ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি

কথা রাখছেন ওবামা

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৫, ১২:৫৩
বারাক ওবামা যখন প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশের প্রেসিডেন্ট পদে বসেন তখন স্বাগত ভাষণে বলেছিলেন, আমি আমেরিকার শত্রু রাখতে চাই না। তিনি দেশবাসীকে দেয়া সেই কথা রাখছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘যদি আপনি হাত মুষ্ঠিবদ্ধ না করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন তাহলে সেটা আমাদের দিকে প্রসারিত করুন’। দীর্ঘ ছয় বছরের বেশি সময় কেটে গেছে। কিন্তু এবারের মতো এত বড় শত্রুর সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা কখনো দেখা যায়নি। কারণ ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতার সম্পর্ক ৩৫ বছরের। ১৯৭৯ সাল থেকে যখন দেশটিতে ইসলামি বিপ্লব ঘটে। এমনকি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ তো ইরানকে শয়তানের অক্ষশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। চূড়ান্ত চুক্তির উদ্যোগটি সফল হলে সেটি নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হতে পারে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে মার্কিন প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস।
যেভাবে শেষ মুহূর্তে সমঝোতা
গত ১২ বছর ধরে দফায় দফায় কথা বলেছেন দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা। ইরানের ফর্দো ও নাতানত্জ পরমাণু কেন্দ্র নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল পশ্চিমা বিশ্ব। ফর্দোতে পরমাণু কেন্দ্রের বদলে পরমাণু বিজ্ঞান চর্চা কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইরান। নাতানেজ আন্তর্জাতিক নজরদারিতে পরমাণু গবেষণা চলবে। এছাড়া ছিল আরাক। এই তিনটি কেন্দ্রকে কেন্দ্র করেই  আটকে ছিল সমঝোতা। কারণ এটি আমেরিকা এবং ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর জন্য বড় একটি ইস্যু ছিল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনি চেয়েছিলেন, কোন পরমাণু কেন্দ্র বন্ধ হবে না। সেন্ট্রিফিউজও থাকবে। আর আমেরিকা চেয়েছিল, সেন্ট্রিফিউজ বাদ দিতে হবে। এ নিয়ে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার জন্য শত শত বিতর্ক হয়েছে। সময় শেষ হওয়ার পরও তারা আলাপ করেছেন। এর আগে দীর্ঘ দুই বছর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গোপনে আলোচনা হয়। তাদের মধ্যে সব সময়ই অবিশ্বাস এবং সংঘাত বিদ্যমান ছিল। আগামী তিন মাসের মধ্যে তাদের সমাঝোতাকে চূড়ান্ত চুক্তির দিকে নিয়ে যেতে হবে।
মার্কিন সমঝোতাকারীদের মধ্যে অন্যতম ওয়েল্ডি শেরম্যান। তিনি সুইজারল্যান্ডে অরনেট হোটেলে গেলেন। সেখানে ছিল একটি হোয়াইট বোর্ড। তিনি ছাড়াও ইরানের অনেকে ছিলেন। তারা ইংরেজি এবং পারস্য উভয় ভাষায় কথা বলছিলেন। ওই বোর্ডটি কূটনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তারা উভয়ই সম্মত হন যে কোনো কাগজে তারা তাদের মতামত লিখবেন না। এর ফলে কাউকে তাদের মতামত পর্যালোচনার জন্য দেশে পাঠাতে হয়নি। ফলে তাদের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়। অনেক আমেরিকান একে ব্রিলিয়ান্ট সমাধান বলেছেন। যিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে গোপনে সম্পর্ক স্থাপনে ভূমিকা রেখেছেন সেই পররাষ্ট্র্র প্রতিমন্ত্রী উইলিয়াম জে বার্নস বলেন, আপনি বোমা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারেন না। সেখানে এমন কিছু নেই যা আমরা ধ্বংস করতে পারি এবং ধ্বংস করলে তারা পুনরায় কয়েক বছরের মধ্যে তৈরি করতে পারবে না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তো আলোচনা ছেড়ে চলেই আসতে চেয়েছিলেন। তিনি ওই কয়দিনে তিনবার বিনোদনের জন্য বাইসাইকেলে চড়তে বের হন। এর মধ্যে দুইবার তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের ফোন পেয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হন। ফ্রান্স সরাসরিই বলেছিল, তারা এই চুক্তিতে আর কত বিনিয়োগ করবে? কারণ সুইজারল্যান্ডের বেল ভিউ রিভেজ হোটেলের প্রতি রাতের ভাড়া ছিল ১৫শ’ মার্কিন ডলার।
 
