জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েই বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আজ রবিবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে হাজির হচ্ছেন-এমনটিই নিশ্চিত করেছেন তার আইনজীবী ও দলের নেতারা। আদালতে জামিন পেলে নিজ বাসায় ফিরতে পারেন গুলশানে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে টানা ৯২ দিন ধরে অবস্থান করা এই বিএনপি নেত্রী। এদিকে বাড়তি পুলিশ প্রত্যাহারের পর গতকাল শনিবার খুলে দেয়া হয়েছে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও। সেখানে দলীয় নেতা-কর্মীরাও গেছেন কোনোরকম পুলিশি বাধা ছাড়াই।
জানা গেছে, আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ৪০ দিনেও তা পুলিশের কাছে না পৌঁছানো, এই সময়ে তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করতে পুলিশের কোনো উদ্যোগ না নেয়া, পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে তল্লাশি না চালানো, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজন, খালেদা জিয়াকে নিজ থেকেই আদালতে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ দেয়াসহ দৃশ্যমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনেকেরই ধারণা- বিদ্যমান ‘ডেডলক অবস্থা’ থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার-ই সম্ভবত খালেদা জিয়া বা বিএনপিকে কৌশলে ‘স্পেস’ (জায়গা) করে দিচ্ছে।
এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন খান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, খালেদা জিয়ার কোর্টে যাওয়া উচিত। সরকারেরও আরো আগেই উচিত ছিল তাদের পার্টি অফিস খুলে দেয়া। তবে বিএনপিকে সরকারই ‘স্পেস’ করে দিচ্ছে কিনা, তা বলার সময় এখনও আসেনি। আদালতে যাওয়ার পরের ঘটনাপ্রবাহ-ই তা বলে দেবে।
সরকার বিএনপিকে ‘স্পেস’ করে দিচ্ছে বলে অনেকে ধারণা করলেও খালেদা জিয়া আজ আদালতে যাচ্ছেন কিনা, গেলেও তার পরবর্তী গন্তব্য বাসা, কার্যালয় না অন্য কোথাও হয়-সেদিকেই আজ দেশের মানুষের ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উত্সুক দৃষ্টি থাকবে। এনিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন করে মনস্তাত্বিক উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত টানা ৯২ দিন রাজধানীর গুলশানে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবস্থান করেন খালেদা জিয়া। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তির দিন গত ৫ জানুয়ারি পুলিশি বাধায় গুলশান কার্যালয় থেকে বের হতে না পেরে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ ডাকেন তিনি। আজ অবরোধের ৯০তম দিন চলছে। এছাড়া গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে মাঝে-মধ্যে বিরতি দিয়ে হরতাল ডেকেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট।
দশম জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে দেশব্যাপী চলমান অবরোধের ৯০ দিনের মাথায় এসে খালেদা জিয়ার নিজের এতদিনের অনড় অবস্থান থেকে সরে এসে কার্যালয় থেকে বেরিয়ে আদালতে হাজির হওয়া নিয়ে বিএনপিসহ ২০ দলে বহুমত রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, খালেদা জিয়া আজ আদালতে গেলে এটি হবে চলমান আন্দোলনের-ই এক ধরনের আত্মসমর্পণ। কারও মতে, যে মুহূর্তে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের দিকেই মানুষের মনোযোগ এবং বিএনপিও এখন পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় রয়েছে, সেসময় তার আদালতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সামগ্রিক রাজনীতিতেই সেটি নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারে।
প্রসঙ্গত, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় ঢাকার বকশিবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালত গত ২৪ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। গত ৫ মার্চ আদালতে হাজিরের নির্দেশ থাকলেও খালেদা জিয়া যাননি। তার অনুপস্থিতিতেই আদালত ওইদিন আজ ৫ এপ্রিল শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য্য করেন।
