চীনা সমাজব্যবস্থায় ভিক্ষা করা অপরাধ। কিন্তু ভিক্ষাবৃত্তি টিকে রয়েছে। তবে এরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নকল ভিক্ষুক। এদের দৌরাত্ম্য চলছে জোর কদমে এবং এই চক্র বেশ সংগঠিত। অর্থাৎ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জনসংখ্যার এ দেশটিতে এমন অনেকেই রয়েছেন, যারা ইচ্ছে করেই দরিদ্র থাকতে চান। চাইলেও তাদেরকে কোনো কাজে লাগানো যায় না। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় মিডিয়া এজন্সি সিনহুয়া ঝেজিয়াং প্রদেশের একজন ভিক্ষুকের বেশ কয়েকটি ছবি গোপনে তোলার পর তা প্রকাশ করে। প্রথমটিতে দেখা যায়, লোকটি পঙ্গু সেজে (হাঁটতে পারেন না) রাস্তায় ভিক্ষা করছেন। এর পরেরগুলোতে দেখা গেছে ক্রমান্বয়ে তার স্বাভাবিক হয়ে ওঠার দৃশ্য। একটিতে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। এর কয়েকদিন পরেই রাষ্ট্রীয় ব্রডকাস্টার চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে যে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর চংকিংয়ে ভুয়া ও পেশাদার ভিক্ষুকের একটি চক্রকে পুলিশ আটক করেছে। এর সদস্যদের হাতে শোভা পায় দামি ঘড়ি ও মোবাইল। এর আগে একজন কোটিপতি ভিক্ষুকের খবরও পত্রিকায় এসেছে, যার বেইজিং শহরে রয়েছে দু’দুটি এ্যাপার্টমেন্ট। অথচ এই ধনী লোকটিই কিনা রাস্তায় থালা বাড়িয়ে দিয়ে গানের সুরে বলতে থাকেন, ‘দয়া করে এই অসহায়কে একটা রেনবিনবি (চীনা পয়সা) দিয়ে যান ভাই-বোনেরা’।
১৯৭৮ সাল থেকে চীনে অনেক অর্থনৈতিক সংস্কার সাধিত হয়েছে; চীনা কমিউনিস্ট পার্টি দেশের কল্যাণ পদ্ধতিতে অনেক পরিবর্তন এনেছে। তারপরেও বেড়ে চলেছে ভুয়া ভিক্ষুকের সংখ্যা। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এ নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। কেউ কেউ এমনই বলছেন যে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি জনগণের কল্যাণ নিয়ে যতো বাগাড়ম্বরই করুক না কেনো, সামাজিক নিরাপত্তা ক্রমশ আরো বেশি সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। শিথিল অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার সুযোগে পঙ্গপালের মতো গ্রাম থেকে শহরে ছুটে আসছে মানুষ। অসম অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগে চীনে বাড়ছে ভিক্ষুকের সংখ্যা। এ দেশটিতে আয়ের অসমতা প্রবল। তারপরেও ভিক্ষুকের সংখ্যা খুব বেশি থাকার কথা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকৃত ভিক্ষুক কারা এটি নির্ধারণ করবে কে? টুইটারে একজন লিখেছেন, একটু সচেতন হলেই চীনে ভিক্ষাবৃত্তি দূর করা সম্ভব। চাইলেই একজনকে ভিক্ষা দেয়া উচিত নয়। এর বদলে তাকে আশপাশের আশ্রয় বা পুনর্বাসন কেন্দ্র্রে পৌঁছে দেয়া প্রয়োজন। কাউকে এ প্রস্তাব কয়েকদিন দেয়ার পরেও যদি সে ফিরিয়ে দেয় তাহলে বুঝতে হবে যে, সে প্রকৃত ভিক্ষুক নয়।
৪০ বছর আগে চীনের প্রায় সকলেই বসবাস করতো দরিদ্রসীমার মধ্যে। সে জায়গায় এখন উচ্চবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। পৃথিবীর মধ্যে সবচে’ ধনী লোকের বসবাসও এই দেশটিতে। এ পরিস্থিতিতে ভিক্ষুক শব্দটাই তো বেমানান। রাষ্ট্র-পরিচালিত দৈনিক চায়না ডেইলি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রাদেশিক রাজধানী ন্যানজিংয়ের সাবওয়েতে ভিক্ষা করা ভিক্ষুকদের ৮০ শতাংশই ভুয়া। বেশিরভাগই গান গেয়ে ভিক্ষা করে। এসব ভিক্ষুকের কারোর মাসিক আয়ই ১০ হাজার ইউয়ানের (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার) কম নয়, যেটি চীনের মানুষের গড় আয়ের চেয়ে অনেক বেশি।
