম তাকে জানায় যে, এই অপারেশনে থেকে সাহস যোগাতে হবে। এই অপারেশন সফল হলে তার নেতৃত্বে আরো একটি বড় অপারেশন পরিচালনা করা হবে।
 
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, বাবু মতিঝিলে অফিসে যাওয়ার জন্য দক্ষিণ বেগুনবাড়ির বিসমিল্লাহ মঞ্জিল বাড়ি থেকে সকাল সাড়ে ৯ টায় বের হন।  এর আগে সকাল ৭ টার দিকে বাবুর বাবা টিপু সুলতান লক্ষ্মীপুরের বাড়ি রওনা দেন।
 
বাবু বাসা থেকে বেরিয়ে দিপীকার মোড়ের ঢালে পৌঁছালে হঠাত্ করে তিন যুবক তাকে ঘিরে ধরে চাপাতি দিয়ে কোপাতে থাকে।
প্রত্যক্ষদর্শী দোকানি জিয়াউদ্দিন জানান, সকালে হঠাত্ নারীকণ্ঠে চিত্কার শুনে তিনি ও দোকানে থাকা কয়েকজন খদ্দের বেরিয়ে এসে দেখেন, রক্তাক্ত অবস্থায় একজন রাস্তায় পড়ে আছেন এবং তা দেখে এক নারী চিত্কার করছেন। আর তিন যুবক দৌড়ে মূল রাস্তার দিকে পালানোর চেষ্টা করছে।
 
এ সময় কয়েকজন হিজড়া দুইজনকে জাপটে ধরে। এর সাথে সাথে স্থানীয় বাসিন্দারা দৌড়ে গিয়ে ঐ দুইজনকে আটক করে। পরে পুলিশ আসলে তাদের কাছে সোপর্দ করে।
 
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার এএসআই হুমায়ূন কবির তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যালে নিলে সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে চিকিত্সকরা বাবুকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে রাখে পুলিশ। 
 
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ঘটনাস্থলের এক পাশে টেক্সটাইল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকার প্রাচীর। অন্যপাশে অরেকটি ভবন। প্রায় দশ ফুট চওড়া রাস্তার ঠিক ঐ অংশে কোনো দোকান নেই। ঘটনার সময় ঐ রাস্তায় লোকজনও খুব একটা ছিল না বলে জানিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীরা।
 
ওয়াশিকুরের বাসা থেকে ঘটনাস্থল পৌছাতে প্রায় ৫০ গজের মত পথ হাঁটতে হয়। ঘটনাস্থল থেকে ২০ গজ দূরে একটি মুদি দোকান ও একটি ফার্মেসি রয়েছে।
 
এদিকে হত্যার খবর শুনে ঢাকা মেডিক্যালে ছুটে যান তার চাচাতো বোন শিল্পী। তিনি জানান, বাবুর মা রেহানা বেগম ও বোন শিমু আক্তার গ্রামের বাড়িতে বাস করেন। বেগুনবাড়িতে বাবার সাথে বাস করত বাবু। সোমবার সকালে তার বাবা তাকে বাসায় রেখে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলেন। পরে ছেলে হত্যার খবর পেয়ে পথ থেকে ফিরে আসেন।
 
অন্যদিকে, সোমবার সন্ধ্যায় বাবুর লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগের ডা. একেএম শফিউজ্জামান জানান, লাশের কপালে, চোখের নিচে, থুতনিতে ও মাথার পিছনে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। এরমধ্যে ৪টি মারাত্মক ও একটি হালকা আঘাত। ঐসব আঘাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানান তিনি।