২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে গতকাল ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ৪০ দিনে আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থানায় না যাওয়ার বিষয় নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের বিভ্রান্তি ও ধূম্রজাল। আদালতের কর্মচারীরা বলছেন, পরোয়ানা থানায় পাঠানো হয়েছে। তবে পুলিশের উপ-কমিশনার (গুলশান) খন্দকার লুত্ফুল কবীর গতকালও ইত্তেফাককে জানান, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থানায় পৌঁছায়নি।
খালেদা জিয়া আজ আদালতে যাচ্ছেন-প্রায় এমনটিই নিশ্চিত করে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে তার গুলশান কার্যালয়ে অবস্থানকারী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘উনার আদালতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটা নির্ভর করছে সকালের (আজকের সকাল) পরিস্থিতির ওপর।’ ‘সকালের পরিস্থিতি’ বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছেন জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই নিরাপত্তার কথা বলে আসছিলাম।’
খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়াও গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) আইন মান্যকারী নাগরিক। তিনি আদালতে যেতে চান, আদালতে যাবেন। তবে এটা নির্ভর করছে বর্তমান পরিস্থিতি বিশেষ করে ম্যাডামের নিরাপত্তার বিষয়টির ওপর।’ এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনও সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগেও বলেছি তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, আদালতে যেতে ইচ্ছুক। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা পেলে ৫ এপ্রিল খালেদা জিয়া আদালতে যাবেন। সরকারের দায়িত্ব হবে তাকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেয়া। কেননা গত ২৪ ডিসেম্বর যখন তিনি আদালতে যান, তখন পথে তার গাড়িবহরে হামলা হয়েছিল।’
খালেদা জিয়ার আদালতে যাওয়ার ইঙ্গিত এবং তার নিরাপত্তার বিষয়ে আইনজীবী ও বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের বিষয়ে পুলিশের উপ-কমিশনার খন্দকার লুত্ফুল কবীর বলেন, ‘উনি আদালতে যাবেন কিনা, আমরা জানি না। তবে যাবেন বলে টিভির খবরে দেখছি। আদালতে গেলে তিনি যেভাবে নিরাপত্তা চাইবেন, আমরা সেভাবেই দেবো।’
বিএনপি প্রধানের গুলশান কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আদালত জামিন দিলে খালেদা জিয়া তার গুলশানের বাসায় ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গোছগাছসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। বাসার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ঠিকঠাকসহ পরিচ্ছন্নতার কাজও সম্পন্ন করা হয়েছে। জামিন পেলে বাসায় যাওয়ার আগে তিনি নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও নিজের গুলশান কার্যালয়ও ঘুরে যেতে পারেন। গুলশান কার্যালয় থেকেও অতিরিক্ত পুলিশি নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে আদালতে গেলে এবং জামিন পেলেও খালেদা জিয়া আর গুলশান কার্যালয়ে প্রবেশ করতে পারবেন কি-না, তা নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে।
খালেদা জিয়ার আজ আদালতে হাজির হওয়ার খবরে সরকারি মহলেও নানা হিসাব-নিকাশ কষা হচ্ছে। মন্ত্রিসভায় থাকা আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর একজন সদস্য গতকাল ইত্তেফাককে জানান, আদালতে তার হাজির হওয়ার বিষয়টিকে সরকার ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে। কারণ এনিয়ে সৃষ্ট আইনি সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হবে। তবে আদালতে হাজির হলে জামিন বা জেল, যা-ই হোক তা নিয়ে সরকারের নিজস্ব কোনো ভাবনা নেই। তিনি জানান, খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়ে সরকার নিজ থেকে কিছু করতে আগ্রহী নয়, সরকার চায় আদালতের মাধ্যমেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হোক। আদালত তাকে জামিন না দিলে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে অবশ্যই সরকার সতর্ক রয়েছে।
এদিকে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের দাবিতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে আজ বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত গণপদযাত্রার কর্মসূচি দিয়েছে শ্রমিক-কর্মচারী-মুক্তিযোদ্ধা-পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ।
