রাজনৈতিক সহাবস্থান তবুও শঙ্কায় বিএনপি

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৫, ১৯:০০
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী পক্ষ বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক সহাবস্থান রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডে। বিগত বিএনপি সরকারের আমলেও দু’পক্ষের এই সহাবস্থান ছিল। তবে এবারের উদ্ভূত জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শেষ পর্যন্ত এই সহাবস্থান ধরে রাখা সম্ভব হবে কিনা, সব প্রতিযোগী সমতল মাঠে প্রচারণা চালাতে পারবেন কিনা এবং অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ হবে কিনা- এনিয়ে শঙ্কায় কাউন্সিলর পদে বিএনপি দলীয় মনোনয়নপত্র দাখিলকারীরা।
উত্তর গোড়ান ১ ও ২, দক্ষিণ গোড়ান ১ ও ২, পূর্ব গোড়ান ১ ও ২ এবং পূর্ব গোড়ান বনশ্রী প্রজেক্ট (দক্ষিণ বনশ্রী) নিয়ে গঠিত এই ২ নম্বর ওয়ার্ড (পুরাতন ২৫ নম্বর ওয়ার্ড)। এখানকার ভোটার ৬৬ হাজার ৬৬৮ জন। এরমধ্যে পুরুষ ৩৩ হাজার ৮৪৮ ও মহিলা ৩২ হাজার ৮৪০ জন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এই ২ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ১৫ জন। এরমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থে স্নাতকোত্তরধারী ও কানাডায় পড়াশোনা করা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির প্রতিযোগী যেমন রয়েছেন, তেমনি আছেন নানা কারণে ‘বিতর্কিত’ ভাবমূর্তির লোকও। রয়েছেন বৈধ আয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপনকারী, আছেন দল ক্ষমতায় থাকার প্রভাব খাটিয়ে ‘হঠাত্ বড়লোক’ বনে যাওয়াও।
তবে এবারের নির্বাচনে ওয়ার্ডটি আরেক কারণে অনন্য, সাধারণ কাউন্সিলর পদে এখানে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নাম লিখিয়েছেন এক নারী নেত্রী হাবীবা চৌধুরী (বিথি)। তিনি ঢাকা মহানগর মহিলা দলের এক নম্বর যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক এবং খিলগাঁও থানা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশনে সাধারণ কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য বিথিসহ মোট ২৪ জন এবার মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
দুই নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ১৫ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও মূল প্রতিযোগী আসলে ৫ জন। ৩ জন আওয়ামী লীগের, ২ জন বিএনপির। আওয়ামী লীগের তিনজন হলেন- সাহাবুদ্দীন মজুমদার (২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং খিলগাঁও থানা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক), মোহাম্মদ আনিসুর রহমান (ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি) এবং রায়হান আরেফিন ভুঁইয়া (রিসাল), যিনি ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও এই ওয়ার্ডের সর্বশেষ কাউন্সিলর সদ্য প্রয়াত রফিকুল আলম ভুঁইয়া বাচ্চুর পুত্র। বিএনপির সমর্থন লাভের মূল দুই প্রতিযোগী হাবিবা চৌধুরী (বিথি) এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক জামিলুর রহমান (নয়ন)।
আওয়ামী লীগের সাহাবুদ্দীন, আনিস ও রিসাল-তিনজনই মঙ্গলবার ইত্তেফাকের সঙ্গে পৃথকভাবে আলাপকালে অভিন্নকণ্ঠে বললেন “দল চূড়ান্তভাবে যাকেই সমর্থন দেবে, আমরা সবাই তার হয়ে একযোগে কাজ করবো।” একই কথা বিএনপির বিথিরও, তিনি বলেন “দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। দলের চেয়ারপারসন (খালেদা জিয়া) ও আমাদের নেতা মির্জা আব্বাস যাকেই সমর্থন দেবেন আমরা একসঙ্গে কাজ করব। নয়ন ভাই ও আমি একসঙ্গেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি, দলের সমর্থনের বিষয়েও আমরা কথা বলেছি।”
