ক্ষমা চাননি বলেই এতোদূর

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৫, ১৫:৩৯

ক্রিকেট দল কোথাও থেকে ফিরছে না, কোথাও যাচ্ছেও না। তারপরও সকাল থেকে তাদের মুখচেনা ক্রীড়া সাংবাদিকরা ভিড় করতে শুরু করেছেন। এক কর্মকর্তা জিজ্ঞেসই করে ফেললেন—ভাই বিদেশি কোনো তারকা আসছেন নাকি?

না, বিদেশি তারকা নন; এলেন একেবারে খাঁটি বাংলাদেশি মানুষ আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় এই মন্ত্রী বিমানবন্দরে পা রাখলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সভাপতি হিসেবে। কিন্তু সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনের কয়েক মিনিট পরই বলে দিলেন, এখন থেকে তিনি আইসিসির ‘সাবেক’ সভাপতি।
নয় মাস সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর কিছু ‘নোংরা’ কর্মকর্তার আচরণের প্রতিবাদে এবং সংবিধান লংঘন করে তাকে উপেক্ষা করার প্রতিবাদে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থার আলঙ্কারিক সর্বোচ্চ পদটি ছেড়ে দিলেন মুস্তফা কামাল।
পদত্যাগ করা উপলক্ষে আনুষ্ঠানিক এক বিবৃতি পড়ে শোনানোর পাশাপাশি দীর্ঘক্ষণ ধরে আইসিসির অন্যায়, গত কয়েক দিনের ঘটনা, নিজের অবস্থান নিয়ে কথা বললেন মুস্তফা কামাল। এর মধ্যে একবারও নাম উচ্চারণ করলেন না আইসিসির বর্তমান চেয়ারম্যান ও মুস্তফা কামালের মূল প্রতিপক্ষ এন শ্রীনিবাসনের। নানা রকম নেতিবাচক বিশেষণ দিয়ে চিহ্নিত করে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, কে ছিলেন আসল কালপ্রিট।
বিশ্বকাপ ফাইনালে তাকে ট্রফি দিতে না দেয়াটা যে গুরুতর সংবিধান অবমাননা, সেটা শুরুতেই বুঝিয়ে বললেন কামাল, ‘ক্রিকেট খেলাটি হয় আইনের মাধ্যমে, একটি সংবিধানের মাধ্যমে। এখানে কার কী কর্তব্য এবং সভাপতি হিসেবে আমার কী দায়িত্ব সেটাও বলা আছে। এখন আমাদের সংবিধান মোতাবেক এর অনুচ্ছেদ ৩.৩(বি) ধারা মোতাবেক আইসিসির যে সব ওয়ার্ল্ড ইভেন্টগুলো হয়, সে সমস্ত ইভেন্টে ট্রফি দেয়ার একমাত্র দায়িত্ব থাকে সভাপতির ওপর। সেখানে কোনও রকম বিচ্যুতি অনুচ্ছেদে নেই। তাহলে গত ২৯ মার্চ মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের যে খেলা হলো চ্যাম্পিয়ন্স দলকে ট্রফি দেয়ার কথা ছিল আমার। কিন্তু আমি সেটা দিতে পারিনি। এটা সংবিধান অবমাননা হয়েছে।’
পুরস্কার বিতরণীর আগের দিনই তাদের ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছিল বলে বললেন কামাল। আর সেটা না করাতেই এই ভাবে তাকে অপমান করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি, ‘আগের দিন বিকেল বেলায় একটি মিটিং ডাকা হলো। কয়েকজন ডিরেক্টর ছিলেন যারা আমাকে বললেন ওই দিনের মন্তব্যের জন্যে অ্যাপোলজি স্টেটমেন্ট সাবমিট করার জন্য। আমি তা করতে রাজি হইনি। ওনারা তখন বললেন, আমাকে অনুষ্ঠানে রাখা হবে না। আমি বলেছি সংবিধান পরিপন্থি কাজ করে ক্রিকেটকে কবর দেবেন না, ক্রিকেটের গায়ে ক্ষত আনবেন না।’
 কেন এমন করা হয়েছে, সেটাও অজানা নয় কামালের কাছে। কারণ হলো, তিনি বাংলাদেশ-ভারত কোয়ার্টার ফাইনাল নিয়ে মন্তব্য করেছেন। কামাল বলছেন, সেই ম্যাচের শুরু থেকেই আপত্তিকর সব ব্যাপার দেখেছেন তিনি, ‘মূল কারণটি হলো আগে ১৯ তারিখে বাংলাদেশ-ভারতের মাঝে যে খেলাটি হলো সে খেলাটি নিয়ে আমি কিছু মন্তব্য করেছিলাম। আমার কিছু পর্যবেক্ষণ ছিল। মাঠে গিয়েই প্রথমে দেখলাম স্পাইডার ক্যামেরাই নেই। মেলবোর্নের মাঠে এই প্রথম খেলা হলো স্পাইডার ক্যামেরা বাদ দিয়ে। এরপর আপনারা জানেন যে একটা জায়ান্ট স্ক্রিন যেটা আছে। এর মালিক স্বয়ং আইসিসি নিজে। আমরাও যখন বিশ্বকাপ করেছিলাম তখন পোস্টারেও দাড়ি, কমা আইসিসির অনুমতি নিয়ে করতে হয়েছে। আমি দেখলাম খেলা শুরুর পরে সেখানে জায়ান্ট স্ক্রিনে লেখা আছে—জিতেগা রে ভাই জিতেগা ইন্ডিয়া জিতেগা। আমি এটা দেখে সাথে সাথে আইসিসির সিইওকে বললাম এটা বন্ধ করুন। তিনি সরাসরি কমার্শিয়াল ম্যানেজারকে বললেন এটা বন্ধ করো। কিন্তু বন্ধ করা হলো না। এর মাঝে স্পাইডার ক্যামেরা তো ছিলই না, সঙ্গে যে সিদ্ধান্তগুলো বিতর্কিত ছিল সেগুলোতেও অন্য ম্যাচের মতো প্রযুক্তি ঠিকমতো ব্যবহার করা হলো না। ব্যবহার না করার কারণে আম্পায়ারদের সিদ্ধান্তগুলো বিতর্কিত দেখতে পেলাম।’
কামাল বলছেন, ‘আম্পায়ারদের ভুল মেনে নিতে তার আপত্তি নেই। কিন্তু ভুলটা শোধরানোর জন্য প্রযুক্তির সহায়তা না নেয়াতেই আপত্তি করেছিলেন তিনি, ‘(আম্পায়াররা) মানুষ। বিচার বিশ্লেষণে ভুল হতে পারে। কিন্তু আমার যেটা পর্যবেক্ষণ ছিল সেটা হলো সেই দিন যদি প্রযুক্তি পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করতে পারতাম, তাহলে আম্পায়ারদের সিদ্ধান্ত কতটা সত্য বা অসত্য সেগুলো ভালোভাবে জানতে পারতাম।’

কামাল বারবারই দাবি করলেন, এই পুরো ঘটনায় ভারত বা আইসিসির সঙ্গে তার কোনো বিরোধ নেই। বিরোধটা দু’একজন কর্মকর্তার বিপক্ষে, ‘ভারতের খেলোয়াড়রা তো আর বলেনি, এসব করো। ভারতীয় বোর্ড তো বলে দেয়নি। তারা আমাদের বন্ধু ছিল, তাই আছে। এটা ভারতের ব্যাপার নয়, আইসিসিরও নয়। দু’একজন অসত্ লোক আইসিসিকে নষ্ট করার চেষ্টা করছে। তারাই এসব করছে।’