এক শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা জানান, যখন ৩১ মার্চ আসলো তখন সবাই যেন নড়েচড়ে বসলেন। কারণ তারা সবাই চেয়েছিল একটা সমঝোতায় আসতে। সবাই সেদিকেই তাকিয়ে আছে। ইরানিরাও জানেন, কেরির কাছে ৩১ মার্চ মানে কি। তিনি সমঝোতার ক্ষেত্রে একটি উন্নতি চেয়েছিলেন। এছাড়া অন্য কিছু নয়। কারণ তার সঙ্গে যারা আসছিলেন তারা তিনবার দেশে ফেরার জন্য রওনা হয়েছিলেন এবং বিমানে সব মালামালও রেখেছিলেন। কিন্তু আবার ফিরে আসেন। ৩১ মার্চ সারারাত দুই পক্ষের মধ্যে বৈঠক হয়। ওইদিন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ শরিফকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি কতক্ষণ ঘুমিয়েছেন? তখন তার উত্তর ছিল-দুই ঘণ্টা এবং আমি এক্ষেত্রে ভাগ্যবান। এই পরিস্থিতি সবার জন্যই বেদনাদায়ক ছিল। ইরানিরা চেয়েছিলেন, ফর্দোতে কিছু সেন্ট্রিফিউজ রাখতে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো সেটা চায়নি। এরপর বিজ্ঞানী মোনিজ যখন ওবামাকে আশ্বস্ত করেন, এতে কোন ক্ষতি কিংবা হুমকি হিসেবে দেখা দিবে না তখনই ওবামা মতৈক্যের বিষয়টিতে অনুমোদন দেন। একই সমস্যা হয় আরাকের ক্ষেত্রে। ইরান চেয়েছিল সেটিকে রিডিজাইন করতে। মোনিজ বলেন, এই রিঅ্যাক্টর কোনো প্লুটোনিয়াম উত্পাদন করবে না। আর যদি ইরান প্রতারণা করে তাহলে সেক্ষেত্রে সেটা সঠিক পদ্ধতিতেই পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
 
কংগ্রেস কি চুক্তি বিনষ্ট করতে পারে
ওবামা বলেছেন, কংগ্রেস যদি বিশেষজ্ঞদের মতামত না নিয়ে এবং বিকল্প কোন পন্থা না রেখে এই চুক্তিকে হত্যা করে তাহলে এই কূটনৈতিক ব্যর্থতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করবে সারা বিশ্ব। কি করতে পারে কংগ্রেস এক্ষেত্রে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের পরামাণু অস্ত্রের বিস্তারবিরোধী সাবেক উপদেষ্টা জোসেফ ডি থমাস সেই সম্পর্কে বলেন, বলা ভাল, কংগ্রেস অনেক কিছুই করতে পারে। কংগ্রেস সদস্যরা এ বিষয়ে শুনানি করতে পারে। সাক্ষ্যের জন্য চুক্তির বিপদ সম্পর্কে ধারণা দিতে প্রত্যক্ষদর্শীদের তলব করতে পারে। এভাবে তারা প্রশাসনকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। কংগ্রেস ইরানের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের যোগান নাও দিতে পারে। এটা চুক্তিকে বিলম্বিত করবে এবং সম্ভবত চুক্তিকে নষ্ট করবে। এছাড়া অন্য বিকল্পও আছে। আগামী ১৪ এপ্রিল সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটিতে রিপাবলিকান সিনেটর বব ক্রোকারের ইরানের পরমাণু চুক্তির ওপর পর্যালোচনা সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবের উপর ভোট হবে। পরমাণু চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর এই পদক্ষেপ তাদের আরো ৬০ দিন সময় দেবে। যদি তারা ইরানের উপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করতে চায়। ওবামা ইরানের ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করতে চান। কংগ্রেস যদি এক্ষেত্রে কোন বাধার সৃষ্টি করে তাহলে তিনি ভেটো দেবেন বলেও জানিয়েছেন। এনওয়াই স্কুল অব ল’র বিশ্লেষক জাকারি গোল্ডম্যান বলেছেন, এটা খুবই কঠিন হবে। কারণ এতে তাদের কংগ্রেসের উভয় কক্ষ সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন পেতে হবে যদি তারা প্রেসিডেন্টের ভেটোকে অকার্যকর করতে চান। উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
 
