তারা ভরা উত্তর নিষ্প্রভ দক্ষিণ

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০১৫, ০০:০৮

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তুলনামূলক চিত্রে দক্ষিণের চেয়ে উত্তরে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন মূলত এক ঝাঁক ‘তারকা’। উত্তরে মেয়র পদে মনোনয়নপত্র দাখিলকারী ২১ জনের মধ্যে অন্তত ৮ জনের কেউ ব্যবসা অঙ্গনে, কেউ অভিনয় শিল্পে, কেউ টেলিভিশন মিডিয়ায়, কেউ উত্তরাধিকারের রাজনীতিতে একরকম তারকা। কেউ আবার দেশের আলোচিত রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান, কেউ শীর্ষস্থানীয় আলোচিত ব্যবসায়ীর পুত্র। কারো কারো আবার রাজনীতি ও টিভি মিডিয়া- দুই অঙ্গনেই পরিচিতি রয়েছে। দুই-একজন এমনও আছেন, যাদের ব্যবসা ও রাজনীতি দুই ময়দানেই সমান বিচরণ।

তবে উত্তরের এই তারকাদের কারা শেষ পর্যন্ত মাঠের মূল লড়াইয়ে থাকছেন, তা দেখা যাবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের পর। তখনই বোঝা যাবে- উত্তরে খেলাটি কী ‘তারকা ব্যবসায়ী বনাম তারকা ব্যবসায়ী’, ‘তারকা ব্যবসায়ী বনাম অভিনয় তারকা’ নাকি ‘তারকা ব্যবসায়ী বনাম আলোচিত পরিবারের উত্তরাধিকারী’র মধ্যে হতে যাচ্ছে। তারকা ব্যবসায়ী, অভিনয় জগতের তারকা ও আলোচিত পরিবারের সন্তানের মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিযোগিতাও দেখা যেতে পারে।
অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ২৬ জন। এদের মধ্যে কেউ আছেন দেশের শীর্ষ ও তারকা রাজনীতিক, কেউ প্রাক্তন তারকা রাজনীতিকের পুত্র। আবার কেউ আছেন নানা কারণে আলোচিত। তবে তারকা খেলোড়ায়ের সংখ্যার দিক বিবেচনায় উত্তরের তুলনায় দক্ষিণ অনেকটাই নিষ্প্রভ। এখানেও শেষ পর্যন্ত খেলার মাঠে কারা প্রতিযোগিতা করবেন, সেটি বোঝা যাবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন, অর্থাত্ আগামী ৯ এপ্রিল শেষ বেলায়।
উত্তরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আনিসুল হক। তার মূল পরিচিতি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে। তিনি ব্যবসায়ীদের দুইটি শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই ও বিজিএমইএ-এর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট। টিভি অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবেও তিনি একসময় সাড়া ফেলেন। এখানে বিএনপিসহ ২০ দল সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন এফবিসিসিআইয়ের আরেক প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল আউয়াল মিন্টু। ব্যবসার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ-বিএনপির রাজনীতিতেও তার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ বিচরণ অন্তত  দুই দশক ধরে। বর্তমানে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ছাড়াও ঢাকা মহানগর বিএনপির এক নম্বর যুগ্ম-আহ্বায়ক। কোনো কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হলে যেন বিকল্প প্রার্থী থাকে, সেই আগাম প্রস্তুতি হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন মিন্টুপুত্র তাবিথ আউয়ালও। কখনো রাজনীতি না করা তাবিথ পিতার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
ঢাকা উত্তরে মেয়র পদে ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’ হিসেবে লড়তে চান বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তীতুল্য অভিনয় শিল্পী সারাহ্ বেগম কবরী। যিনি চলচ্চিত্র অঙ্গনে ‘কবরী সারোয়ার’ হিসেবেই মূলত পরিচিত। ‘মিষ্টি মেয়ে কবরী’ হিসেবেও চলচ্চিত্র জগতে যার আলাদা পরিচিতি আছে। এছাড়াও নবম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্যও ছিলেন তিনি। জাসদ সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে এখানে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন জনপ্রিয় নাট্যাভিনেতা নাদের চৌধুরী।
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব অধ্যাপক এ.কিউ.এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পুত্র এবং বিকল্পধারা বাংলাদেশের যুগ্ম-মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরীও উত্তরে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এক সময়ের প্রখ্যাত রাজনীতিক কফিল উদ্দিন চৌধুরীর নাতি মাহী রাজনীতির পাশাপাশি টেলিভিশন মিডিয়ায়ও কাজ করেছেন। একাধিক জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের নির্মাতা ও উপস্থাপক ছিলেন তিনি। জাতীয় সংসদের সদস্যও ছিলেন। এই সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে প্রতিযোগিতা করতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন দেশের আলোচিত ধনকুবের মূসা বিন শমসেরের পুত্র ববি হাজ্জাজ। নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ববি কয়েক বছর ধরে যুক্ত ছিলেন এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টির (জাপা) সঙ্গে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা ঘোষণা করায় তার সঙ্গে দলীয় সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন জাপা চেয়ারম্যান এরশাদ। এছাড়াও এখানে মেয়র পদে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন বিএনপির একসময়ের শীর্ষস্থানীয় নেতা চৌধুরী তানভীর আহম্মেদ সিদ্দিকীর ছেলে চৌধুরী ইরাদ আহম্মেদ সিদ্দিকী। এর আগে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য খালেদা জিয়া সম্পর্কে কিছু বক্তব্য দেয়ার কারণে আলোচনায় এসেছিলেন ইরাদ। ছেলের ওই বক্তব্যের কারণে বিএনপি থেকে ছিটকে পড়েন তানভীর সিদ্দিকী।

অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণে এতসংখ্যক ‘তারকা’ না থাকলেও রয়েছেন দেশের একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস। এখানে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন সাঈদ খোকন। তিনি ঢাকার সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের প্রাক্তন তারকা রাজনীতিক মোহাম্মদ হানিফের পুত্র। আছেন নবম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে থাকা গোলাম মাওলা রনি। এমপি থাকাকালেই বিভিন্ন সময় টিভি টকশোতে নিজ দলেরও সমালোচনা করে ভিন্নরকম আলোচনায় আসেন তিনি। বিশেষ করে, এমপি থাকাবস্থায় নিজের কার্যালয়ে একজন সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় রনি ব্যাপক সমালোচিত হন। ওই ঘটনায় তিনি এক মাসেরও বেশি সময় কারাগারেও থাকেন। এছাড়াও দক্ষিণে মেয়র পদে মনোনয়ন দাখিল করেছেন কারাবন্দী আলোচিত রাজনীতিক, বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু। আছেন বিএনপির অর্থ বিষয়ক সম্পাদক আবদুস সালাম ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এসএম আসাদুজ্জামান রিপনও।