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ না হওয়ায় এবং নিজ দল-জোট সমর্থিত একক প্রার্থী নির্ধারিত না হওয়ায় কেউ-ই এখনও পুরোমাত্রায় প্রচারণায় নামেননি। দলীয় সমর্থন আদায়ের চেষ্টার পাশাপাশি তারা সীমিত পরিসরে গণসংযোগ করছেন। একাধিক মামলা মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে থাকা বিএনপির নয়নকে কদাচিত্ এলাকায় দেখা গেলেও নারী হওয়ার সুবাদে তুলনামূলকভাবে কম দৌড়ঝাপের মধ্যে থাকা বিথি অবশ্য এলাকাতেই থাকেন সারাক্ষণ।
মনোনয়নপত্র দাখিলকারী ও স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় সমর্থন ঘোষণার ক্ষেত্রে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়ার সঙ্গে দলের স্থানীয় ‘মুরব্বী’ মির্জা আব্বাসের ভূমিকা যেমন থাকবে, একইভাবে আওয়ামী লীগেও দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রভাব থাকবে স্থানীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরীর। চূড়ান্ত বাস্তবতা হচ্ছে-যার ওপর দলের স্থানীয় ‘মুরব্বী’র আশীর্বাদ থাকবে, তিনিই হবেন দল সমর্থিত প্রার্থী।
সাহাবুদ্দীন, আনিস ও রিসাল ছাড়াও মনোনয়নপত্র দাখিলকারী জহিরুল ইসলাম ভুঁইয়া, আব্দুল খালেক, আব্দুল মান্নান, মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক ও মোমেনুল হকও (মিল্লাত) আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। আর বিথি ও নয়ন ছাড়াও মনোনয়নপত্র জমাদানকারী শামছুল আলম ভুঁইয়া (কবির) ও শাখাওয়াত শাহীনও (মিরন) প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে বিএনপির রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তবে মনোনয়নপত্র দাখিলকারী আওয়ামী লীগ-বিএনপির অন্য এই প্রতিযোগীরা কেউ আসলে ভোটের মাঠে সরব নন। দলীয় সমর্থন আদায়ের ক্ষেত্রে পছন্দের ব্যক্তির পাল্লা ভারি করতেই তাদের কেউ কেউ সমঝোতায় মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন, সরেজমিনে সেই প্রমাণ মিলেছেও। এর বাইরে ১৫ জনের আরও যারা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন- তাদের কেউ ছোটখাটো নামসর্বস্ব দলের, কেউ জমা দিয়েছেন শখের বসে। তবে আওয়ামী লীগ ছাড়া দলটির নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের অন্য কোনো শরিক দল থেকে কেউ কাউন্সিলর পদে মনোনয়নপত্র দাখিল করেননি। একইভাবে বিএনপি ছাড়াও সেই দলের নেতৃত্বের জোট ২০ দলের অন্য শরিকদের কেউ মনোনয়নপত্র তোলেননি।
আওয়ামী লীগের সাহাবুদ্দীন মজুমদার ইত্তেফাককে জানান, দলীয় সমর্থন পেয়ে নির্বাচিত হতে পারলে তিনি এলাকায় শিক্ষার বিস্তারে বেশি মনোযোগ দেবেন। আগের মতোই অটল থাকবেন সন্ত্রাস-মাদকের বিরুদ্ধে। রায়হান আরেফিন ভুঁইয়া (রিসাল) ইত্তেফাককে বলেন, “সাহাবুদ্দীন মজুমদার ও আমি একসঙ্গে সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করছি। দল যাকেই সমর্থন দেবে তার জন্য কাজ করবো।”
রিসালের মতো একই কথা জানান দলের আরেক মনোনয়ন দাখিলকারী আব্দুল খালেকও। আওয়ামী লীগের আরেক প্রতিযোগী, ছাত্রলীগ নেতা আনিসুর রহমান বলেন “দল সমর্থন দিলে এবং নির্বাচিত হতে পারলে এলাকার দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী বাসাবো- গোড়ানের হাওয়াই গলিতে কালভার্ট করবো।”
বিএনপির হাবিবা চৌধুরী (বিথি) বললেন “জাতীয় রাজনীতির প্রভাব এই নির্বাচনে পড়বে কিনা, তা নিয়ে ভীষণ চিন্তিত আছি। দল সমর্থন দিলেও প্রচারণার জন্য সমান সুযোগ পাবো কিনা, ভোটকেন্দ্রে এজেন্ট দিতে পারবো কিনা, নেতা-কর্মী-সমর্থকরা ভোটের দিন কেন্দ্রে যেতে পারবেন কিনা, ভোটকেন্দ্র বেদখল হয়ে যাবে কিনা, প্রশাসন বিরূপ আচরণ করে কিনা- মনে এরকম নানা শঙ্কা কাজ করছে।”