সমঝোতায় যা আছে
সমঝোতা চুক্তিতে রূপান্তরিত হলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছর ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি অনেকটা কমিয়ে আনবে। বিনিময়ে দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে কমে আসবে। আরাক ফর্দো, নাতানত্জ পরমাণু কেন্দ্র নিয়ে সমঝোতা হবে। আরাকের পরমাণু চুল্লি নতুন ভাবে সাজানো হবে। এতে পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্লুটোনিয়াম তৈরি হবে না। ফর্দোতে শুধু গবেষণার কাজ চলবে। সেন্ট্রিফিউজ এবং পরমাণু জ্বালানি সরিয়ে নেয়া হবে। এছাড়া দেশটি আর কোন পরমাণু কেন্দ্র তৈরি করবে না। ইরানে বর্তমানে প্রায় ১৯ হাজার সেন্ট্রিফিউজ কাজ করছে। এই সংখ্যা এক তৃতীয়াংশ নামিয়ে আনতে হবে যাতে সংখ্যা দাঁড়াবে ৬ হাজার ১০৮ এ। এর মধ্যে আবার ৫ হাজার ৬০টি সেন্ট্রিফিউজ দশ বছর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ করবে। নতুন প্রজন্মের উন্নতমানের সেন্ট্রিফিউজ কড়া নজরে থাকবে। আর কম সমৃদ্ধকরণ ইউরেনিয়ামের পরিমাণ দশ হাজার কিলোগ্রাম থেকে ৩০০ কিলোগ্রামে নামিয়ে আনবে। অর্থাত্ প্রায় ৯৭ শতাংশ হ্রাস হবে। ১৫ বছর ধরে ইউরেনিয়াম ৩ দশমিক ৭ শতাংশ সমৃদ্ধকরণ করবে। এই ইউরেনিয়াম বিদ্যুত্ উত্পাদনের কাজে লাগাবে। বোমা তৈরির জন্য ইউরেনিয়ামকে ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণ করতে হয়। উল্লেখ্য, ১৯৫০ সালে ইরানে পরমাণু কর্মসূচি চালু হয়। মূলত রাশিয়া এবং চীনের সহয়োগিতায়ই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এগিয়ে চলে। যদিও ইসলামি বিপ্লবের সময় এ কর্মসূচিতে কিছুদিনের জন্য ভাটা পড়ে।
প্রেসিডেন্ট ওবামার কাছে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা জরুরি হয়ে পড়েছিল। কূটনীতিকদের মতে, সমঝোতার পেছনে অন্য উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। বিশেষ করে সুন্নিপন্থি ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান হয়তো গোপনে একত্র কাজ করছে। তাছাড়া গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ইরানের পক্ষে এক মাসের মধ্যে পরমাণু বোমা তৈরি করা সম্ভব ছিল। কিন্তু এখানে মার্কিন মিত্র সৌদি আরব এবং ইসরাইল ইতিমধ্যে তাদের নাখোশের কথা জানিয়েছে। দেশের ভেতরে এবং বাইরে সবাইকে সামাল দিয়েই একটি পরিপূর্ণ চুক্তির দিকে নিয়ে যেতে হবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে।