গাভামির অর্জন কম নয়

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৫, ১৩:২০
নারী হয়ে পুরুষদের খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে যাওয়া যাবে না -এমন নিয়ম মানতে রাজি ছিলেন না তিনি। তাই নিজে পুরুষদের ম্যাচ দেখতে চেয়েছিলেন, তার মতোই অন্য নারীরাও যাতে পছন্দমতো যেকোন খেলা দেখার অধিকার পান, সেজন্য মুখ খুলেছিলেন। কিন্তু সরকারের কাছে বাহ্বা পাবার পরিবর্তে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন।
ঘটনাটি গত বছর জুনের। ইরানি বংশোদভুত  ব্রিটিশ নারী গোনচেহ গাভামিকে কারাদণ্ড দেয় ইরানের একটি আদালত। কারণ তিনি স্টেডিয়ামে পুরুষদের একটি ম্যাচ দেখতে চেয়েছিলেন। কারাদন্ডের পর তিনি বিশ্ব গণমাধ্যমে আলোচিত মুখে পরিণত হন। তাকে নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে আলোচনার ঝড় ওঠে।
ইরান ও ইতালির মধ্যকার ভবিলব ম্যাচ চলছিল সেদিন। স্টেডিয়ামে যাবার জন্য জোরাজুরি করায় তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এনে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।  দেয়া হয় এক বছরের সাজা। তবে ইরানের গণমাধ্যমেই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। তারাও অতি উত্সাহী পুলিশকে দায়ি করতে থাকে। তাছাড়া দেশীয় মিডিয়াতে বল হয়, কেন তাকে সাজা দেওয়া হলো, রায়ে তার সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ নেই। বিচারক কোনো কারণও দেখাননি। কেবল ‘শৃঙ্খলাভঙ্গ’ করার অভিযোগ। কোন সেই ‘শৃঙ্খলা’ যা গাভামি ভঙ্গ করেছেন তা পুলিশের চার্জশিটে কিংবা আদালতের রায়ে কোথাও খুজে পায়নি সাংবাদিকরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, হয়তো দেশের ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে একারণে খেলা দেখতে চাওয়াকে শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করতে সাহস পায়নি পুলিশ। আর আদালতও কেবল ‘শৃঙ্খলা ভঙ্গ’ শব্দটির উপর ভর করে সাজা দিয়ে দিয়েছেন।
তবে ইরানের কর্মকর্তারা পরে সমালোচনার মুখে দাবি করেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে গাভামিকে গ্রেফতার করা হয়। তবে কী ধরনের নিরাপত্তার জন্য গাভামি হুমকি সৃষ্টি করেছেন, তার কোনো ব্যাখ্যা তারা দেননি। ফলে অজানা কারণে তাকে বিচারের আগ পর্যন্ত ১২৬ দিন জেলে থাকতে হয়। রায়ের পর শুরু হয় আরো এক বছরের কারাবাস। অপরাধ অজ্ঞাত হলেও ইরানের কুখ্যাত এভিন জেলে রাখা হয় গাভামিকে। তার হয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় জনমত ও সমর্থন সংগ্রহে একটি পিটিশন পোস্ট করে অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ব্রিটেন শাখা। তার মুক্তির সমর্থনে স্বাক্ষর সংগ্রহও চলে। ওই পিটিশনে অভিযোগ করা হয়, কোনও যুক্তিগ্রাহ্য, বৈধ অভিযোগ ছাড়া তাকে জেলের নির্জন কুঠুরিতে ফেলে রাখা হয়েছে। তার হয়ে মামলা লড়তে কোনও আইনজীবীর সঙ্গেও কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। এক পর্যায়ে গাভামি অনশন শুরু করেন। তার মা বিবিসিকে বলেন, অন্যায়ভাবে কারাদণ্ড দেয়ার প্রতিবাদে তিনি এ অনশন শুরু করেছেন। ফলে ইরান সরকার আরো চাপে পড়ে যায়। সিদ্ধান্ত নেয় তাকে ক্ষমা করে দেয়ার।
শেষ পর্যন্ত ইরান সরকার তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নেওয়ায় মুক্তি দেওয়া হচ্ছে গাভামিকে। তার ভাই ইমাম টুইটে খবরটি জানান সবাইকে। ব্রিটিশ সরকার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। ইরানে ব্রিটিশ দূতাবাস নেই। তবুও নিয়মিত এ ব্যাপারে খোঁজখবর রাখা হয়েছিল। নতুন করে ইরানে দূতাবাস খোলার পরিকল্পনাও রয়েছে ব্রিটিনের বলে জানানো হয়েছে। তবে মুক্তি পেলেও এখনই ইরান ছেড়ে কোথাও বেরোতে পারছেন না গাভামি। কিছু আনুষ্ঠানিকতা সারতে হবে তাকে।
গাভামির কারদণ্ড বৃথা যায়নি। ইরান সরকার বলেছে, আগামী আগস্টে এশিয়ান ভলিবল চ্যাম্পিয়নশিপে বিদেশী মহিলারা চাইলে ম্যাচ দেখতে পারবেন। গাভামিও যদি চান সরাসরি মাঠে ঢুকে দেখতে পারবেন সেই খেলা। এবার আর গ্রেফতার হতে হবে না! সুতরাং নিজে ত্যাগ স্বীকার করলেও বিদেশী নারীদের জন্য খেলা দেখার অধিকার আদায় করতে পেরেছেন তিনি। হয়তো একদিন সরকার বলবে, এবার দেশী মেয়েরাও স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখতে পারবেন।